প্রথমে কয়েক জন বোর্ড পরিচালক আলাদা করে তার সঙ্গে বসলেন। এরপর বোর্ড সভাপতি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা করলেন। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেদের আগের সব অবস্থান ভুলে গিয়ে ২০১৫ বিশ্বকাপ পর্যন্ত কোচ হিসেবে শেন জার্গেনসেনকে রেখে দেয়া; কিন্তু দফায় দফায় বৈঠকে কোনো কাজই হলো না। জার্গেনসেন তার অবস্থানে অটল রইলেন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও (বিসিবি) এই জটিলতা আর প্রলম্বিত করতে চাইলো না। জার্গেনসেনের চাহিদামতো অনতিবিলম্বেই তাকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো বিসিবি। ফলে গতকালই কার্যত শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশে জার্গেনসেনের কোচিং অধ্যায়।
বোর্ডের জরুরি সভাশেষে সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এই তথ্য নিশ্চিত করে জানালেন, তারা ইতিমধ্যে নতুন কোচ খোঁজার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। সে জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটিও করা হয়েছে। দেশি কোচের প্রতি তাদের আগ্রহ থাকলেও এই দফাতেও বিদেশি কোচই বিসিবি খুঁজছে বলে জানালেন পাপন।
জার্গেনসেন তার পদত্যাগপত্রে বলেছিলেন, তাকে চাইলে ভারতের বিপক্ষে জুন মাসের সিরিজ পর্যন্ত রাখতে পারে বিসিবি। শুরুতে একদমই তাকে ছেঁটে ফেলার পক্ষে থাকা বিসিবি অবস্থান বদলে তাকে বুঝিয়ে বিশ্বকাপ পর্যন্তই রাখতে চাচ্ছিল। সেটা রাজি না হওয়াতে তাত্ক্ষণিক পদত্যাগপত্র গ্রহণের পথেই বিসিবি হেঁটেছে বলে বললেন সভাপতি, ‘ওর চিঠিতে আমরা দেখেছি, বললে সে ভারতের সফর পর্যন্ত থাকতে পারে। এই ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা হয়েছে। সে নিজেও মনে করে, আর আমাদেরও মনে হয়েছে, যদি তাকে ছেড়েই দেয়া হয়, এখন ছেড়ে দেয়া ভালো। কিছু দিনের জন্য থাকবে, পরে আবার চলে যাবে, এটা দলের জন্য ভালো হবে না। বোর্ডের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আমরা ইমিডিয়েটলি তাকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তবে এই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সভাপতি নিজে এই অস্ট্রেলীয় কোচের কাছ থেকে বুঝতে চেয়েছিলেন, আসলে সমস্যাটা কোথায়। সেই আলোচনার ফলে অন্তত তার মনে হয়েছে, পরিবারকে সময় দেয়াটা পদত্যাগের একটা কারণ কোচের, ‘তার সঙ্গে আজকে আমি লম্বা বৈঠক করেছি। আলাপ-আলোচনা করে বোঝার চেষ্টা করেছি পদত্যাগপত্র দেয়ার কারণটা কি। তার সঙ্গে কথা বলে আমি যেটা বুঝলাম ছোট-খাটো অনেক ব্যাপার রয়েছে। তবে মূলত ছয় বছর ধরে সে বাড়ির বাইরে, সে বাসার কাছে, অস্ট্রেলিয়ার আশাপাশে কোথাও যদি একটা ভালো অফার পায় তাহলে সে তার জন্য আগ্রহী।’
একই সঙ্গে দলের পারফরম্যান্সও যে জার্গেনসেনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রভাব রেখেছে, সেটাও মনে করছেন পাপন, ‘দলের পারফরম্যান্সও ভালো যাচ্ছে না এই বছর। যদিও আমি তাকে বলেছি এই টিম ও এই কোচের অধীনেই আমরা এর আগে ভালো পারফরম্যান্স করেছি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আমরা ভালো খেলেছি, ওদের হোয়াইটওয়াশ করেছি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আমরা ভালো খেলেছি। শ্রীলঙ্কায় ভালো খেলেছি। ফলে খারাপ পারফরম্যান্স তেমন ইস্যু হওয়ার কথা না।’
আসলে সব কথার শেষ কথা, জার্গেনসেন আর থাকছেন না। সে ক্ষেত্রে নতুন কোচ খুঁজতে হবে। আর সেই কোচ খোঁজার জন্য একটা কমিটিও করে ফেলেছে বিসিবি, ‘একটা কমিটি করে দিয়েছি। বিশেষ কমিটি যারা নাকি নতুন কোচ আর সাপোর্ট স্টাফ এদের ব্যাপারে আমাদের জানাবে। আশা করছি এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নতুন কোচ এবং স্টাফ পেয়ে যাব। কমিটিতে মাহবুব আনাম, জালাল ইউনুস, আকরাম খান, খালেদ মাহমুদ ও নাঈমুর রহমান দুর্জয় আছেন।’
পাপন আশা করছেন, এই কমিটি দ্রুতই সাপোর্ট স্ট্যাফসহ একজন বিদেশি কোচকে নিয়োগ দিয়ে ফেলতে পারবেন। তিনি বলছেন, ইতিমধ্যে কয়েক জনের সঙ্গে আলাপও হয়েছে তাদের। আর নিতান্ত এই সময়ে বিদেশি কাউকে পাওয়া না গেলে দেশের কেউ হয়তো অন্তর্বর্তীকালীন হিসেবে ভারতের বিপক্ষে সিরিজটায় কাজ চালাবেন, ‘আমরা আশা করি পেয়ে যাব। পদত্যাগপত্র পাওয়ার পর থেকেই আমরা বসে নেই। আমরা কাজ করছিলাম। এখন পর্যন্ত যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে পেয়ে যাবে। সমস্যা হচ্ছে কোনো কোচ তো একেবারে ফ্রি না। সে যেখানে আছে সেখান থেকে ছাড়তে তার কতদিন লাগবে সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমনিতে দুইয়েকজন দ্রুত আসার ব্যাপারে
ইন্টারেস্ট শো করেছে। যদি পেয়ে যাই ভালো আর না পেলে স্থানীয় কাউকে দিয়ে এই ভারতের সফরটা শেষ করবো।’
বিসিবি শুধু হেড কোচ খুঁজছে, তা নয়; তাদের এখন ডেভলপমেন্ট কোচ চাই, বিশেষজ্ঞ কোচ চাই কয়েক জন, চাই হেড কোচ। আর সব মিলিয়ে বেশ কয়েক জন আলোচনার মধ্যে আছেন। তবে সভাপতি কারো নাম বলতে চাইলেন না, ‘সব জায়গায় যোগাযোগ করেছি এবং করছি। প্রায় পাঁচ-ছয় জনের সঙ্গে কথা চলছে। আমাদের ডেভেলপমেন্টের জন্য আমরা কোচ খুঁজছি, আমাদের জাতীয় দলের জন্য কোচ খুঁজছি, ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ কোচ খুঁজছি। কারো নাম বলতে পারছি না। তারা কোথাও না কোথাও কাজ করছে। ওদের জন্য সমস্যা হয়ে যাবে।’
স্বভাবতই প্রশ্ন এলো যে, দেশি কোচ নয় কেন? পাপন বললেন, দেশি কোচ তারা পছন্দ করেন, তবে এখনো সে সময় আসেনি, ‘লোকাল কোচের প্রতি অবশ্যই আমাদের একটা ফ্যাসিনেশন আছে; কিন্তু সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলে যেটা বুঝলাম, আমাদের জাতীয় দল এখন যে লেভেলে আছে আর বিশ্বকাপ এতো বড় দায়িত্ব নেয়ার মতো এখনো লোকাল কোচ কেউ নেই।’
