বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পানি সংকট চলিতেছে। কোন কোন এলাকায় কয়েকদিন, এমনকি এক মাস যাবত্ পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ না থাকায় একরকম হাহাকার পড়িয়া গিয়াছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এই সংকট আগে পুরাতন ঢাকায় বেশি দেখা যাইত। এখন নূতন বা অভিজাত এলাকায়ও প্রকটভাবে পানির অভাব পরিলক্ষিত হইতেছে। যেমন-গুলশান-১ ও ২, বারিধারা, বসুন্ধরা, মহাখালী, কাওরানবাজার, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর প্রভৃতি। ইহার পাশাপাশি সাধারণত যেসব এলাকায় এই গরমকালে প্রায়শ পানি সংকট দেখা দেয়, তাহা হইল—লালবাগ, পোস্তগোলা, শ্যামপুর, পল্লবী, আদাবর, মিরপুর, গাবতলী প্রভৃতি। গুলশান-বনানী এলাকায় পানি সংকটের কারণে অনেক দেশি-বিদেশি নাগরিক এলাকা ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছেন বলিয়া জানা যায়। ওয়াসার গাড়িযোগে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও অনিয়ম দেখা যাইতেছে। পানির অপর নাম জীবন। তাই জীবন রক্ষার্থে অনেক এলাকার মানুষ সপরিবারে বিক্ষোভ মিছিল করিয়া যাইতেছেন। তাহাদের ক্ষোভ ও দুর্ভোগের কথা প্রতিদিন প্রচার করিতেছে টেলিভিশনগুলি। সংবাদপত্রের প্রতিবেদকরা সরেজমিনে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া লিখিয়া যাইতেছেন এলাকাবাসীর দুর্দশার কথা। কিন্তু সংকটের আশু সমাধান হইতেছে না বলিয়া হাহাকারও থামিতেছে না।
প্রধানত দুই ধরনের পানির সংকট দেখা দিতেছে এই তিলোত্তমা নগরীতে। প্রথমত অতি গরমের কারণে নাগরিকদের পানির চাহিদা বাড়িয়া যাইতেছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ নাই। রাজধানীতে দৈনিক পানির চাহিদা ২২৫ কোটি লিটার হইলেও সরবরাহ করা হইতেছে ২০৫ হইতে ২১০ কোটি লিটার। তাহার পর লোডশেডিংয়ের কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। দ্বিতীয়ত চাহিদামাফিক পানির সরবরাহ আছে বটে, কিন্তু তাহা সুপেয় বা বিশুদ্ধ নহে। কোন কোন অঞ্চলে ওয়াসার লাইনে লিকেজ থাকায় তাহা দিয়া কোন কোন সময় ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করে। ইহাতে পানি দূষিত হয় এবং কখনও কখনও সৃষ্টি হয় দুর্গন্ধ। এই দূষিত পানি পান করিয়া পেটের পীড়াসহ নানা অসুখ-বিসুখ দেখা দেয়। ঢাকা ওয়াসা চারটি পানি শোধনাগার ও ছয় শতাধিক গভীর নলকূপের মাধ্যমে এই মহানগরীতে পানি সরবরাহ করিতেছে। রাজধানীর মোট চাহিদার ৮৫ ভাগই ভূ-গর্ভস্থ পানি দ্বারা মিটানো হইতেছে। এই পানির মান নিয়া তেমন অভিযোগ নাই। কিন্তু বাকি ১৫ ভাগ পানি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট হইতে সরবরাহ করিবার কারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই সমস্যা বা অবিশুদ্ধতার অন্যতম কারণ বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানির দূষণ। সাধারণত গ্রীষ্মকালে নদ-নদীর পানিতে এমনিতেই অধিক মাত্রায় ঘোলাটে অবস্থা বিরাজ করে। অনেক সময় অতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করিয়া পানি পরিশোধনের কারণে পানির স্বাদ ও গন্ধে কিছুটা পারিবর্তন আসে বৈকি। সেই পানি ফুটাইয়া খাইলে রোগ-জীবাণু তেমন আর থাকে না। তাহাছাড়া চোরাই লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ও বাসাবাড়ির পানির ট্যাংকি ব্লিচিং পাউডার দিয়া নিয়মিত পরিষ্কার না করিবার কারণেও সমস্যা দেখা দেয়। এই ব্যাপারে এই সময়ে ওয়াসা ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করিতে পারে।
যাহা হউক, পানি সংকট রাজধানীতে সারা বত্সর থাকে না। কেবল গ্রীষ্মকালে এই সংকট চরম আকার ধারণ করে। প্রতি বত্সরই এই সময় কম-বেশি সমস্যা দেখা দেয়। তাই এই সংকট নিরসনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। রাজধানী ঢাকায় তুলানামূলকভাবে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকায় রাজধানীমুখী জনস্রোত ক্রমাগতভাবে বাড়িতেছে। বর্তমানে এই মহানগরীতে লোকসংখ্যা দেড় কোটি ছাড়াইয়া গিয়াছে। এই অবস্থায় হয় রাজধানীর উপর হইতে জনসংখ্যার এই চাপ দূর করিতে হইবে কিংবা বর্ধিত জনসংখ্যার অনুপাতে পানি, গ্যাস, বিদ্যুত্ ইত্যাদি নাগরিক সুবধািগুলি বৃদ্ধি করিতে হইবে। আবার পুরাতন পানির লাইনগুলিও সংস্কার করিতে হইবে। এই সংস্কারের কাজ সংকটের সময় না করিয়া আগেভাগে করিতে পারিলে নাগরিকদের দুর্ভোগ কমিয়া যাইবে। তাহাছাড়া বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ রোধে সকলকে হইতে হইবে সচেতন ও দায়িত্বশীল।
