মে মাস এলেই মির্জাপুরের (টাংগাইল) প্রায় সকলের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠে অনেকের হাত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী আর তাদের দোসরদের বর্বরতাকে ধিক্কার জানায় সকলেই। সে বছর মে মাসের ৭ তারিখে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই শান্ত গ্রামে। হত্যা করেছিল প্রায় একশ’ নিরপরাধ গ্রামবাসীকে। লুটপাট করেছিল প্রতিটি বাড়িতে। ধর্ষণ করেছিল কিছু নারী আর শিশুকে। দানবীর রায়বাহাদুর রণদাপ্রসাদ সাহা (আরপি সাহা) আর তাঁর ছেলে ভবানীপ্রসাদকে (ডাকনাম রবি) ধরে নিয়ে গিয়েছিল তাঁদের কর্মস্থলে নারায়ণগঞ্জ থেকে। এঁরাও আর ফিরে আসেননি। এঁদেরকেও সম্ভবত হত্যা করা হয়েছিল কিছুটা দূরে নিয়ে গিয়ে।
রণদাপ্রসাদকেও হত্যা?! অবিশ্বাস্য।
খুব গরীব অবস্থা থেকে তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। কিন্তু নিজের সব সম্পত্তি দান করেন মানুষের সেবায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রণদা চাকরি নেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে। একদিন সামরিক হাসপাতালে হঠাত্ আগুনে লেগে যায়। রণদা ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্ধার করেন কয়েকজন মুমূর্ষু রোগীকে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ আসেন অভিনন্দনের ডালি নিয়ে। এরপর রণদা যোগ দেন বেঙ্গল রেজিমেন্টে। সেই রেজিমেন্টেই ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গেও রণদার সখ্য হয়। যুদ্ধ শেষে ইংরেজরা রণদাকে শিয়ালদহ রেল স্টেশনে টিকিট কালেক্টরের চাকরি দেন। কিন্তু সে চাকরি রণদা বেশিদিন করেননি। শুরু করেন কয়লার ব্যবসায়। পুঁজি কম। কিন্তু সততা আর পরিশ্রমে ব্যবসা দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় রণদা ‘বেঙ্গল রিভার’ নামে একটি নৌযান কেনেন। লক্ষ্য করেন, নৌপরিবহন ব্যবসায়ীদের পুঁজির এক বিরাট অংশ ব্যয় হয়ে যায় নৌযান মেরামতের কাজে। রণদা নিজেই প্রতিষ্ঠা করলেন এক ডকইয়ার্ড। এ সময় রণদা বেঙ্গল রিভার্স সার্ভিস (বিআরএস) নামে একটি নৌপরিবহন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৪২ সালে বাংলাদেশে প্রচণ্ড খাদ্য সংকট দেখা দেয়। দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। রণদা তখন দেশের বিভিন্ন অংশে মোট ২৭৫টি লঙ্গরখানা চালু করেন। হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষকে খাদ্য দিয়ে বাঁচান আট মাস। মোটামুটি এ সময়েই রণদা তাঁর মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল। ট্রাস্টেই তিনি ন্যস্ত করেন তার সব সম্পদ। ট্রাস্টের কাজ হলো দেশের লোককে স্বাস্থ্যসেবা আর শিক্ষা দান। ট্রাস্টের তরফ থেকে মির্জাপুরে লৌহজঙ্গ নদীর তীরে প্রথমে প্রতিষ্ঠা করা হয় শোভাসুন্দরী ঔষধালয়। শোভাসুন্দরী তাঁর পিতামহীর নাম। সেখানে ছিল রোগী দেখে ওষুধ দানের ব্যবস্থা (বিনামূল্যে)। পরে এখানেই প্রতিষ্ঠা করা হয় কুমুদিনী হাসপাতাল আর বিধানালয় (আউটডোর বিভাগ)। রোগীরা সেখানে বিনামূল্যে পরামর্শ পান, পান নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ। কুমুদিনী হাসপাতাল ছিল সেকালে দেশের অন্যতম প্রধান হাসপাতাল। যেমন বড় তেমনি উন্নত সেখানকার চিকিত্সা ব্যবস্থা। রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হলেই পেতেন পরিষ্কার ইউনির্ফম। আর সবকিছুই বিনামূল্যে।
কুমুদিনী হাসপাতালের পাশেই ভারতেশ্বরী হোমস, মেয়েদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমের আবাসিক স্কুল। প্রতিষ্ঠা ১৯৪২ সালে, রণদার প্রপিতামহীর নামে। মেয়েরা সেখানে শিক্ষা তো বটেই, থাকা-খাওয়া, জামা-কাপড় সবই পেত বিনামূল্যে। মির্জাপুরের এস কে হাইস্কুল, টাঙ্গাইলের কুমুদিনী গালর্স কলেজ এবং মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজ (দেবেন্দ্র রণদার বাবার নাম) চলে কুমুদিনী ট্রাস্টের টাকায়। এছাড়াও আরও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দান ছিল কুমুদিনীর।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পালানোর সুযোগ পেয়েও রণদা পালাননি। ভেবেছিলেন তাঁর উপস্থিতি মির্জাপুর গ্রামকে করবে নিরাপদ। কিন্তু পাকিস্তানীরা তাঁর বিশ্বাস টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল। অসামপ্রদায়িক পিতা-পুত্র দু’জনেরই উপাস্য ছিল সেই দেবী যিনি সমস্ত প্রাণীতে শান্তিরূপে বিরাজ করেন। বিরাজ করেন ক্ষুধারূপে। দুর্গাপূজার সময় হাজার হাজার মানুষকে দু’বেলা খাবার দিতেন রণদা। যাত্রাগান থাকত পূজোর ক’দিন। শেষদিন বস্ত্রদান করতেন সবাইকে, নতুন কাপড়। এ ছাড়া সংবাদপত্র আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকেও সাহায্য করতেন রণদা।
আমরা রণদা আর তাঁর গ্রামবাসীদের আত্মার শান্তি কামনা করি। ধিক্কার জানাই হত্যাকারীদেরকে। তাদের বিচার দাবি করি। তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিল। তাদের ক্ষমা নেই।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
ই-মেইল: [email protected]
