জীবনধারণের জন্য, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই তার অধিকাংশই বিষমিশ্রিত ভেজাল খাদ্য। আল্ল্াহর অসংখ্য নিয়ামতের অন্যতম একটি নিয়ামত হল খাদ্য, যা খেয়ে আমরা জীবনধারণ করি। একটা সময় ছিল যখন ছিল না আজকের মত এত এত হিমাগার। সেসময় আমরা পেতাম টাটকা সজীব খাবার। বলতে গেলে একরকম ক্ষেত থেকে তুলে এনেই রান্না করা হতো বিভিন্ন ধরনের টাটকা শাক-সবজি। সেই খাবারের স্বাদ, পুষ্টি আর গন্ধের কথা মনে হলে আজও জিভে পানি আসে। জ্ঞান বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নয়ন, উত্কর্ষতার সাথে সাথে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটছে। উন্নয়ন আর উত্কর্ষতার বিকাশ ঘটলেও মানবতার বিকাশ আজও ঘটছে না।
মনুষ্যরূপী কিছু হায়েনার লোভ আর লালসার শিকার হয়ে প্রতিদিন আমরা বিষ মেশানো বিষাক্ত খাবার খেয়ে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছি। ভেজালে সয়লাব আমাদের বাজার। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের কার্যকলাপের কথা তারা চিন্তাই করতে পারে না। খাদ্যে ভেজাল নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হলেও অবস্থার কোন উন্নতি না হয়ে বরং আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য পুষ্টিকর খাদ্য প্রয়োজন। শরীরে পুষ্টি এবং বুদ্ধিবৃত্তির জন্য আমরা আমাদের সন্তানদের সাধ্যের বাইরে হলেও বাজার থেকে অত্যন্ত চড়ামূল্যে পুষ্টিকর খাদ্য ভেবে কিনে খাওয়াচ্ছি। খাওয়ার অনুপযোগী এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি বিষাক্ত এসব খাদ্যদ্রব্য খাওয়ার ফলে লিভার, কিডনি নষ্ট হচ্ছে। শরীরে নানারকম জটিল রোগব্যাধির জন্ম নিচ্ছে। বিশেষ করে ক্যান্সারের মত মরণব্যাধির প্রকোপ অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পারছি কতটা বিপন্ন আমাদের জীবন। কতটা অসহায় অবস্থায় প্রতিদিনই বিষাক্ত সব খাবার আমরা গ্রহণ করছি। কারণ আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার এমন কোন খাবার নেই যাতে বিষ মেশানো হচ্ছে না। মাছ, মাংস, চাল, ডাল, আটা, ময়দা, ঘি, চিনি, শুঁটকি, তেল, পাউরুটি, কেক, শাক-সবজি, গাজর, সিম, লেটুসপাতা, ক্যাপসিকাম, ফলমূল, কলা, আপেল, আনারস, আম, তরমুজ, দুগ্ধজাত বিভিন্ন ধরনের খাদ্য। শিশুখাদ্যসহ দুগ্ধজাত খাদ্যে অলড্রিন নামক বিষাক্ত কীটনাশক পদার্থ মেশানো হচ্ছে। মসলা থেকে শুরু করে, সুগন্ধি, প্রসাধনসামগ্রীসহ এমন কোন জিনিস নেই যাতে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হচ্ছে না। আটা, চিনি, ময়দার মধ্যে বিষাক্ত চক পাউডার, মরিচ হলুদের গুঁড়ার মধ্যে ইটের গুঁড়া, মাছ, মাংস, সবজি, ফলমূলের মধ্যে ফরমালিন, কলা, টমেটো ইত্যাদি কার্বাইড দিয়ে পাকানো হচ্ছে যা বলে শেষ করা যাবে না। অথচ এসব ভেজালে ভরা বিষাক্ত খাদ্য অত্যন্ত চড়া দাম দিয়ে আমরা কিনে খাচ্ছি। এসবের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় প্রথমত শিক্ষার অভাব এবং দুর্নীতি।
প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত না হওয়ার কারণে যারা উত্পাদনকারী এবং ব্যবসায়ী তাদের মধ্যে ন্যায়-অন্যায় বোধ, মানবিক গুণাবলী, সামাজিক দায়বদ্ধতা, ধর্মীয় অনুভূতি ইত্যাদি না থাকায় অবৈধ এবং অনৈতিক উপায়ে কিভাবে চটজলদি অর্থ উপার্জন করে বড়লোক হওয়া যায় সে চেষ্টায় তারা রত। জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে সে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানুষের খাদ্যের চাহিদা। মানুষ যে হারে বাড়ছে উত্পাদন সে হারে বাড়ছে না। অসাধু ব্যবসায়ীরা আমাদের জীবনকে প্রতি মুহূর্তে বিপন্ন করে তুলছে। তারা ভুলে যাচ্ছে, যে বিষ তারা মানুষকে খাওয়াচ্ছে চক্রাকারে সেই বিষের শিকার সে বা তার পরিবারের সদস্যরাও হচ্ছেন। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে তৃষ্ণা মেটাতে মানুষ উপাদেয় ফল তরমুজ চড়া দামে কিনে খেয়েও মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। আমরা জেনে-শুনে বিষপান করছি এবং আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। দেশে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সংঘবদ্ধভাবে অতি মুনাফার লোভে দিনের পর দিন খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল, বিষ মেশাচ্ছে কিন্তু তাদের দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তি না হওয়ায় অপরাধের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমেরিকার আন্তর্জাতিক সংগঠন খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা (এনএফএসএল) গবেষণাগারে অনুষ্ঠিত এক গবেষণার ফলাফলে জানা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন খাদ্যে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান থাকার যে সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে গবেষণায় ব্যবহূত নমুনাগুলোতে তার চেয়ে তিন থেকে ২০ গুণ বেশি বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। গবেষণায় ৮২টি নমুনা খাদ্য নেয়া হয়। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ খাদ্যেই এমন সব উচ্চমাত্রার বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে যা দেড় দশকেরও বেশি সময় পূর্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়।
এসব কীটনাশকের মধ্যে ডিডিটি, অলড্রিন, ক্লোডেন এবং হেপ্টাক্লোরসহ আরো বিভিন্ন উপাদান যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। গবেষণায় ব্যবহূত সবজির মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ এবং ফলের মধ্যে ৩৫ শতাংশতেই ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক পদার্থ পাওয়া গেছে। জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে আমাদের গড় আয়ু বেড়ে গেলেও ভেজাল খাদ্যগ্রহণের ফলে আমাদের জীবনীশক্তি হ্রাস পাচ্ছে।
খাদ্যে ভেজাল রোধের জন্য জনস্বার্থে সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব অগ্রাধিকারভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশে খাদ্যের মান যাচাই-বাছাইয়ের জন্য শুধু বিএসটিআই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট, বিসিএসআইআর কিংবা আণবিক শক্তি কমিশনে নিয়োজিত স্বল্পসংখ্যক জনবলের উপর নির্ভর না করে অধিকসংখ্যক “র্যাপিড এ্যাকশন টাস্কফোর্স” গঠন করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক এবং দৃশ্যমান আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা সুস্থভাবে বাঁচার নিশ্চয়তা চাই। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এ দেশের মানুষের এটাই এখন অন্যতম চাওয়া।
[ লেখক: গবেষক
[email protected]]
