কোচ লোকটির কেমন হওয়া উচিত?
এ নিয়ে বিশ্বে নানা শক্তিশালী মতামত আছে। কেউ বলেন কোচ হবেন অভিভাবক, কেউ বলেন কোচ হবেন শিক্ষক। কারো মতে কোচের হওয়া উচিত সেনাপতির মতো—সব ঝড়ঝঞ্ছা সামলে দেবেন সামনে থেকে। আবার শেন ওয়ার্নের মতো কেউ কেউ বলেন, ক্রিকেটে কোচেরই দরকার নেই। ঠিক উল্টো, কেউ কেউ মনে করেন, কোচ অভিভাবক-শিক্ষক বা সেনাপতি নন; তাকে হতে হবে খেলোয়াড়দের একজন ভালো বন্ধু।
শেন জার্গেনসেন অভিভাবক ছিলেন কি না, ভালো শিক্ষক ছিলেন কি না, সামনে থেকে দলকে হাতের মুঠোয় রাখতে পারতেন কি না; এসব নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলতে পারে। তবে একটা ব্যাপার নিয়ে বিন্দুমাত্র বিতর্ক নেই—শেন জার্গেনসেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে খেলোয়াড়দের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলেন।
গতকাল কেক কেটে, হাতে হাত রেখে সেই বন্ধুকে আবেগে ভাসিয়ে বিদায় দিলেন মুশফিকুর রহিমরা।
আগের দিন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে সব কাগুজে সম্পর্ক চুকিয়ে গেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে গতকাল রাতে আপাতত শেষবারের মতো ঢাকা ছেড়ে বাড়ির পথে রওনাও হয়ে গেছেন। এই কাগুজে সম্পর্ক মিটে যাওয়া আর বাড়ি রওনা হয়ে যাওয়ার মাঝে জার্গেনসেনের জন্য অনেকটা চমক হয়ে এসেছিলো বিসিবির আয়োজনে এই বিদায়ী অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে বিসিবিকে, খেলোয়াড়দের, সমর্থকদের দফায় দফায় আবারও ধন্যবাদ দেয়ার পাশাপাশি বললেন তিনি আসলেই চমত্কৃত হয়েছেন এমন বিদায়ী আয়োজনে, ‘আমি এমনটা কল্পনা করিনি। বাংলাদেশে আমার একটার পর একটা নতুন অভিজ্ঞতাই হচ্ছে।’
এসব অভিজ্ঞতার আবেগ জার্গেনসেনকে ছুয়ে যাওয়ার কথা।
তবে জার্গেনসের বিদায়ের এই সময়টা সবচেয়ে বেশি ছুয়ে যাচ্ছে তার ওই বন্ধুতুল্য শিষ্যদেরই। জাতীয় দলের অধিনায়ক মুশফিক এতোদিন বলবো-বলবো করেও অনেককিছু বলেননি। গতকাল বিদায়ী অনুষ্ঠানে এসে পরিস্কার বলে দিলেন, আর যাই হোক মানুষ জার্গুনসেনের তুলনা ক্রিকেটে তিনি পাননি কখনো, ‘আমি যত বিদেশি কোচের সাথে কাজ করেছি, এমন মানুষ আর পাইনি। আসলে এত কাছ থেকে আর কারো সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়নি আমার। কারণ, এই সময়ে আমি অধিনায়ক ছিলাম। সেদিক থেকে বলব, অসাধারণ একটা মানুষ। অবশ্যই ওকে অনেক মিস করব।’
তবে বন্ধু-গুরু কেন চলে যাচ্ছেন, সে নিয়ে বিতর্কিত কোনো কিছু বলা থেকে বিরতই থাকলেন অধিনায়ক। বললেন, হয়তো নিজের কোনো কারণে বা অন্য কোনো কারণে যাচ্ছেন কোচ। কারণ যাই হোক, তার শুভকামনা করতে মুশফিক দ্বিধা করলেন না।
মুশফিক অবশ্য এই মুখে মুখে জার্গেনসেনকে বিদায় উপহার দেয়ার পক্ষে নন। তিনি মাঠেই এই প্রিয় কোচকে উপহারটা দিতে চান, ‘আমার মনে হয় যদি আমরা ভালো ফল করতে পারি, তার চেয়ে বড় উপহার ওর জন্য আর হবে না। আমরা ওর হাত ধরে যতটুকু সাফল্য পেয়েছি, সেটা যেন আরও ধারাবাহিক হয় সেই চেষ্টাই থাকবে, ইনশাআল্লাহ।’
মুশফিক বলেছিলেন, শেন পদত্যাগ করার পর দেশে ফিরলে তাকে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করবেন। গতকাল বললেন, সে অনুরোধ রাখার মতো জায়গায় আর কোন ছিলেন না, ‘ও আসার পরপরই কথা বলেছিলাম। ও আমাকে বলেছে, যে এটা ওর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ওর পরিবারের পক্ষ থেকেও এ সিদ্ধান্ত এসেছে। এরপর আর অনুরোধ করা যায় না।’
অনুরোধে যেহেতু কাজ হয়নি, এখন চোখের পানি মুখে বিদায়ই দিতে হচ্ছে জার্গেনসেনকে। সেই সঙ্গে মুশফিকদের সামনে তাকাতে হচ্ছে। এখন নতুন কোচ যিনি আসবেন, তাকে নিয়েই আশায় বসত করতে চান অধিনায়ক, ‘আশা তো অবশ্যই থাকবে, একজন ভালো কোচ যেন পাই। তবে আশা করব যেন, নতুন কোচ আমাদের সংস্কৃতিতে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। আমাদের খেলোয়াড়দের যেন খুব তাড়াতাড়ি চিনতে পারেন। আমার মনে হয় এটা সব চাইতে বেশি জরুরী। আর জরুরী এমন কোচ, যিনি খেলোয়াড়দের মোটিভেট করতে পারেন। এই লেভেলে এসে স্কিলটার চেয়ে এই দক্ষতাটা বেশি দরকার।’
