১৫৪ বত্সর অতিক্রম করিবার পরও এখনও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জীবনের মননশীলতার নিত্যদিনের অংশ। আমাদের যেকোনো শোক বা শক্তি, আনন্দ বা অশ্রুর স্বরলিপি এখনও আমরা রবীন্দ্রনাথের কোনো না কোনো কবিতা বা গানের ভিতরে খুঁজিয়া পাই। প্রায় আড়াই হাজার কবিতা, এক শত’র বেশি ছোটগল্প, তেরোটি উপন্যাস, ছোট বড় মিলাইয়া প্রায় ষাটটি নাটক রচনা করিয়াছেন তিনি। গান লিখিয়াছেন প্রায় দুই হাজার, সুরও দিয়াছেন। তাঁহার সৃষ্টির বিশাল ব্যাপ্তিকে উপলব্ধি ও আবিষ্কার করিবার ভিতরে পাঠকের যে আনন্দ, তাহা অতুল্য। তাঁহাকে অসংখ্যবার পড়িয়াও যেন শেষ করা যায় না। অসীম মহাসাগরের মতো, সূর্যের অফুরান আলোকশক্তির মতো তাহার সৃষ্টিকর্ম। ফরাসিদেশের মানুষের নিকট সুদীর্ঘ চার শত বত্সর পরও যে অমিত শক্তি লইয়া জীবন্ত রহিয়াছেন ভিক্টর হুগো, কিংবা রুশদেশের মানুষের নিকট গোর্কি-তলস্তয়-পুশকিন যেমন যুগ যুগ ধরিয়া প্রাসঙ্গিক রহিয়াছেন, চার্লস ডিকেন্স-কার্লাইল অমর হইয়া রহিয়াছেন ইংরেজিভাষীর কাছে, রবীন্দ্রনাথও তেমনি আমাদের অন্তরে বিকশিত।
ইহা আমাদের জন্য আনন্দের যে, তাঁহার অসংখ্য ছোটগল্প গড়িয়া উঠিয়াছে এই বাংলার পটভূমিতেই। এইখানেই তিনি জীবনের বহুবিচিত্র দিক প্রতিফলিত করিয়াছেন, সৃষ্টি করিয়াছেন বাংলা ছোটগল্পের নবধারা। ছোটগল্প ছাড়াও তাহার হাত দিয়া ছিন্নপত্র বা কবিতায় যেইভাবে এই বাংলাদেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে, যেই প্রকৃতি মায়ের শ্যামল পরশ তাহার সৃষ্টিতে সমাচ্ছন্ন, তাহার পঠনে আবেগ-উচ্ছ্বাসের ঢেউ উঠে আমাদের হূদয়ে—তাহা এমন করিয়া আর কোথাই পাইব আমরা? কিমাশ্চর্যম! বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই নিজ-নিজ জাতীয় সংগীত খুঁজিয়া লইয়াছে রবীন্দ্ররচনার অমৃত-ভাণ্ডার হইতেই। এমনকী শ্রীলংকার জাতীয় সংগীতেও রহিয়াছে রবীন্দ্রপ্রভাব!
অতীতে বারবার সামপ্রদায়িকতার বিষাক্ত কাঁচি চালাইয়া রবীন্দ্রনাথকে দ্বিখণ্ডিত করিবার ষড়যন্ত্র হইয়াছিল; কিন্তু সফল হয় নাই। বিস্ময় হইল—সেই ষড়যন্ত্রের কারিগররা এখনও হঠাত্-হঠাত্ তেড়ে ফুঁড়ে আবির্ভূত হইয়া রবিরশ্মিকে সামপ্রদায়িকতার অন্ধকারে আবৃত করিতে ব্যগ্র। কিন্তু রবিরশ্মি নিজেই তো ছিন্ন করে অন্ধকার। তাই রবীন্দ্রনাথের রচনা তথা রবিরশ্মিই সেই অন্ধকারকে পরাভূত করিতে যথেষ্ট। বরং আমরা দেখিয়াছি, রবীন্দ্রনাথকে যত বেশি বিতর্কিত করিবার চেষ্টা হইয়াছে, ততই তিনি আমাদের আকাশে অধিক দীপ্যমান হইয়া উঠিয়াছেন। তিনি মনে করেন পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির ভিতরে মানবতা প্রচ্ছন্নভাবে পরিব্যাপ্ত। তাঁহার জীবদ্দশায় সেই মানবতা যখন আক্রান্ত হইয়াছে, তখন তিনি সবচাইতে বেশি উচ্চকিত ছিলেন—যাহার প্রকাশ আমরা দেখিতে পাই তাঁহার অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ, বক্তৃতা কিংবা চিঠিপত্রের ভিতরে। ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম/ সে কখনো করে না বঞ্চনা’—এই পঙিক্তই যথার্থভাবে প্রকাশ করে রবীন্দ্রমানসকে।
তাহাকে আমরা পাই মানবিক ও মননশীল উত্তরণের সোপানে, যেইখানে মহত্ত্বের অটুট ভিত্তির উপর তিনি অবিরাম ইমারত বানাইয়াছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যেমনটি বলিয়াছেন তাঁহার সম্পর্কে—‘এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে, / তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে।’ রবি, অর্থাত্ সূর্যের মতোই আমরা সকলে তাঁহার সৃজন-আলোর ছোঁয়ায় নিজেদের ভিতরকার অন্ধকার দূর করিতে পারি, ঋদ্ধ করিতে পারি মানবজন্ম। সূর্য যেমন সকলের, রবীন্দ্রনাথও কোনো দেশ-কালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নহেন। তিনি সার্বভৌম মানবতাবাদী কবি। জীবদ্দশায় তাঁহার শেষ ‘পঁচিশে বৈশাখ’-এ তিনি ডাক দিয়াছিলেন ‘চিরনূতনেরে’। এই চিরনূতনেরাই এখন রাষ্ট্র হইতেছে দিকে দিকে। তিনি তাই, এই সময়ের জীবনাচরণে, আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হইয়া উঠিতেছেন।
