ভারতের ১৬তম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে নয় দফায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক চলছে। বাংলাদেশে এই নির্বাচনের বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভারতের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির কিছু শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এমনকি স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশি অভিবাসী সম্পর্কে মন্তব্য এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালার মতো অবস্থা তৈরি করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে ভারতের এই চলমান নির্বাচন ও এই নির্বাচনের ফলাফল সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখতে পারে। বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সামনে চলে আসে।
প্রথমে ধরা যাক ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়টি। ভারতের একটি সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ঐতিহ্য রয়েছে। বলা হয়ে থাকে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে ভারতের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বজায় ছিল। মাঝখানে অল্প সময়ের জন্য জরুরি অবস্থা জারি হলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোন ছেদ পড়েনি। ভারতের গণতান্ত্রিক শাসনের মূল চরিত্র যা শুরু থেকে দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বিকশিত করে আসছে। তা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা। কিন্তু গত দুই দশক ধরে ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধতা ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। যে দলটির হাত ধরে ভারতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে উত্থান ঘটেছে সেটি হচ্ছে বিজেপি, ভারতীয় জনতা দল। এবারের নির্বাচনে গণমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন জরিপে এই দলটিকে এবং এই দলের নেতৃত্ব এনডিএ জোটকে ক্ষমতা গ্রহণের সম্ভাবনার কথা বলছে। বিজেপি এই জরিপ এবং সরকার বিরোধী অনেককে কাজে লাগিয়ে এই নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী এবং তারা এতোই আশাবাদী যে, তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষমতায় আরোহণের বিষয়টিকে সময়ের ব্যাপার মনে করছেন। অন্যদিকে বিশ্লেষক এবং কংগ্রেসসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো বিজেপির এই তথাকথিত অবধারিত নির্বাচনের জয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছে। বাস্তবে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল, কারণ ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলোর ব্যাপক উত্থান আমরা লক্ষ করি। আমাদের প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস থেকে শুরু করে বিহার, উত্তর প্রদেশ, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রসহ বিভিন্ন প্রদেশের আঞ্চলিক দলগুলো স্থানীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রক। ফলে একটি ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা নিশ্চিতভাবে দেখা যাচ্ছে। একদিকে শত বছরের পুরনো কংগ্রেস দল অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঝাণ্ডাধারী ধনিক শ্রেণির ব্যাপক সমর্থনপুষ্ট বিজেপি এবং আঞ্চলিক দলগুলোর সমন্বয়ে সম্ভাব্য তৃতীয় ফ্রন্ট। আঞ্চলিক দলগুলো আলাদাভাবে নির্বাচন করলেও প্রধানমন্ত্রীর পদটির ব্যাপারে তাদের মধ্যে নির্বাচনোত্তর সমঝোতা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রিত্বের এই ত্রিমুখী লড়াই বিজেপি ব্যতিরেকে সবদল কমবেশি অসাম্প্রদায়িক। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা উদার। এই অবস্থায় বিজেপির বাইরে থেকে যদি ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়টি চলে আসে তাহলে ভারতের রাজনীতিতে যে মূলধারা সেটি বজায় থাকতে পারে। অন্যদিকে বিজেপির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মূলধারা যার সঙ্গে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুজাতীয়তার চেতনা যুক্ত তা বিপন্ন হওয়ার সমূহ আশংকা রয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতের প্রকাশিত বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য ও বিশ্লেষণের বক্তব্যটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, বিজেপির হাত ধরে ভারতের ক্ষমতার পরিবর্তন দেশটির কষ্টার্জিত উদারনৈতিক চিন্তা-চেতনার মধ্যে কি আঘাত? অমর্ত্য সেন, সালমান রুশদিসহ অনেক স্বনামধন্য চিন্তাবিদ এ বিষয়ে বার বার সতর্ক করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জী ইতোমধ্যে নরেন্দ্র মোদীকে গুজরাটের কসাই হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। এতে করে একটি বিষয় পরিষ্কার তা হচ্ছে ভারতের রাজনীতির জন্য ষোল মে নির্বাচনের ফলাফলের ঘোষণা একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে যা ভারতের জনগণসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অনেকের কাছে কাম্য নয়। কারণ বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসাবে দেশটির ভেতর সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতির আধিপত্যের গণতন্ত্রের সুবাতাসকে বাধাগ্রস্ত করবে।
দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে বিবেচনা করলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভারতের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলের দিকে অনেকটা তাকিয়ে আছে। যদিও কেউ কেউ বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় বিজেপি ক্ষমতাসীন হলেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে তার তেমন প্রভাব পড়বে না। অতিসম্প্রতি নরেন্দ্র মোদী এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নীতি অনুসরণ করবেন না। কিন্তু আমরা যদি ফিরে তাকাই বিজেপির শাসনামলের দিকে, আমরা দেখবো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সে সময়ে নানা দিক থেকে উত্তেজনা ও সংকটের মধ্যে ছিল। একদিকে সীমান্ত সংকট অন্যদিকে শত শত বছর ধরে ভারতে অবস্থানরত বাংলাভাষী মুসলমানদেরকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। ফলে পানি, ল্যান্ড, বাউন্ডারি, বাণিজ্য ঘাটতিসহ অনেক মৌলিক বিষয়ে কোন অর্জন সম্ভব হয়নি। তার উপর দুই দেশের মধ্যে চলমান আস্থাহীনতা বজায় ছিল। বিজেপি শাসনামলে বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পরবর্তীকালে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সঙ্গে গত সাত বছর ধরে দুই দেশের সম্পর্কের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা হয়। এখনও বাংলাদেশের দৃষ্টিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত থাকলেও সংকটের ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। পারস্পরিক আস্থা বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। সর্বোপরি একটি কাঠামোর মধ্যে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে যাওয়ার পথ সৃষ্টি হয়েছে। এরকম প্রেক্ষাপটে বিজেপির সম্ভাব্য দিল্লীর মসনদ গ্রহণ বাংলাদেশের জনগণকে ভাবিয়ে তোলা স্বাভাবিক। গতবারের বিজেপির সরকার প্রধান ছিল অটলবিহারী বাজপেয়ী। যাকে কংগ্রেস দল পর্যন্ত সমীহ করে, তার নেতৃত্বের মধ্যপন্থা বিজেপির কট্টরপন্থিদের থেকে স্পষ্ট আলাদা করে রাখে। কিন্তু এবারের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর উল্টো মেরু। যার গায়ে গুজরাটের দাঙ্গার রক্ত লেগে আছে বলে মনে করা হয়। ইতোমধ্যে বিজেপি স্থানীয় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ একটি কট্টর পন্থা অবলম্বন করেছে। ফলে দলটির ভেতরে কট্টরপন্থিদের ব্যাপক শক্তি ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অনুসৃতনীতির সঙ্গে সরাসরি প্রভাব ফেলতে বাধ্য। বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেয়া কিংবা বাঙালি মুসলমান তল্পি-তল্পাসহ ১৬ মের পরে ভারত থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার নির্দেশ নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবে বিবেচনা করা যায় না। বাস্তবে কি ঘটবে বলা কঠিন হলেও এ ধরনের বক্তব্য একটি বিশেষ মানসিকতার পরিচয় বহন করে। যার প্রতিফলন অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে দেখতে পাওয়া স্বাভাবিক। একথা ঠিক যে, ২০১৪ সালে অর্থনৈতিকভাবে ভারত একটি শক্ত আসনে অধিষ্ঠিত। গত দশ বছরে কংগ্রেস সরকার ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে একটি শীর্ষস্থানীয় দেশে পরিণত করেছে। যা সকলের কাছে একটি মহাবিস্ময়।
একদিকে ভারতের এই ব্যাপক অর্থনৈতিক উত্থান অন্যদিকে মৌলবাদী রাজনীতির বিকাশ একেবারেই সাংঘর্ষিক। এ অবস্থায় বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনে ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্র বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনা করা দুরূহ হবে। তা সত্ত্বেও বলা যায় যে, এই সাম্প্রদায়িক কার্ডটির ব্যবহারে চেষ্টা হবে; ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন ইস্যুদ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এর অন্যতম হচ্ছে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি অভিবাসীর বিষয়গুলো। যা সম্পূর্ণত একটি ঐতিহাসিকভাবে এবং আইনগতভাবে সেটেল ইস্যু। সেটিকে ভারতের জাতীয় রাজনীতি এবং নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে বাংলাদেশের উপরে একটি চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসাবে অতীতের মতো ব্যবহারের প্রবণতা সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। তার পাশাপাশি সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল তা পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ সীমান্ত ইস্যুতে এমনিতেই আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশের ব্যাপারে এক ধরনের বৈরী অবস্থানে রয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারে যদি বিজেপি ক্ষমতাসীন হয় তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করবে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের সঙ্গে দর কষাকষির একটি নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করবে। বাংলাদেশের সরকার ও কূটনীতিকদের এ বিষয়ে এখন থেকেই চিন্তা করা উচিত। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এজেন্ডায় নন ইস্যুকে ইস্যু হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার যদি কোন প্রবণতা থাকে তা কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলার কৌশল বের করতে হবে। সুতরাং অর্থনৈতিকভাবে আন্তঃনির্ভরশীলতা ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভারতের শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িকতা ও কট্টর মানসিকতার ফলে একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে পারে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি জনগণের কাছে কোনভাবেই কাম্য নয়।
সুতরাং ভারতের নির্বাচন এবং নির্বাচনের আসন্ন ফলাফল ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য একটি নতুন বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে যা এখন পর্যন্ত নেতিবাচক বলেই পর্যবেক্ষকরা মনে করতে পারেন।
লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
