বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৬টি সরকারি ও ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রহিয়াছে। কয়েকটি বেশ ভালোভাবে চলিলেও বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সন্তোষজনক নহে। নব্বই দশকের প্রথমার্ধে নয়া উদারীকরণ অর্থনৈতিক নীতির বরাতে মুক্তবাজার অর্থনীতির হাত ধরিয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলন হয় বাংলাদেশে। প্রথমদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরিয়া বিতর্ক হইয়াছিল যে ইহার মধ্য দিয়া শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ হইতেছে। শিক্ষা মানুষের অধিকার, যেই অধিকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এতদিন ন্যূনতম বেতনে প্রদান করিয়া আসিতেছিল। কিন্তু নয়া উদারীকরণ বা নিউ লিবারেল নীতির অপ্রতিরোধ্য তোড়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলন ঠেকাইবার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছে। নানান তর্ক-বিতর্ক পার হইয়া বর্তমান বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একটি বাস্তবতা।
বিতর্কের একটি দিক ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি শিক্ষাকে পণ্য হিসাবে বিক্রি করিতেছে, ব্যবসায়িক দিকটিই প্রধান হইয়া উঠিয়াছে। আরেকটি অভিযোগ হইলো শিক্ষার মান যথেষ্ট উন্নত নহে, যথেষ্ট অবকাঠামো ছাড়াই ভবন ভাড়া করিয়া বিশ্ববিদ্যালয় খুলিয়া বসিয়াছেন অনেকে। অভিযোগ আরও রহিয়াছে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে কেবল বাজারচলতি কয়েকটি বিষয়েই একেকটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেকে সীমিত রাখিয়াছে। এই অভিযোগগুলি ঘুরিয়া ফিরিয়া আসে এবং এখনও করা হইতেছে। অভিযোগগুলি অনেকাংশে সত্যিও। কিন্তু কালের পরিক্রমায় প্রাথমিক সীমাবদ্ধতাগুলি অনেকখানি দূর হইয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তদারকিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কিছুটা শৃঙ্খলা দেখা দিয়াছে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বন্ধও করিয়া দিয়াছিল কমিশন। কিন্তু অগ্রবর্তী কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যেই তাহাদের নিজস্ব ক্যাম্পাস স্থাপন করিয়াছে। নিয়োগ, প্রমোশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম একটি রীতির মধ্য দিয়া পরিচালিত হইতেছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স কোর্সের প্রবর্তন করিয়াছে এবং সেইখানে শিক্ষার্থীরা থিসিস করিতেছে। কোনো কোনো শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বাহির এবং দেশের ভিতর হইতে উচ্চ বেতনে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিয়াছে এবং ক্রমশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ হইয়া উঠিবার চেষ্টা করিতেছে। দেশ-বিদেশের নানান সহশিক্ষা কার্যক্রম ও প্রতিযোগিতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করিতেছে। উপরন্তু, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণেই অর্থবান পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে না গিয়া দেশেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করিতেছে। আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইতে ব্যর্থ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের অভিভাবকগণ কষ্টে-সৃষ্টে তাহার সন্তানকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াইবার সুযোগ পাইতেছেন। বলা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি শিক্ষার একরকম প্রসার ঘটাইতেছে।
পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ই বেসরকারি। তবে তাহাদের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ব্যবধান বাংলাদেশের মতো এইরূপ অধিক নহে। আমরা মনে করি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় ভর্তুকিতে চলিবে না, ইহার ব্যবসায়িক দিকটি অবশ্যই বিবেচনায় থাকিবে। তবে ইহাও মনে রাখিতে হইবে যে, অন্য সকল পণ্যের ন্যায় শিক্ষা হইতেও বাছবিচারহীনভাবে মুনাফা অর্জনের মানসিকতা কাম্য নহে। টিউশন ফির উচ্চহার কমাইয়া আনিতে হইবে। সনদ বিক্রির অবস্থা হইতে সরিয়া আসিয়া অবকাঠামো বৃদ্ধি, মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ ক্যাম্পাস কার্যক্রম বৃদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যমে সত্যিকারের একটি বিদ্যায়তনিক পরিবেশ গঠনের ব্যাপারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে অধিক মনোযোগী হইতে হইবে। মানের বিচারে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় উত্রাইয়া যাইবে, কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই অকৃতকার্য হইবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনেরও উচিত হইবে, ভালো ও মন্দ, এই দুই প্রকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবধান কমাইয়া আনিতে কাজ করা। কারণ, দুই মানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যকার ব্যবধান ক্রমশ বাড়িয়াই চলিতেছে।
