স্বাস্থ্য নহে ব্যাধিই সংক্রামক

আপডেট : ০৮ মে ২০১৪, ২১:৩৮
স্বাস্থ্য নহে ব্যাধিই যে সংক্রামক—প্রতিদিনই নানাভাবে তাহার প্রমাণ মিলিতেছে। তিল তাল হইতেছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া বাধিতেছে লঙ্কাকাণ্ড। আর তাহার মর্মান্তিক মাশুল গুনিতে হইতেছে দলমতনির্বিশেষে দেশের নির্বিরোধ নিরপরাধ জনসাধারণকে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাহা ঘটিয়া গিয়াছে তাহাও ইহার ব্যতিক্রম নহে। লিফটে উঠাকে কেন্দ্র করিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সহিত ইন্টার্ন চিকিত্সকদের প্রথমে কথা কাটাকাটি, তাহার পর হাতাহাতি। যথারীতি সেই হাতাহাতি রূপ নিয়াছে দেশের নামজাদা দুইটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। ভাঙচুর হইয়াছে হাসপাতাল—আর তাহার পরিণাম ভোগ করিতে হইয়াছে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগী এবং তাহাদের উদ্বিগ্ন আত্মীয়-পরিজনকে। ভোগান্তির এইখানেই শেষ নহে। হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ইন্টার্ন চিকিত্সকেরা হাসপাতালের সকল গেটে তালা ঝুলাইয়া দেয়। কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ হইয়া যায় জরুরি বিভাগসহ সব ধরনের চিকিত্সা কার্যক্রম। বিনা নোটিসে দেশের প্রাচীন ও বৃহত্তম হাসপাতালটি বন্ধ হইয়া যাওয়ায় চিকিত্সাধীন ও দূরদূরান্ত হইতে চিকিত্সা লইতে আসা হাজার হাজার রোগীকে কী অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাইতে হইয়াছে তাহা কল্পনা করিতেও আতঙ্ক হয়। কিন্তু ইহাই এখন চারিপাশের নৈমিত্তিক চিত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইতোপূর্বে মিটফোর্ড, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজেও অনুরূপ ঘটনা ঘটিয়াছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো ক্ষেত্রে এই ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটিতেছে। আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার এই যে মানসিকতা—ইহাকে আমরা ব্যাধি ছাড়া আর কীই-বা বলিতে পারি! এই ব্যাধিটির নাম অসহিষ্ণুতা। আর তাহা এখন মহামারীর রূপ পরিগ্রহ করিতে চলিয়াছে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে—কেন, কী কারণে মানুষ এতোটা অসহিষ্ণু হইয়া উঠিতেছে, তাত্ক্ষণিকভাবে যেই উত্তরটি পাওয়া যাইবে তাহা হইল, প্রতিকারহীনতা। ইহা সুবিদিত যে, সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়তই নানাভাবে হয়রানি, নিপীড়ন, জোরজবরদস্তি ও অবিচারের শিকার হইতেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের কোনো ক্ষেত্রই ইহার ব্যতিক্রম নহে। কিন্তু কোথাও প্রতিকার মিলিতেছে না। দেশে আইন আছে, থানা-পুলিশ ও প্রশাসন আছে, আছে বিচার ব্যবস্থা। সর্বোপরি, সরকারের শীর্ষে যিনি বা যাহারা বসিয়া আছেন তাহাদের সদিচ্ছারও কোনো অভাব হয়তো নাই। কিন্তু ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ তাহার সুফল পাইতেছে না। কারণ প্রায়শ সবকিছুকে ছাপাইয়া উঠিতেছে ক্ষমতাবানদের ক্রমবর্ধমান দাপট। যে যেইভাবে পারিতেছে ক্ষমতার দাপট দেখাইতেছে। স্থানীয় পর্যায়ে এই দাপট আরও ভয়াবহ। কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করিতেছে না তাহারা। আর অন্যায় এই দাপটের হাত হইতে নিরীহ জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা যাহাদের দায়িত্ব তাহারা নিজেদের কর্তব্য বিস্মৃত হইয়া হয় ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করিতেছেন, অথবা নিজেরাও শামিল হইতেছেন নিপীড়কের ভূমিকায়। ফলে বাধ্য হইয়া অসহায় অনন্যোপায় মানুষ আইন তুলিয়া লইতেছেন নিজেদের হাতে। পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়া গেলে গৃহপালিত নিরীহ ও নির্বাক পশুও ফুঁসিয়া ওঠে। মানুষ তো মানুষই। অসহিষ্ণুতার এই মহামারী ঠেকাইতে হইলে অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে সর্বপ্রকার জোরজবরদস্তি ও বাড়াবাড়ি। যত্রতত্র ক্ষমতার দাপট দেখাইয়া জনজীবনকে দুবির্ষহ করিয়া তুলিতেছে তাহাদের হাতে-পায়ে লাগাম পরাইতে হইবে। সর্বোপরি নিশ্চিত করিতে হইবে আইনের শাসন। কেহই যে আইনের ঊর্ধ্বে নহে—এই বার্তাটি যত দ্রুত সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে পৌঁছাইয়া দেওয়া যাইবে—অসহিষ্ণুতার এই ব্যাধি হইতে পরিত্রাণের পথও ততই সুগম হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন