মানবসৃষ্ট কোনো দুর্যোগের দায় হয়তো কাহারও উপর চাপানো যায়, কিন্তু কোনো দুর্যোগ যদি নিতান্তই প্রাকৃতিক কারণে ঘটিয়া থাকে তাহা হইলে ইহাকে নিয়তি ছাড়া আর কি-ই বা বলা যাইতে পারে! গত শুক্রবার তাজিকিস্তান, চীন ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ বাদাখশানের আব বারিক গ্রামে ঘটিয়া গিয়াছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। স্থানীয় সময় ১১টায় বৃষ্টি পরবর্তী পাহাড় ধসে চাপা পড়িয়া প্রাণহানি ঘটিয়াছে কমপক্ষে ২১০০ জনের। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, মৃতের সংখ্যা বাড়িতে পারে আরও কয়েকশত, আহতের সংখ্যা কয়েকগুণ। প্রদেশের এই অঞ্চলটি হইল বিশ্বের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার একটি। দারিদ্র্যের কষাঘাতে পীড়িত মানুষের বেশিরভাগই নিরক্ষর। প্রতি বত্সরই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটিলেও দুর্যোগের পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার কোনো ব্যবস্থাও গড়িয়া উঠে নাই এই অঞ্চলটিতে। অন্যদিকে যুদ্ধের জন্য এই অঞ্চলটি এমনিতেই ক্ষত-বিক্ষত। কয়েক দশকব্যাপী চলমান যুদ্ধে অঞ্চলটির অধিবাসীরা যেমন তালেবানি উত্পাত সহ্য করিয়া চলিয়াছে তেমনি পশ্চিমা শক্তিগুলির সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধে এই দেশটি উন্নয়নের পরিবর্তে পিছাইয়া পড়িয়াছে কয়েক যুগ।
শিক্ষাক্ষেত্রে এই দেশটি বিশ্বের সর্বনিম্ন সারির একটি। ফলে দারিদ্র্য একরকম স্থায়ী আবাস গড়িয়া লইয়াছে এইখানে। বিশ্বময় প্রযুক্তির উত্কর্ষ সাধনে অনেক অসম্ভব সাধন হয়ত হইয়াছে কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতা যেন আফগানিস্তানকে চিরতরে বাছিয়া লইয়াছে। যেইখানে না রহিয়াছে জীবনের নিরাপত্তা, না করা হইয়াছে মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত। আফগানিস্তান এমন একটি ভূমিতে পরিণত হইয়াছে যেইখানে মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু বিরল ঘটনা। নিত্যদিন আত্মঘাতী বোমার আঘাতে অগণিত প্রাণ ঝরিয়া পড়ে, অস্বাভাবিক মৃত্যুই যেন স্বাভাবিক হিসাবে মানিয়া লইতে হয় আফগানদের। কিন্তু তাহার পরও এমন মৃত্যু মানিয়া লওয়া দুষ্কর, পাহাড় ধসে এত বিপুলসংখ্যক হতাহতের ঘটনা বিরল। শত শত বাড়িঘর মাটির নিচে চাপা পড়িয়া গিয়াছে, চাপা পড়া লোকজনের বাঁচিয়া থাকিবার সম্ভাবনা আর নাই বলিয়া ইতোমধ্যেই উদ্ধার তত্পরতার সমাপ্তি ঘোষণা করা হইয়াছে সরকারিভাবে। আফগানিস্তানে গত শনিবার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত আব বারিক গ্রামের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘরের সামনে বাঁচিয়া যাওয়া স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হইয়া উঠিয়াছে। নিথর চোখে তাকাইয়া থাকা স্বজনটি যখন আবেগাপ্লুত স্বরে বিলাপ করিতেছে, মানব মন তখন ইহাদের সমব্যথী ও শোকাহত না হইয়া পারে না। দেশটিতে এহেন মানবিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশের মানুষের হূদয়কে ব্যথিত করিয়াছে সমভাবে। এই দেশের গণমাধ্যমগুলিও সার্বক্ষণিক প্রাপ্ত সংবাদের যতটুকু সম্ভব জানাইবার চেষ্টা চালাইয়াছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশও দুর্গতদের সাহায্যে আগাইয়া আসিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছে। কোনোরূপ বিলম্ব ব্যতিরেকে ওইসকল ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাইতে হইবে। আফগানিস্তানে মানবতার এহেন বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে বিবদমান রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলি সকল প্রকার বিভেদ ভুলিয়া মানবতার কাজে আগাইয়া আসিবে—আমাদের প্রত্যাশা ইহাই।
