বিশিষ্ট পরমাণুু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া পরমাণু বিজ্ঞানকে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন এদেশের একজন মেধাবী বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশের আণবিক পাওয়ার প্লান্টের একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের রূপপুরে একটি পরমাণু বিদ্যুত্ কেন্দ্র চালু করা, দেশের বিজ্ঞানীদের পেশাগত কাজের উত্কর্ষ সাধনের জন্য একটি বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, তিনি তার ইচ্ছার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। দেশের বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারে তার অবদান অবিস্মরণীয়।
তিনি শুধু একজন মেধাবী ছাত্র বা পরমাণু বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন নির্লোভ, নিভৃতচারী, নীতিবান, নিরহংকার, নির্ভীক, স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক, আদর্শবান, সত্, সহজ-সরল, বিনয়ী, চরিত্রবান, যুক্তিবাদী, অজাতশত্রু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন আদর্শ মানুষ। তার প্রতিভার অনেক দিকই আমাদের অজানা।
১৯৬৯ সালে ইতালির ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাকে এসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। এই সুবাদে তিনি ১৯৬৯-’৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ৬ মাস ধরে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট ডক্টোরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। আবার ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি তত্কালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরুয়ে শহরের ‘আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে’ আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে তিনি পরপর দু’বার বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি পরপর তিনবার ওই বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চার বছর তিনি বাংলাদেশ পদার্থ বিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৯৭ এবং ১৯৮৯ সালে দু’বছর মেয়াদের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। আর এসব পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন শুধুমাত্র তার যোগ্যতার নিরিখেই।
স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনের কারণে তিনি কিছুদিন কারাবরণও করেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত পরপর দু’বার বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি পরপর দু’বার দু’বছর মেয়াদকালের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১-১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘেরও সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার তিনি ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানজীবী সমিতি’র সভাপতি নির্বাচিত হন। এসব তালিকাক্রম থেকেই অনুমেয় যে তিনি কতখানি খাঁটি বিজ্ঞানী ছিলেন।
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার ব্যক্তিগত নিষ্ঠা ও তত্পরতার জন্যই পরমাণু বিজ্ঞান চর্চায় বাংলাদেশ অনেকখানি অগ্রসর এবং পরমাণু শক্তির ব্যবহারে বিশ্বে সুনাম কুড়াতে পেরেছে। সে হিসেবে আমরা এই বিজ্ঞানীকে ততটা সম্মানিত করতে পারিনি, তিনি যতটা প্রাপ্য। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ক্যাম্পাসে একটি অডিটরিয়ামের নামকরণ হয়েছে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার নামে। এটুকুতেই কি আমাদের দায়-দায়িত্ব শেষ? আমাদের কি আর কিছুই করার নেই? যে দেশ, জাতি এবং সমাজ তার জ্ঞানীজনদের সম্মান করতে জানে না, সে দেশ, জাতি এবং সমাজে গুণীজনদের জন্ম হয় না। আমাদের কৃতী সন্তানদের সম্মানিত করতে না পারলে পিছিয়ে পড়বো আমরাই।
বাংলাদেশের প্রথম এবং বিশ্বের ২৯তম পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পূরণ হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। সফল হবে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার আমরণ প্রচেষ্টা এবং সুফল ভোগ করবে সারা দেশের মানুষ।’
আসলে পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আমাদের গর্বের ধন। আগামী প্রজন্মের মনে বিজ্ঞান মনস্কতা ছড়িয়ে দিতে তার কর্মের আরও প্রচার এবং প্রসার দরকার। এই বিজ্ঞানীর প্রবন্ধ-নিবন্ধ, জীবনী-কর্মকাণ্ড সংরক্ষণ করা উচিত। এতে প্রসারিত হবে বাংলাদেশের আরো আধুনিক ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার পথ। গতকাল ছিল এই সাধক বিজ্ঞানীর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করি।
লেখক : চেয়ারম্যান, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ
