সঠিক ইতিহাস জানতে হবে

আপডেট : ০৪ মে ২০১৪, ২২:০৮
আগের দিনের রাজা-বাদশাদের ইতিহাস আর বর্তমান বিশ্বের রাজনীতিবিদদের ইতিহাসের মধ্যে আকাশ পাতাল এমনকি তারো চেয়ে বেশি পার্থক্য বিদ্যমান। রাজাদের ছিল উজির-নাজির, পাইক-পেয়াদা আর যুদ্ধের জন্য অসংখ্য সৈনিক। তাদের মনে যখন যা ইচ্ছা জাগতো তখন তাই তারা করতেন। তারা অনেকগুলো বিয়ে করতেন। তাদের ছিল বড় রানি ছোট রানি মেজো রানি। তারপরেও তারা প্রমোদ ভ্রমণে যেতেন। নাচ-গান নিয়ে মত্ত থাকতেন। তাদের অসংখ্য উপদেষ্টা থাকা সত্ত্বেও রাজাকে সত্ পরামর্শ দেয়া, রাজার খামখেয়ালী ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি উপস্থাপন করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। রাজা যখন যা বলতেন তারা জ্বি হুজুর, জ্বি হুজুর বলে যেতেন। আর খাজনা আদায়ের ব্যাপারে তারা খুবই কঠিন ও নিষ্ঠুর ছিলেন। নির্মম নির্যাতন ও সীমাহীন অত্যাচার করে তারা খাজনা আদায় করতেন। বাকি রাখা খাজনা মোটেই ভালো কাজ না। আর এসব ব্যাপারে প্রতিবাদ করার কারো কোনো ক্ষমতা ছিল না। সমাজে যদি কয়েকজন প্রতিবাদী হয়ে উঠত, রাজার সৈন্য তাদেরকে ধরে নিয়ে প্রথমে অমানবিক অত্যাচার চালাতেন, তারপর গুম করে ফেলতেন। লাশও আর খুঁজে পাওয়া যেত না। যে রাজার যা চরিত্র ছিল ঠিক সেভাবেই তাদের ইতিহাস লেখা হয়েছে। তাতে কোনোরকম ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাই অত্যাচারী রাজাকে অত্যাচারী বলেই মানুষ জানে কিন্তু বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটটা সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন। রাজতন্ত্র দিনে দিনে উঠে গেছে ও যাচ্ছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের রায়ের মূল্যায়ন হচ্ছে। তাদের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটাতে পারছে। একজন ভালো মানুষ, মানে তাদের মনের মতো মানুষকে ভোট প্রয়োগে নির্বাচন করতে পারছে। একজন এমপি পদপ্রার্থীকে প্রত্যন্ত গ্রামের সবচেয়ে গরীব অশিক্ষিত মানুষটির কাছেও যেতে হয়। তার হাত ধরতে হয়, ভোট চাইতে হয়। গণতন্ত্র উত্তরণে এসবের কোনো বিকল্প নেই। লোকটি নির্বাচিত হয়ে, যদি এলাকার উন্নয়নে কাজ করে, সুখে-দুঃখে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকে, মানুষকে ভালোবাসে, তার কর্মীরা মানুষকে অত্যাচার না করে, চাঁদাবাজি না করে, মানুষের ওপর জুলুম না করে তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে সাধারণ মানুষ তাকে নির্বাচিত করে থাকে। এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। আর কিছু সংখ্যক এমপি আছেন নিজেদের স্বার্থের জন্য সাধারণ মানুষের দিকে পিস্তল তাক করে বা পিস্তল উঁচিয়ে ভয় দেখায়। দেশবাসী এটাকে ভালো চোখে দেখে না। প্রকাশ্যে না পারলেও মনে মনে ঘৃণা করে। এবং একদিন এই ঘৃণার প্রতিফলনও ঘটে থাকে। তবে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনা এই ব্যাপারগুলোকে খুবই সিরিয়াসভাবে নিয়ে তার জ্বলন্ত কিছু উদাহারণও সৃষ্টি করেছেন। যেমন ঐসব উগ্র দুর্নীতিবাজ কুখ্যাত ব্যক্তিকে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নমিনেশন দেননি। এতে প্রমাণ করে আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেন না। জাতিকে কিছু দিতে চায় এরকম ব্যক্তিদেরকে নমিনেশন দিয়েছেন। এতে প্রমাণ করে তিনি যে শুধু গণতন্ত্র চর্চা করেন তা নয়, গণতন্ত্র উত্তরণের জন্য একজন নিবেদিতপ্রাণ। আমাদের দেশে গণতন্ত্রটা সাধারণ নিয়মে আসেনি। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রামের ফসল আজকের এই গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের জন্য রক্তপাত ও জীবনদান বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর গণতন্ত্রকামী কোনো দেশের ইতিহাসে নেই। সেই গণতন্ত্রকে যদি আমরা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারি, তার উত্তরণ ঘটাতে না পারি, তার দায়-দায়িত্ব আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদেরই নিতে হবে। যেমন- একটা দলের প্রধান ভুল করলে, তার খেসারত ওই দলটিকেই দিতে হয়। আর প্রধানমন্ত্রী ভুল করলে তার খেসারত গোটা জাতিকেই দিতে হয়। যে ভুল করলে দেশ ও জাতির ব্যাপক ক্ষতি হয় এমন ভুল তারা করবেন কেন? কারণ একজন দলীয় প্রধান ব্যাপক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি। তারা একটি দলকে পরিচালনা করেন আবার ক্ষমতায় এলে একটি দেশকে পরিচালনা করে থাকেন। তাদের মুখের দিকে মানুষ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। অবশ্যই তারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকেন। দিনরাত বিরামহীনভাবে কাজ করে থাকেন। তাতে কখনো সফল হন, কখনো ব্যর্থ হন। ওই ব্যর্থতার দায়ভার একসময় তাদেরকেই বহন করতে হয়। পরবর্তী সময়ে ওই দলটি আর ক্ষমতায় আসতে পারে না। কারণ রাজনীতিবিদদের বিচারের ক্ষমতা থাকে সাধারণ জনগণের হাতে। নির্বাচন এলেই ওই ক্ষমতাটুক প্রয়োগ করে দেয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে। গণতন্ত্রের চর্চা আছে। তার উত্তরণের জন্য রাজনীতিবিদরা নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই গণতন্ত্রের সঠিক ইতিহাস আছে— সেটা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, দুর্বার আন্দোলন, জেল-জুলুম, নির্যাতন- তারপর যুদ্ধ, ওই যুদ্ধে ত্রিশলাখ লোক শহীদ হওয়ার পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বিশ্বের মানচিত্রে ঠাঁই পায়। জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। বাঙালির সবচেয়ে গর্বের ধন এই স্বাধীনতা। মানে আলাদা একটি দেশ। এই স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অনেক বির্তকের সৃষ্টি হয়ে থাকে। যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। এই বিষয়টা গোটা জাতির জন্যই একটা কলঙ্কজনক ব্যাপার। ফলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাসটা জানতে পারছে না। যদিও সঠিক ইতিহাস লেখা হচ্ছে, কিন্তু অন্য দলটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে তা পরিবর্তন করে তাদের মতো লিখে। ফলে তরুণদের মাঝে একটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। আমরা এর অবসান চাই। লেখক : শিশু-সাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন