ব্রডব্যান্ড সচেতনতা ও কার্যকারিতা

আপডেট : ০৬ মে ২০১৪, ২০:০৫
১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে বর্তমানে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১১ কোটি। অন্যদিকে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে মাত্র ৩ কোটি ৫৫ লাখ ২২ হাজার মানুষ। দেশে ২ ধরনের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে—মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই ব্যবহার করেন মোবাইল ইন্টারনেট এবং বাকি ৫ শতাংশ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে যুক্ত। আবার তুলনামূলকভাবে ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীও আমাদের দেশে অনেক কম। ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ডের ব্যবহার আর এর গ্রাহকসংখ্যা বাড়াতে পারলেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। বর্তমান সরকার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্পের আওতায় সরকার আশা করে ২০২০ সাল দেশের মোট জিডিপির ২.৬ শতাংশ বাড়াবে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের ব্যবহার। সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের ৩০ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৪০ শতাংশ জায়গায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। একটি দেশের জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নতির চাবিকাঠি এখন ইন্টারনেট। ইন্টারনেট অর্থনীতিতে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কারণ বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগের মূল বাহনই হলো ইন্টারনেট। দেশের সব মানুষকে ইন্টারনেট সেবার আওতায় আনতে পারলে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাবে। কিন্তু এটা করতে গেলে ইন্টারনেট মানুষের জীবনের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়, সেটা মানুষকে বুঝাতে হবে। এক কথায় ইন্টারনেটের সহলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এর ব্যবহার সম্পর্কেও অবগত হতে হবে। শীর্ষস্থানীয় ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে বর্তমানে দেশের তরুণ সমাজ কাজ করছে। বিশ্বের শীর্ষ আউটসোর্সিং দেশগুলোর মধ্যে এখন বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। আমদানিনির্ভর আমাদের দেশে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ রয়েছে, তার একটি বড় অংশ আসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে। প্রবাসীদের অর্জিত এই অর্থের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে আউটসোর্সিং। এক হিসাবে দেখা যায়, ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী ৪৫৩ বিলিয়ন ডলারের কাজ আউটসোর্স হবে। এর ১০% মার্কেট শেয়ার আমরা নিতে পারলে এই খাত থেকে আমাদের আয় হবে ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এমনকি এই কাজের ৫% মার্কেট শেয়ার নিতে পারলেও তাতে আমাদের আয় হবে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বর্তমানের সবচেয়ে বড় খাতকে অতিক্রম করবে। আমাদের দেশের প্রায় ৫০ শতাংশই নারী। আর এ নারীদের একটি বিশাল অংশ জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে—এমন কাজ খুব কমই করেন। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ চাইলে বাসায় প্রতিদিন ৩-৪ ঘণ্টা সময় দিলে ঘণ্টাপ্রতি ১ ডলার হিসেবেও প্রতিদিন ৩-৪ ডলার ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করতে পারেন। আমাদের অর্ধেক নারীগোষ্ঠীর মধ্য থেকে যদি ৫০ লক্ষ নারীকেও ফ্রিল্যান্সিংয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এই হিসেবে প্রতিদিন ন্যূনতম দেড় কোটি ডলার আয় করা সম্ভব। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে ডিজিটাল সব সেবা খানিকটা হলেও সহজলভ্য হয়েছে। এখন এসব সেবা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা তৈরি করা। প্রান্তিক পর্যায়ে এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা গেলে তবেই আসবে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল। কিন্তু সুলভে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা আমরা তৈরি করতে পারছি না। গত ৮ বছরে কয়েক ধাপে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের মূল্য মেগাবাইট প্রতি ৭২ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার টাকায় কমিয়ে আনা হলেও ইন্টারনেট গ্রাহকদের কাছে এই মূল্যহ্রাসের সুবিধা পৌঁছেনি। সম্প্রতি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের ওপর থেকে ভ্যাট কমানো হলেও গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের ওপর থেকে কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়নি ভ্যাট। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে ইন্টারনেটের মূল্য শীঘ্রই কমার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। ২০০৪ সালে মোবাইল ফোন গ্রাহকেদের থেকে ইন্টারনেট সেবার চার্জ যেভাবে কিলোবাইটপ্রতি আদায় করা হতো, তা এখনও বহাল রয়েছে। আবার রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই মাত্র ৫০০ টাকা কিংবা ১০০০ টাকায় উচ্চগতির ডেডিকেটেড ব্রডব্যান্ড সংযোগের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। কিন্তু আসলে এসব সংযোগেও গ্রাহককে প্রদান করা হয় শেয়ারড সংযোগ এবং তার গতিকেও শেষ পর্যন্ত উচ্চগতি বলা যায় না। এই ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলার বিষয়ে সরকারেরও নেই কোনো উদ্যোগ। কিন্তু ইন্টারনেটের প্রকৃত সুবিধা উপভোগ করতে হলে একদিকে যেমন প্রয়োজন ভোক্তা পর্যায়ে ইন্টারনেটকে সুলভ করা, অন্যদিকে প্রয়োজন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে ওঠার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা কেবল তখনই সম্ভব হবে। লেখক :বিভাগীয় সম্পাদক, তথ্যপ্রযুক্তি, দৈনিক ইত্তেফাক