[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

দেশ কি তবে শূন্যে?

আপডেট : ০৭ মে ২০১৪, ২১:৩২
বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত, অন্যতম স্থিতিশীল গণতন্ত্রের অঙ্গরাজ্য আসামে আচমকা কী ভয়ঙ্কর, কী উদ্যত, রোদনভরা অঘটন ঘটে গেল! লোকসভা ভোটের মুহূর্তে, মেঘালয় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সীমান্ত-ছোঁয়া তিন জেলা- নিরীহ, নিরস্ত্র গরীব মানুষের রক্তে লাল হয়ে, দু’বছর পর আবার অগ্নিগর্ভ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তম রাজ্যটিতে নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিতে এই ধরনের উন্মাদক ঘটনা- এই নিয়ে দুবার ঘটল। ৮৩ সালে, ‘বিদেশি খেদাও’ যখন তুঙ্গে, যখন কেন্দ্রে কংগ্রেস আর আসাম জুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদের তুমুল আস্ফাালন- তখন ভোটমুখী জনতাকে ভড়কে দেওয়ার নিঃশব্দ কৌশল হাতে নিয়ে জনজাতি অধ্যুষিত নেলি, যমুনামুখ আর গোহপুরে গণহত্যা ‘উদযাপন’ করল, করতে দুঃসাহস যোগায় উচুবর্গ নিয়ন্ত্রিত রিমোট কন্ট্রোল। এবার, তথাকথিত ‘বড়োল্যান্ডের’ কোকড়াঝাড়ে, চিরাং ও বাস্কার জেলার বিস্তৃত অঞ্চলে, লোকসভা ভোট হয়ে যাবার পর, একই ধাঁচে বাঙালি কৃষকের ওপর হামলা আর গণহত্যা, বাড়িতে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ জাতিবিদ্বেষের রাজনীতিকে আরো বিষাক্ত, আরো ভারী, আরো বিভ্রান্ত করে তুলল। গুয়াহাটির শুভবুদ্ধি এবং সাংবাদিকেরা প্রতিবাদে সরব হয়েছেন, মিছিল করেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর তরুণ গগৈ এর পদত্যাগের দাবিতেও সোচ্চার কোনো কোনো মহল, এটা অবশ্যই প্রত্যাশিত সুলক্ষণ, কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ছাড়া বহুজনের, বহুমতাবলম্বীদের প্রায় নৈঃশব্দ্য- কলহপ্রিয়, আত্বঘাতী জাতির স্বজন-বিস্মৃতি, আত্মকেন্দ্রিকতা আর দায়বদ্ধতাকে কঠোর জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। মানুষের মৃত্যুতে, নির্বিচার নিগ্রহে, উন্মাদনাময় দুর্যোগে সব হিসেব নিকেশ অতিক্রম করে বারবার পাশে দাঁড়ায় মানুষ- এটাই বাংলার কালচার-এখান থেকে তার স্ফলন, তার বিচ্যুতি ভাবতে বাধ্য করছে যে, আদর্শগত আত্মহত্যায় উন্মুখ জাতি- হূদয়ের দরজা জানালা বন্ধ করে অর্জিত বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে তুলছে। নিম্ন আসামের তিন জেলায়, সঙ্ঘবদ্ধ হামলায় কতজন খুন হলেন, ৩২ না ৩৭, ক’হাজার গৃহহারা, কোথায় আশ্রয় নিচ্ছেন, এমুহূর্তে এসব প্রশ্ন বড়ো নয়। প্রশ্নের পরিধি এর চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত এবং এক ধরনের ধারাবাহিকতায় ক্লীষ্ট, যার সঙ্গে আসামের তো বটে, বৃহত্ ভারতের নষ্ট রাজনীতির, সাম্প্রদায়িকতার গূঢ় রহস্য দীর্ঘদিন ধরে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলটিতে, কখনো হঠাত্ দেখা ভূতের মতো, কখনো অশরীরি ছায়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আশু চিকিত্সা প্রয়োজন। না হলে স্পর্শকাতরতা বাড়বে, বাড়বে মৃত্যু, উদ্বাস্তুরা আবার উদ্বাস্তু হয়ে উঠবেন। ইতিমধ্যে পশ্চিম বাংলা আতঙ্কিত, আক্রান্ত, স্বভূমি থেকে আপাতত নির্বাসিতের সে াত ঢুকছে, গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ রাজ্যেরও সীমান্ত এলাকায় আগুনের প্রবল উত্তাপ বাড়ছে। তথাকথিত অনুপ্রবেশের অভিযোগে পরিকল্পিত নরহত্যা, শিশুহত্যা, সম্ভ্রম-লুট বাংলাদেশের সুযোগ সন্ধানী সাম্প্রদায়িকতাবাদীদেরও উত্সাহিত করবে, আক্রান্ত হবে বাঙালির সংযম ও সুস্থ চেতনা। অতএব, বিপদকে হাল্কা করে দেখা ঠিক নয়। হিসেব খুবই সহজ, বস্তিতে খড়ের বাড়িতে আগুন লাগলে, প্রতিবেশীর প্রতিবেশীকেও অগ্নিকাণ্ড রেহাই দেয় না, তাঁদেরও ঘর পোড়ে, দেহ পোড়ে, হূদয় পোড়ে। অভিযোগ উঠছে, বিজেপির ঘোষিত ‘প্রধানমন্ত্রী’ নরেন্দ্র মোদি ভোট প্রচারে আসামে গিয়ে ‘বিদেশি সমস্যা’কে, অনুপ্রবেশকে ইস্যু করেছেন, ‘বড়ো ভূমির’ জঙ্গিরা নাকি তার সুরে গলা মেলায়, তার মানে সরাসরি নরেন্দ্র ভাইকেও দায়ী করা হচ্ছে। এসব রটনায় কি কেবল দুষ্ট রাজনীতির অতিরঞ্জিত উচ্চারণ? না উড়ন্ত বাতাসে, গুজবে ভাসমান অর্ধসত্য মাত্র? তাহলে পূর্ণ সত্যটি কী? এসব প্রশ্ন তোলার মানে এই নয়, আমরা মোদির হয়ে সাফাই গাইতে শুরু করে, বাঘের বদলে জংলি, অদৃশ্য বেড়ালকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। নিজেকে যতটা জানি, জানার চেষ্টা করি, তাতে মনে হয়, বুদ্ধি আর ভাবাবেগের এমনতর স্ফলন হয়নি। সম্ভবত কখনোই হবে না। আসামের কৃষিজীবী আর শহুরে বাঙালির সংখ্যাধিক্য আর তাদের এলোমেলো রাজনৈতিক অবস্থান, অনৈক্য নিয়ে মোদির সঙ্ঘপরিবার, বিজেপির মোদি, অপর একাংশ এবং বহুবিভক্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলির ঘোষিত, অঘোষিত নীতিতে রাখঢাক নেই। সবাই বিভাজনের খেলায় আগুন নিয়ে নাচতে অভ্যস্ত। যে-সব বাঙালিকে, আক্রান্ত হয়ে, আতঙ্কিত হয়ে, বা বৃহত্ দেশের নাগরিক হওয়ার মোহে, বাংলাভাগের পর প্রধানতম পশ্চিমবঙ্গে, দ্বিতীয়ত আসামে, ত্রিপুরায় চলে আসতে হয়েছিল, সঙ্ঘপরিবার তাদের শরণার্থী আখ্যা দিয়ে বরণ করতে দৃঢ়সঙ্কল্প। কিন্তু যারা কৃষিজীবী, যারা ব্রহ্মপুত্রের দুই তীরে, জঙ্গলে, সমতলে ১৮৯৬ থেকে রুটিরুজির তাগিদে বা ৪০-এর দশকের দুর্ভিক্ষের দিনগুলিতে খিদের জ্বালায় নদী পেরিয়ে, মাঠ পেরিয়ে পাহাড়ি এলাকায়, চরাঞ্চলে প্রবেশ করলেন, জরাজীর্ণ বাড়ি গড়ে আসামকে কৃষিযোগ্য করে তুললেন, জনসঙ্ঘের রাজনৈতিক মঞ্চ সাবেক হিন্দু মহাসভা থেকে আজকের বিজেপি এসব অসহায় মানুষকে কখনো আশ্রিত ভাবতে আগ্রহ দেখায়নি, আজও ওই নীতি অপরিবর্তিত, এবং প্রকাশ্যেই ঘোষিত। আঞ্চলিক দলগুলির বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ আছে। বড় অংশেরই ধারণা, বঙ্গভাষী মানেই তাদের নজরে বাংলাদেশি এবং ভূমি পুত্রদের শত্রু। ‘শরণার্থী বাঙালি’ এবং কৃষিজীবী মুসলিম বাঙালি দু’পক্ষই ভাগ্যহত। বিড়ম্বিত দেশ, তাদের ভাষা, তাদের সংস্কৃতি আক্রান্ত, খন্ডিত হূদয়ও। অনৈক্যে তারা দিশেহারা। এসব দুর্যোগ আর দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই আসামের রাজনীতি পরম অনুগত, প্রশ্নহীন প্রজার মতো ব্যবহার করে, ভাগ করে তাদের অধিকারকে, আত্মনিয়ন্ত্রণে স্বপ্নকে বারবার দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে আসাম কংগ্রেসের ভূমিকাও কি নিষ্কলঙ্ক? বাঙালি কৃষকের অস্তিত্বকে কি তারা রাজনৈতিক সঙ্কট ভাবেনি? আর শহুরে বঙ্গ সন্তানের সংস্কৃতি প্রীতিকে ‘আগ্রাসন’-এর গোপন আর প্রকাশ্য ষড়যন্ত্র বলে বারবার ঝাঁপিয়ে পড়েনি। আবার ‘ভোট ব্যাঙ্ক’ ধারণাটি রুচিহীন, অবৈজ্ঞানিক, অবস্তাব হওয়া সত্ত্বেও কখনো হুমকি দিয়ে কখনো তোষণ করে, বরাবর রাজনৈতিক ফায়দায় পকেট পূর্ণ করেনি? এই নিয়তি তাড়িত, আত্মপরিচয়হীন, ত্রিশঙ্ক বাঙালিই তথাকথিত ‘বড়োল্যান্ড’-এ বারবার, গত ২১ বছর ধরে দুঃস্বপ্নের পরিসরে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা ভাষাহীন স্বরহীন, দেশহীন। সীমান্ত লাগোয়া তিন জেলার নেপালি, চা শ্রমিকরা একইভাবে আতঙ্কে দিন কাটান। গণতন্ত্র, ভোটসর্বস্ব রাজনীতি তাদের ব্যবহার করে, প্রয়োজনে উগ্রদের অস্ত্রের সামনে, সাফাই অভিযানের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তামাসা দেখে। রাজনীতিবিমুখ নই। পরিবারে, সমাজে তার গুরুত্ব আছে। থাকবে। কিন্তু যে রাজধর্ম বৈষম্য, অবিচার আর অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, উসকানি দেয়, মানুষকে পরবাসী করে তোলে নিজ দেশে, ছিনিয়ে নেয় ভাষা, মাতৃভাষা, পিতৃস্নেহ এবং সমাজেরই একাংশের হিংসায় ইন্ধন যোগায়, গুন্ডারাজ তৈরি করে, সে তো দুর্নীতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। কেননা গুন্ডা বা লেঠেল বাহিনী পুষতেও পয়সা চাই, চাই তাঁবেদার আর নতমস্তকের বাজনাদার। কাছেই ভোটবিহারের নৌকো, প্রমোদমত্ত জমিদার বাবুর সব আয়োজনই আছে, নেই শুধু হুল্লোড়ে পার্টি। এ আবার হয় নাকি? অতএব অস্ত্র দাও, লোক পাঠাও, নিয়ে এসো স্ফূর্তি আর আমোদের রসদ। খুন ঝরছে ঝরুক, ঝরতে দাও। তল্পি আর নৌকার গদির নিরাপত্তাই যথেষ্ট। লেখক: পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন