মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রথম শর্তই হলো প্রাথমিক শিক্ষা। যে কারণে সংবিধানে শিক্ষাকে সার্বজনীন ও বাধ্যতামূলক করে জাতিকে নিরক্ষরমুক্ত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর অর্পণ করা হয়েছে। এই দায়িত্ব সফলভাবে পালনের জন্য সরকারের দিক থেকে আন্তরিকতার অভাব নেই। ‘সবার জন্য শিক্ষা’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ ভর্তি ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন নিশ্চিত করা দরকার। এ লক্ষ্যে সরকার প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান করছে, তাদেরকে বিনামূল্যে বই দিচ্ছে, এছাড়াও স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, শিক্ষার্থীদের বাড়ি পরিদর্শন, মা সমাবেশ ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমছে তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রথমত দারিদ্র্য এবং সে সঙ্গে নদী ভাঙ্গন, পরিবারের স্থানান্তর, বাড়ি থেকে স্কুল দূরে হওয়া ইত্যাদি নানাবিধ কারণে স্কুলে ভর্তি হওয়া শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষাচক্র প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সমাপ্ত না করেই স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘প্রাথমিক শিক্ষায় পাঁচ বছরের অর্জন ২০০৯-২০১৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, স্কুলে ভর্তির হার প্রায় ৯৬.৭০ শতাংশ হলেও প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপ্তির হার মাত্র ৭৩.৮০ শতাংশ।
পরিসংখ্যান মতে, স্কুলে যাওয়ার বয়সী প্রায় চার শতাংশ শিশু স্কুলে ভর্তিই হচ্ছে না। এটা সরকারি হিসেব। বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটি আরো অনেক বেশি। যেমনিভাবে সরকারি হিসেবে ঝরে পড়ার হার ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি হিসেবে এই হার ৪০ শতাংশের বেশি। শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া কিংবা স্কুলে ভর্তি না হওয়ার এই চিত্রটি একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকার প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন এবং স্কুলে গমনোপযোগী সকল শিশুকে স্কুলের আওতায় এনে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নয়টি উন্নয়ন সহযোগী দাতা সংস্থার অর্থায়নে বৃহত্ আকারের সেক্টর ওরাইড প্রোগ্রাম তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বা পিইডিপি-৩ গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় শতভাগ শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাসহ ঝরে পড়া কমানোর উপর জোর দেয়া হয়েছে। তাছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করাও এই কর্মসূচির লক্ষ্য।
সাম্প্রতিককালে সরকার শিক্ষার প্রতি শিশুদের আগ্রহী করে তুলতে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বাড়াতে এবং ঝরে পড়া রোধ করতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি শিশু আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জগতে প্রবেশের পূর্বে প্রয়োজনীয় শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, ভাষাগত ও সামাজিক দক্ষতা অর্জন করে। শেয়ার শিক্ষা কর্মসূচির মতো এনজিও পরিচালিত অন্যান্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচিতেও এই ধরনের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। যার মাধ্যমে এনজিওরা সরকারি স্কুলে শিশু ভর্তিতে অবদান রাখছে। এছাড়াও শেয়ারের মতো উপানুষ্ঠানিক কর্মসূচির মাধ্যমে এনজিওরা সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পড়ুয়া লেখাপড়ায় পিছিয়ে থাকা শিশুদের কোচিংয়ের ব্যবস্থা করে থাকে যাতে করে তারা অগ্রগামী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমানতালে লেখাপড়া করতে পারে।
এভাবেই এনজিওরা সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে সবার জন্য শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে। এনজিওরা যখন কোন একটি এলাকায় উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক স্কুল চালু করতে যায় তখন প্রথমে ওখানকার সরকারি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে স্কুলের চাহিদা আছে কিনা যাচাই করে। এরপর প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে তার স্কুল থেকে ঝরে পরা শিক্ষার্থীদের এনজিও স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে তার অনাপত্তিপত্র নেয়। এরপর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে। এভাবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তায় এনজিওরা দেশের চর, হাওর, পাহাড়ী এলাকা, বস্তিসহ দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উপানুষ্ঠানিক স্কুল চালু করে। অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি যে, স্থানীয় পর্যায়ে এনজিওদের সঙ্গে সরকারের দপ্তরগুলোর কাজের এক ধরনের সমন্বয় আছে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে একই ধরনের সমন্বয় না থাকায় এবং সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাবে এবং স্থানীয় পর্যায়ের শিক্ষা দপ্তরের স্থানীয় শিক্ষার ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা না থাকায় উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োজিত এনজিওদের নিজেদের মধ্যে এবং সরকারের সঙ্গে এনজিওদের কাজের সমন্বয়হীনতা প্রায়শ লক্ষ্য করা যায় যা শিশু শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত গরিব শিশুদের লেখাপড়ায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এই অবস্থার অবসানে সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসা দরকার।
লেখক :যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, শেয়ার শিক্ষা কর্মসূচি
[email protected]
