স্থানীয় জনগণ অবশ্যই তাহাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি বা এলাকার মন্ত্রীকে সংবর্ধিত করিতে পারে। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি বা মন্ত্রীও সেই সংবর্ধনা সাদরে গ্রহণ করিতে পারেন। ইহাতে দোষের কিছু নাই। কিন্তু ডুমুরিয়ায় সমপ্রতি যেই উপায়ে একজন প্রতিমন্ত্রী সংবর্ধনা গ্রহণ করিয়াছেন তাহা আইন কিংবা নীতিনৈতিকতা—কোনো বিচারেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। সরকারি পরিপত্রে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, সংবর্ধনার নামে বিদ্যালয় বন্ধ রাখা কিংবা শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করাইয়া রাখা যাইবে না। এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর সতর্কবার্তাও রহিয়াছে। অথচ তাঁহারই মন্ত্রিসভার একজন প্রতিমন্ত্রীর সংবর্ধনা উপলক্ষে সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করিয়া দুই শতাধিক স্কুল বন্ধ রাখা হইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, সংবর্ধনায় শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করিবার জন্য তাহাদের স্বাক্ষরও নেওয়া হইয়াছে হাজিরা খাতায়। প্রতিমন্ত্রীর হাতে ছয়ভরি ওজনের যেই রূপার নৌকাটি তুলিয়া দেওয়া হয়—স্বল্প বেতনভোগী প্রাথমিক শিক্ষকেরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়া নাকি তাহা তৈরি করিয়া দিয়াছেন! ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অযাচিত এই সাফাই সত্ত্বেও প্রকৃত বাস্তবতা অনুমান করা কঠিন নহে।
সংবর্ধনা যাহারা দিয়াছেন, আর যিনি তাহা গ্রহণ করিয়াছেন, দায় কোনো পক্ষেরই কম নহে। বিস্ময়ের বিষয় হইল, সংবর্ধনার আয়োজকদের মধ্যে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ছাড়াও একটি সরকারি দপ্তরের নামও রহিয়াছে বলিয়া জানা যায়। দপ্তরটি হইল ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়। মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দান একটি সরকারি দপ্তরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কিনা তাহা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাই ভালো বলিতে পারিবেন। তদুপরি যাহাকে সংবর্ধনা দেওয়া হইয়াছে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট নহেন। উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখাই যাহার প্রধান দায়িত্ব সেই কর্মকর্তা অবশ্য ইহার মধ্যে কোনো অন্যায় আছে বলে মনে করেন না। তিনি বলিয়াছেন যে, স্কুল বন্ধ রাখা তাহার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। স্কুল বন্ধ রাখিবার সিদ্ধান্তটি যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তার ‘নিজস্ব’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও তাহা নিশ্চিত করিয়াছেন। নানা কারণে নানা মহল এই ধরনের সংবর্ধনার উদ্যোগ গ্রহণ করিতে পারে কিন্তু তাহা গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী প্রচলিত আইন বা বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকিবেন—তাহা প্রত্যাশিত শুধু নহে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও বটে। ইহাই কি স্বাভাবিক নয় যে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসাবে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করিবেন, তাহাকে দেখিয়া সাধারণ মানুষ আইন মানিয়া চলিতে উদ্বুদ্ধ হইবে? সংবর্ধনা গ্রহণকারী প্রতিমন্ত্রী একদা শিক্ষক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। শিক্ষক হিসাবে তিনি নিশ্চয় স্বীকার করিবেন যে বিদ্যালয় বন্ধ রাখিয়া এবং দরিদ্র শিক্ষকদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করিয়া সংবর্ধনা গ্রহণ সাধারণ নীতি-নৈতিকতার বিচারেও গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না।
আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলির নাজুক দশা কাহারও অজানা নহে। প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত নানা কারণে এমনিতেই প্রায়শ স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। আর তাহার কুফল ভোগ করিতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। এমতাবস্থায় সংবর্ধনার নামে এই ধরনের অনৈতিক ও অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি বন্ধে সংশ্লিষ্ট সকলেই যত্নবান হইবেন— ইহাই প্রত্যাশিত। তবে সীমালঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারকদের নীরবতা যে তাহাদের আরও বেপরোয়া করিয়া তুলিতে পারে—তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
