আলোকপাত

পানীয়জলে আর্সেনিক ফ্লোরাইডের বিভীষিকা

আপডেট : ০৪ মে ২০১৪, ২২:০৮
পানিই জীবন-এ কথাটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু আজকে উত্তরাঞ্চলসহ সারাদেশে পানীয়জল একটা বড় সমস্যা। পানি না থাকার সমস্যা, পানি প্লাবনের সমস্যা, পানীয়জলে রাসায়নিক দ্রব্যের সমস্যা। সম্প্রতি দেশের কয়েকটি অঞ্চলে পানীয়জলে পাওয়া যাচ্ছে বিষাক্ত আর্সেনিক ও ফ্লোরাইড যা জনস্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানির মাধ্যমে যেসব রোগ হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো আর্সেনিকযুক্ত পানি। দীর্ঘদিন এ পানি ব্যবহার করলে আর্সেনিক বিষক্রিয়া বা আর্সেনিকোসিস হয়। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে পানীয়জলে প্রচুর পরিমাণে আর্সেনিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ওই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার কম গভীরতার কূয়া ও টিউবওয়েলগুলোতে ২৭ শতাংশের বেশি আর্সেনিক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পানি পান করায় প্রভাব পড়ে ত্বকে বা চামড়ায়। এতে ত্বকের রং পরিবর্তন, ত্বকের ক্যান্সার, কিডনি বা বুকে ক্যান্সারের আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে দেশের পাহাড়ি অঞ্চলের আশপাশের এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে ফ্লোরাইড থাকা প্রাকৃতিক ব্যাপার। কিন্তু তা মানুষের জন্য ক্ষতিকারক। দাঁতের ক্ষয় রোগ নিরাময় করতে অবশ্য ফ্লোরাইড কিছুটা উপকারী। এজন্য টুথপেস্ট মেশানো হয়। কিন্তু ফ্লোরাইডের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এক হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যুরো বিশেষজ্ঞদের মতে, পানীয়জলে প্রতি লিটারে ১ মিলিগ্রাম ফ্লোরাইড থাকতে পারে। এটি বাংলাদেশি মান। কিন্তু এ পরিমাণের চেয়ে বেশি হলে অর্থাত্ দু’মিলিগ্রাম থেকে বেশি থাকলে ওই পানি কোনও অবস্থায়ই ব্যবহার করা উচিত নয়। এ বিকৃতির কোনও চিকিত্সা নেই। ফ্লোরাইড মানুষের শরীরে খুব ধীরে ধীরে ক্রিয়া করে। অতিরিক্ত ফ্লোরাইড মানবদেহে হাড়ে জমা হয়। হাড় থেকে ক্যালসিয়ামের অংশ বেরিয়ে গিয়ে মাংসপেশি, গাঁট এবং অন্যান্য অংশে জমা হতে থাকে। ফলে হাড়ের গঠনও বাধাগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকৃত হয়। হাড়ের গাঁটে গাঁটে ক্যালসিয়াম জমা হয়ে দেহের জোড়াগুলো বিকল হয়। গাঁটগুলো নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারায়, মানবদেহে অনবরত যন্ত্রণা আরম্ভ হয়। পেটের ব্যথা, বমি ইত্যাদি কিছু সমস্যা নিয়মিতরূপে দেখা দেয়। শরীরের স্বাভাবিক গঠন ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। কৈশোর ও বৃদ্ধাবস্থার লক্ষণগুলো দেখা দেয়। এটা সমাজের পক্ষে একটি মর্মান্তিক ঘটনা এবং এটি একটি জাতীয় সমস্যা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ নিয়ে কয়েক মাস থেকে চর্চা চলছে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা হচ্ছে। আমাদের হাতে ইতিমধ্যে যেসব তথ্য এসে পৌঁছেছে, তা জেনে পাঠকরা হতভম্ব হয়ে পড়বেন। সেসব পানি আর্সেনিক ও ফ্লোরাইডমুক্ত কিনা, তা খুব শীঘ্র জরিপ হওয়া প্রয়োজন। ফ্লোরাইডযুক্ত পানি খেয়ে বেশ কিছু মানুষ তাদের কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে বলে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। এ ধরনের কর্মক্ষমতাহীন মানুষ শারীরিক পরিশ্রম করতে অপারগ। তারা দুঃখভরা জীবন নিয়ে বেঁচে আছে। দেখা গেছে, ফ্লোরাইড ও আর্সেনিক আক্রান্তদের সঙ্গে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন স্থানীয় লোকজন সামাজিক সম্পর্কও রাখছেন না। এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে? পত্র-পত্রিকায় আর্সেনিক ফ্লোরাইডযুক্ত পানীয়জলের কুফল নিয়ে জনসচেতনতা জাগ্রত করা দরকার। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো গ্রামে গ্রামে লিফলেটের মাধ্যমে প্রচারপত্র, প্লে-কার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে পারে। দেশের প্রত্যেকটি স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষক রয়েছেন। তারাও নিজ নিজ স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয় লোকজনদের নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে স্কুলে স্কুলে মাসে একটি বা দু’টি শুক্রবার কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেন। তাছাড়া পানীয়জলের ক্ষেত্রে সরকারের একটা নির্দিষ্ট পানিনীতি থাকা দরকার। বিষয়টি ভুক্তভোগী অঞ্চলের মানুষের স্থানীয় সমস্যা বলে ঠেলে দেয়া উচিত হবে না। লেখক :সাংবাদিক-কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন