‘কান্নার মত গভীর কিছু নেই’

আপডেট : ০৪ মে ২০১৪, ২১:০১
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম-নীতির মধ্যেই আমাদের বসবাস। সেই স্বাভাবিক নিয়ম-নীতির বাইরে যখন অস্বাভাবিক কিছু ঘটে যায়, তখনই দেখা দেয় নানান বিপত্তি, বিশৃঙ্খলা ও অনাচার। আবার সমাজের সবকিছুই যে ঠিকঠাক বা নিয়ম-নীতির মধ্যেই চলবে, তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। বিশেষ করে সমাজের ভিতরেই যখন লুকিয়ে থাকে মানুষরূপী কিছু অস্পৃশ্য শক্তি, মনস্টার বা গডফাদার- যাদের অদম্য প্রভাব সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, পদে পদে মানুষকে পীড়া দেয়, বেঁচে থাকার মুহূর্তগুলোকে কঠিন করে তোলে। হত্যা, গুম, অপহরণ বা নিখোঁজ হচ্ছে সেসব মনস্টার বা অস্পৃশ্য শক্তিরই প্রভাব। পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি সামাজিক অপরাধ ও অনাচার রয়েছে। যেদেশে যে মাত্রায় অপরাধ সংঘটিত হোক না কেন, সেই অপরাধ দমনের প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এবং তার শাস্তি সুনিশ্চিত করা। সেটা যদি না হয়, অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে, সমাজের ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশের সুযোগ পায় এবং নিজেদের আধিপত্য আরো সুদৃঢ় করে তারা। একটি উদাহরণ হচ্ছে- ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের মাফিয়াচক্রের উত্থান কাহিনী। তাদের সেই উত্থানের শুরু হয়েছিল ১৮১২ সাল থেকে, আজঅবধি সে চক্র থেমে নেই। তারা শুধু মরফিন, কোকেইন, হেরোইন বা মিলিটারি আর্মস ট্র্যাফিকিং-এর মধ্যেই তাদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রেখেছে তা নয়, ধীরে ধীরে সুচতুরভাবে তারা বিভিন্নভাবে সমাজের ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমনকি ইটালির রাজনীতিতেও অনুপ্রবেশ করেছে। ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে পলিটিক্সকেও তারা করেছে কলুষিত। তারা রাতারাতি বনে গিয়েছে মাল্টি মিলিয়নিয়ার। সিসিলি দ্বীপপুঞ্জকে এখনো তারা ব্যবহার করে সেফ হেভেন- অভয়ারণ্য বা নিরাপদ স্বর্গীয় আশ্রয়স্থল হিসাবে। ১৯৫০-এর দশকে তারা ইটালির গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এমনকি কিউবা, ল্যাটিন এবং নর্থ আমেরিকাতেও তাদের নেটওয়ার্ক সুপ্রতিষ্ঠিত করে। তারা সাধারণত সংঘবদ্ধ বা অর্গানাইজড ক্রাইম করে থাকে। তাদের প্রতিপক্ষ যারা থাকে, তাদেরকে এ পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয় তারা পরপারে। নৃশংসতা, অপহরণ, গুম বা খুন হচ্ছে তাদের প্রতিপক্ষের কপালের পরিণতি। নারায়ণগঞ্জের সাত ব্যক্তির অপহরণের কৌশল, হত্যা ও বীভত্সতাকে আমরা কি বলব? এটা কি সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের মাফিয়াদের মতো একটা অর্গানাইজড ক্রাইম নয়? দিনে-দুপুরে সাতজন মানুষকে রাস্তা থেকে অপহরণ করা হল, তাদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হল, পেট কেটে শীতলক্ষ্যা নদীতে ইটভর্তি বস্তা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়া হল যাতে করে তাদের লাশের কোনো চিহ্নই না থাকে- তিনদিন পরে সেই লাশগুলো (৬টি) ভেসে উঠলো- এটা কি শুধুই নৃশংসতা? নাকি একটি ভয়ানক অসুস্থ সমাজের প্রতিচ্ছবি? কারা এই নৃশংস ও হূদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটাল, তা যেমন জানা যায়নি, তেমনি কেউ ধরাও পড়েনি এখনো পর্যন্ত (এ লেখাটি যখন লিখছি)। এই ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগেই অপহূত হয়েছিল বেলার নির্বাহী প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বক্কর সিদ্দিকি। তখন দেশব্যাপী গণমাধ্যম, সরকার ও পুলিশি ব্যাপক তত্পরতার কারণে ৩৫ ঘণ্টার মধ্যে তিনি অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছিলেন। যদিও কারা তাকে অপহরণ করেছিল সেই বিষয়টি আজঅবধি যেমন অস্পষ্ট রয়েছে, তেমনি অপহরণকারীদের কাউকেই পুলিশ বা র্যাব ধরে এনে তাদের কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর স্পষ্ট করতে পারেনি। তারও বেশ আগে নারায়ণগঞ্জে নিরীহ কিশোর ত্বকি হত্যার ঘটনাটি দেশজুড়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল- কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ঘটনাটিরও কোনো সুরাহার মুখ আজো দেখল না মানুষ। এরূপ আরও অনেক অপহরণ বা গুমের ঘটনা রয়েছে সারা দেশব্যাপী। অপহূতদের স্বজনরা যেমন ভয় ও উত্কণ্ঠার মধ্যদিয়ে তাদের মুহূর্তগুলো অতিবাহিত করছেন, তেমনি দেশবাসীও আজ ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত রয়েছেন এসব চলমান ঘটনায়। ভেবে গা শিউরে উঠে যে, যে মানুষটি একটু আগেই হয়তো আপনার সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন, কোনো অজানা কারণে একটু পরেই সে এখন আর আপনার মাঝে নেই। কারণ নিয়তির পরিহাস। সে হয়তো আর কখনোই ফিরে আসবে না আপনার বা পরিবারের মাঝে। কারণ সে হয়তো অপহূত, নয়তোবা নিখোঁজ কিম্বা মৃত অথবা সে কোনো নদীর তলানিতে ইট বা পাথরের বস্তা পরিবেষ্টিত—এরূপ একধরনের অনিশ্চিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত আতঙ্ক আজ চেপে ধরেছে অনেককে। আমরা সমাজের অনেক অসংগতির সঙ্গে প্রতিদিন আপোষ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। যেমন, নকল বন্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া তো বন্ধ হয়নি। ভেজালমিশ্রিত খাবার অর্থাত্ ফরমালিন, ডিডিটি, সীসা, ক্রোমিয়াম ইত্যাদি কেমিক্যাল মিশ্রিত খাবারে সয়লাব হয়েছে বাজার—কর্তৃপক্ষও দেখছেন, ভোক্তারাও খেয়ে খেয়ে প্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন, অসুস্থ হয়ে মারা পড়ছেন কিন্তু কোনো প্রতিকার যেন নেই। ঘুষ ও দুর্নীতি তো হাত ধরাধরি করে অনেক আগে থেকেই আমাদের সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি বাণিজ্য। যারা সেই বাণিজ্য করেন, তারা সব সময়ই জোরগলায় বড় কথা বলেন- সমাজে প্রতিষ্ঠাও পান তারা ইত্যাদি নানাবিধ ঘটনায় সমাজ আজ কলুষিত, ক্যান্সারে আক্রান্ত— সামাজিক ক্যান্সার। পরিত্রাণ কোথায়? পরিত্রাণের কোনো লক্ষণ বা উপায় কি আমরা অদূর ভবিষ্যতে দেখার আশা নিয়ে বাঁচতে পারি? আমরা যদি গভীরভাবে ভেবে দেখি, তাহলে এসব ঘটনাকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা দুর্ঘটনা বলা যাবে কি? যাবে না। এগুলো বরং দীর্ঘদিনের চলমান সামাজিক অন্যায়, অবিচার, জুলুম সর্বোপরি আমাদের নৈতিক চরম অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ বটে। অপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না, আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায় না, অপসংস্কৃতির বিস্তার রোধ হয় না, উল্টো অপরাধীরা সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়, পুরস্কৃত হয়, হত্যা করেও দূতাবাসে চাকরির সুযোগ পায়, এমপি-মন্ত্রীও হয়, তখন সমাজের এসব ক্রম-বর্ধমান খুন, গুম, অপহরণ বা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো কোনো অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক ঘটনার অংশ হতে পারে না- এগুলো বরং প্রবহমান সামাজিক ক্যান্সারেরই অংশমাত্র। যারা গুম, অপহরণ, হত্যা বা সমাজের নানান রকমের জঘন্যতম অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, তাদেরকে কি আমরা মানুষ বলে গণনায় আনতে পারি? তারা হচ্ছে একধরনের লেজহীন মনুষ্যরূপী ভীত প্রাণী যারা কচ্ছপের ন্যায় মাথা হঠাত্ বের করে কাজ সম্পাদন করে নিমিষেই খোলসের মধ্যে লুকিয়ে যায়। সংখ্যায় এই ভীত প্রাণীরা যে বেশি থাকে তাও নয়। এদের আশ্রয়দাতা থাকে অনেক সময়ই কোনো না কোনো মনস্টার বা গডফাদার। এদেরকে দমানো ছাড়া সমাজে শান্তির সুবাতাস আসবে না। এসব অপকর্মকারীর অপকর্ম দমাতে তাই আমাদের সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এগিয়ে আসতে হবে। একটি সুস্থ সমাজ পেতে হলে আমাদের চিন্তার মধ্যেও সুস্থতা থাকতে হবে। আমাদের আদর্শ ও নৈতিকতার উন্নয়ন ব্যতীত সেই সুস্থ চিন্তার বিকাশ কীভাবে ঘটবে? সবশেষে প্রয়াত শিক্ষক ও লেখক হুমায়ূন আহমেদের লেখার দু’টি লাইন দিয়ে এই লেখাটি শেষ করছি। “কান্নার মত গভীর কিছু নেই। একজনের দুঃখ অন্যজনকে স্পর্শ করে না। কিন্তু একজনের চোখের জল অন্যকে স্পর্শ করে”। লেখক :ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত। alamrowshon¦gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন