তাজমহলের শহর আগ্রার মাটিতে পা ছুঁতেই নির্বাচন নয়, সেই চিরচেনা ঐতিহ্যের গন্ধ ভেসে এলো। মনে হলো নির্বাচনের কোন নামগন্ধও নেই সেখানে। বাংলাদেশের মতো ব্যানার পোস্টারে ঢেকে যায়নি আগ্রার আকাশ। মোড়ে মোড়ে প্রার্থীদের অফিস নেই, জটলাও নেই। মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যেন কোন মাথাব্যথাই নেই। ভোটের হালচাল জিজ্ঞেস করতেই টেপ রেকর্ডারের মতো অনর্গল বলা শুরু করলো অটোচালক বিকাশ। সারা দেশে যেমন মোদি ঝড়, এখানেও সবার মধ্যে সেই ঝড়ো বাতাস কাজ করছে। যদিও উত্তর প্রদেশ কিন্তু কংগ্রেস বা বিজেপি কারও ঘাঁটি নয়। এখানে স্থানীয় দলগুলোর জয়জয়কার। তাই এবার উত্তর প্রদেশে মায়াবতী আর মুলায়ম সিং যাদবের দুর্গে হানা দিতে চান নরেন্দ্র মোদি। বিজেপিকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে নিজের প্রধানমন্ত্রিত্ব পাকা করতে চান।
গত লোকসভা নির্বাচনের বিশ্লেষণ বলে, বিজেপির জোট এনডিএর শরিকরা বেশিরভাগই লোকসভায় আসন পায় অল্পবিস্তর। ২০০৯ এর লোকসভা নির্বাচনে এনডিএ সব দল মিলে পেয়েছিলো ১৪১টি আসন। যার মধ্যে বিজেপিরই ছিলো ১১৬টি। অন্যদিকে কংগ্রেসের জোট ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স বা ইউপিএতেও একই অবস্থা ২২৬টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস একাই পেয়েছে ২০৬টি। যদিও এবার বিজেপির পালে হাওয়া দেখে এনডিএ জোটে শরিক হয়েছে নতুন ১৯টি দল। তবে এদের কারও লোকসভায় আসন নেই। একমাত্র অন্ধ্রের তেলেগু দেশাম লোকসভায় ৬টি আসন পেয়েছিলো।
তবে এটা ঠিক যে, সারা ভারতে লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৭২টিতে জয়ী হলে তবেই বিজেপি ক্ষমতায় আসবে। প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা আরও পরে। অনেক বিশ্লেষণই বলছে, বিজেপি আসন পাবে দুইশ’র কাছাকাছি। বাকি ৭২টি আসনের জন্য নির্ভর করতে হবে মূলত উত্তর প্রদেশ আর বিহারের ওপর। উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসনের মধ্যে ১০টি নিয়ে টানাটানি করে কংগ্রেস আর বিজেপি। মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি আর মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি এখানকার বড় শক্তি। উত্তর প্রদেশের আসন হিসেবে ব্যতিক্রম বলা যায় আগ্রাকেই। অনেক মুসলিম ভোটার থাকলেও, প্রদেশের সবচেয়ে বেশি প্রায় ৮০ লাখ ভোটারের এই আসনে অবশ্য বিজেপি ভালো করে। গত প্রায় ৩০ বছরে যতো নির্বাচন হয়েছে তার ভেতর একবার এখানে জিতেছে কংগ্রেস। বিজেপি জিতেছে দু’বার আর বাকি নির্বাচনে বিএসপি ও জনতা দলের মতো স্থানীয় দলগুলো।। ২০০৯ এর নির্বাচনেও এখানে বিএসপিই জয়ী হয়েছিলো।
বিহারে লড়াইয়ে না থাকলেও, সবসময় বড় ফ্যাক্টর লালু প্রসাদ যাদব। বিহারের এখনকার বড় শক্তি সংযুক্ত জনতা দলও নরেন্দ্র মোদি ইস্যুতে এনডিএ জোট ছেড়েছে গত বছর। তাই হয় এসব আসনে জিততে হবে, নয়তো এই দলগুলোকে বাগে আনাই হবে বিজেপির বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সরকার গঠনে সহায়তা করলেও, এই দলগুলো তাদের অসামপ্রদায়িক আদর্শ কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদের কাছে বিকিয়ে দেবে না। তাই উত্তর প্রদেশ আর বিহারের দলগুলোর পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করবে কে সরকারে বসবে আর কে প্রধানমন্ত্রী হবেন। কারণ ইতিমধ্যেই এসব দলের শীর্ষ নেতা মায়াবতী, মুলায়ম সিং যাদব, অখিলেশ যাদব রাবড়ি দেবি বা শারদ যাদব তো মোদির সমালোচনা করে যাচ্ছেন।
তাহলে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ঘুরেফিরে বড় নির্ণায়ক হয়ে উঠবে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে জনপ্রিয় দলগুলো। কারণ উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসন আর বিহারের ৪০টি আসনে সবসময়ই পিছিয়ে বিজেপি বা কংগ্রেস। দক্ষিণের তামিলনাড়ুর রাজনীতি ভেঙে খান খান হয়েছে। আর অন্ধ্র-তেলেঙ্গানা থেকে নতুন করে কাউকে পাবে না বিজেপি। একসময় বাম ও কংগ্রেস ঠেকাতে বিজেপি পুনর্বাসন করলেও, মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল এখন বিজেপির ঘোরবিরোধী। বিশেষ করে বাংলাদেশি ইস্যুতে মমতা আর নরেন্দ্র মোদি একে অন্যকে ধুয়ে দিচ্ছেন প্রায় প্রতিদিনই।
দিল্লী, আগ্রা বা মথুরার অনেকের কাছেই প্রশ্ন করেছি কেন কংগ্রেস নয়? এই প্রশ্নে বিকাশের মতো একজন সাধারণ ভোটারের সাফ জবাব-‘দুর্নীতি’। শুনেই মনে পড়লো দুই-তিনদিন দিল্লীতে যা দেখলাম-ঘুরেফিরে দুর্নীতির মাপকাঠিতেই কংগ্রেসের মূল্যায়ন করছেন ভোটাররা। এটা ঠিক যে, কংগ্রেসের দুর্নীতি নিয়ে খুব বেশি জানা নেই অনেক সাধারণ ভোটারেরই। কয়েকজনের সাথে কথা বলে যেটা মনে হয়েছে, কংগ্রেসের দুর্নীতিকে বড় পুঁজি করে নেমেছে বিজেপি। সাথে আছে রাষ্ট্রপরিচালনায় মনমোহন সিং-এর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা, অর্থনীতির স্থবিরতা, জিনিসপত্রের দামে ঊর্ধ্বগতি, দলীয়করণ ও আত্মীয়করণ। আর এসব ভোটারদের খাওয়াতে পেরেছে বিজেপি।
দিল্লীতে অবশ্য এই দুর্নীতিবিরোধী টনিক খাইয়ে মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন আম-আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। লোকসভায় দিল্লীর সাতটি আসনে সাতটিতেই গত নির্বাচনে কংগ্রেস জিতেছিলো। এবার কেজরিওয়ালের কল্যাণে দিল্লী হাতছাড়া হতে পারে কংগ্রেসের। আম-আদমি পার্টি অন্তত দুই-তিনটি আসন বাগিয়ে নেবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। এই মোদি মোদি বাতাসে বিজেপিও ভালো করতে পারে দিল্লীতে। কারণ কেজরিওয়াল আমজনতার স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়েছেন ইতিমধ্যেই। রূপকথার রাজার মতো হঠাত্ করে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় তার প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও ছিলো রূপকথার মতোই। কিন্তু মানুষ এখন অনেকটা হতাশ। তার বড় শক্তি দিল্লীর শ্রমজীবী মানুষরাও আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন। যদিও দুর্নীতিবিরোধী টুপি চাপিয়ে তুলনামূলক ক্লিন ইমেজের প্রার্থী নিয়ে লোকসভায় লড়ছেন কেজরিওয়াল। বারানসি থেকে নিজেও লড়ছেন, সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সারা ভারত এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত সেই হ্যাভিওয়েট প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে।
আগাগোড়া কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হলেও, বিজেপির সাম্প্রদায়িক তিলক সাধারণ ভোটারের কাছে খুব বেশি আপত্তির মনে হয়নি। যদিও গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং মুসলিম নিধনের অন্যতম হোতা নরেন্দ্র মোদি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী। সংবাদপত্র গণমাধ্যম আর বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে বিজেপি এগিয়ে। প্রচার-প্রচারণা আর বিশ্লেষণ বা পূর্বাভাসে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কংগ্রেসের পরাজয় আর কে ঠেকায়। অন্তত প্রদেশে প্রদেশে, শহরে শহরে গিয়ে করা জনসভায় নরেন্দ্র মোদির হুংকারে তাই মনে হচ্ছে। কারণ তিনি জানেন, বিজেপি যেভাবেই হোক কাছে টেনেছে ব্যবসায়ী শিল্পপতিসহ পুরো কর্পোরেট ইন্ডিয়াকে। সাথে আছে সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমের একটা বড় অংশ। জনমত জরিপ আর পূর্বাভাস সব তার পক্ষে।
তাই তার আত্মবিশ্বাস এখনই এমন পর্যায়ে যে, তিনি রীতিমতো ধরাকে সরাজ্ঞান করছেন। অশ্লীল বা অসৌজন্যমূলক আচরণ করছেন প্রায়ই। খিস্তি আওড়াচ্ছেন কংগ্রেস ও গান্ধী পরিবারের বিরুদ্ধে। বাগপটু হওয়ায় আক্রমণাত্মক বা অশালীন ভাষা ব্যবহারই যেন হয়ে উঠেছে তার প্রধান শক্তি। একটি প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েও দেশ পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ, এমনকি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়েও কথা বলছেন এখনই। আর বলবেন নাই বা কেন? তার এই হুমকি-ধামকির জবাবই দিতে পারেনি কংগ্রেস। বাঘের গর্জনের প্রতিবাদে মাঝে মাঝে মৃদু আওয়াজ তুলেছেন কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী রাহুল গান্ধী। মা সোনিয়া গান্ধী এবং বোন প্রিয়াঙ্কাও প্রতিবাদ করেছে মাঝে মাঝে।
একের পর এক পর্বের ভোট শেষ হচ্ছে আর নরেন্দ্র মোদি ততোই যেন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। শিষ্টাচার ও আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে প্রতিদিনই নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ উঠছে। তার এই দুঃসাহস মাথাব্যথার কারণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের, এমনকি বাংলাদেশেরও। নরেন্দ্র মোদিকে গুজরাটের কসাই থেকে শুরু করে সবশেষ বুধবারও গর্দভ আখ্যা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। অবৈধ বাংলাদেশিদেরকে ভোটার বানিয়ে মমতা পার পেতে চাইছেন এমন অভিযোগ করেছেন মোদি। এমনকি অবৈধ বাংলাদেশিদের ১৬ মের পর ভারত থেকে তাড়িয়ে দেবার হুমকিও দিয়েছেন কয়েক দফা। যদিও ভারতের আইন, দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে এভাবে হুমকি দিয়ে অভিবাসন সমস্যার সমাধান করা যায় না। এটা পাড়ার মাস্তানি না যে গায়ের জোরে কাউকে তাড়িয়ে দেবেন মোদি। ভারতে যদি অবৈধ অভিবাসী থেকেও থাকে তাদের আইন মেনে প্রত্যাবাসন করতে হবে। একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, যিনি প্রধানমন্ত্রী হবার স্বপ্ন দেখছেন তার কাছে তো সবাই রাষ্ট্রনায়কসুলভ আচরণ আশা করে, মাস্তানসুলভ নয়। এর জবাবেই মোদিকে তুলোধুনো করেছেন মমতা। যদিও বাংলাদেশের স্বার্থ বিশেষ করে তিস্তা আর সীমান্ত চুক্তি নিয়ে মমতার নির্মমতায় বাংলাদেশ মর্মাহত হয়েছে অনেকবার। এবার ভোটের স্বার্থে রাজনৈতিক বুলি হলেও, বাংলাদেশের মানুষের প্রতি দরদ যেন উথলে উঠেছে মমতার।
তবে সব তিক্ততার অবসান হবে ১৬ মের পর যখন ভারতে সরকার গঠন হবে। বিজেপিই হোক আর কংগ্রেস-অথবা তাদের জোট, বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক সম্পর্কে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না বলে বিশ্বাস অভিজ্ঞজনদের। তবে আশঙ্কার জায়গাটা রয়ে যাবে আগের মতোই। কেন্দ্রের সরকারে কে বসলো কেবল তা নয়, পাশের প্রদেশের রাজনীতিও সহায়ক হতে হবে। নইলে পুরনো চাওয়া বা অধিকারগুলো আদায় করতে আবারও ব্যর্থ হবে বাংলাদেশ। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য ভাগ পাবে না বাংলাদেশ, সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে না, এদেশে নিজেদের পণ্যের বাজার বানালেও, ভারতে দূর হবে না বাণিজ্য বাধাও। আর ট্রানজিট, কানেকটিভিটি বা জ্বালানি বিনিময়ে সুবিধা আদায়ে ব্যর্থ হবে বাংলাদেশ।
সানাউল হক, বিশেষ প্রতিনিধি এটিএন বাংলা
