[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

খসে পড়ছে বিকাশপুরুষের পলেস্তারা

আপডেট : ০৯ মে ২০১৪, ২১:৪৩
লৌকিক ভাষায় কথা বলা, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বরাবরের অভ্যাস। এটাই তাঁর জনচিত্ত জয়ের শক্তি, যেমন মওলানা ভাসানী বলতেন, বলতেন শের-এ-বাংলা ফজলুল হক। বর্ধমানের সন্তান, কিংবদন্তী তুল্য কমিউনিস্ট নেতা হরে কৃষ্ণ কোঙারও মেঠো জবানে জনসভাকে মোহাবিষ্ট করে রাখতেন। মমতাও তেমনি। পাঞ্জাবের স্বর্ণমন্দিরে অকাল তক্তে বসে জঙ্গি শিরোমনি সন্ত ভিন্দ্রানওয়ালেকেও ছন্দবদ্ধ গদ্যে সাধারণ, অতি সাধারণের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। ভাষাই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তার উত্স। ইসলাম পূর্ব আরবে, কাহিন নামে একদল লোকের সন্ধান মেলে, যারা ভবিষ্যদ্বাণী করতেন, কাব্যমিশ্রিত গদ্যে, লোকভাষা কণ্ঠে তুলে প্রতিপক্ষকে জব্দ করে দিতেন। মমতা ব্যানার্জির ভাষার আবেদন নিবেদন একই ধাঁচের, ওই একই ধরনের ভাষা প্রয়োগ করেন বলেই সম্ভবত তিনি এত লোকপ্রিয় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিকটাত্মীয়। বাক্যগঠনে, শব্দ প্রয়োগে ব্যাকরণের ধার ধারেন না, ভেতরের আবেগ যা যোগান দেয়, তা বেপরোয়া বলে ফেলার দুঃসাহসে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী খোঁজার মানে হয় না, কারণ এই সহজিয়া ভাষা তাঁর পোশাক, তাঁর আচরণ, তাঁর অভিপ্রেত লক্ষ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তথাকথিত শহুরে ভদ্রলোকদের বাচনভঙ্গি থেকে এ ব্যাপারে তাঁর দূরত্ব বিস্তর বলেই তাঁর শব্দ প্রয়োগ নিয়ে অনেক সময় ‘হাসাহাসি’ কানে আসে। ভাষাবিজ্ঞানের লোকসম্পদের সঙ্গে আমাদের খানিকটা পরিচয় আছে। তাই লেখার শুরুতেই একথা বলতে হল। দ্বিতীয়ত, বিষয়টির অবতারণার প্রধান কারণ, ৪ এপ্রিল, কুলটির জনসভায় মুখ্যমন্ত্রীর ‘মেহমান’ শব্দের ব্যবহার। উত্তর প্রদেশ, বিহার বা অন্যান্য রাজ্য থেকে বাংলায় যাঁরা কাজ করতে আসেন, যুগ যুগ ধরে আসছেন, স্বভাবজাত ভঙ্গিতে তিনি তাঁদের উদ্দেশ্যেই সম্মানজনক শব্দটি ব্যবহার করেছেন। বাংলা ভাষার গ্রহণ-যোগ্যতার গুণে ফার্সিজাত ‘মেহমান’ বঙ্গীয় অভিধানে, লোকবচনে শ্রদ্ধার সঙ্গে সমাদৃত। শব্দটির মানে আদতে, আদপেই ‘বহিরাগত’ নয়। ভেতরের স্বচ্ছ আবেগ ছুঁয়েই মমতা বলেছেন- ‘উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা আমাদের মেহমান, তাঁদের দেখতে হবে, ভালোভাবে রাখতে হবে।’ কী আশ্চর্য, পরদিন থেকেই বেমেহমান তর্জা শুরু হয়ে গেল। কেউ কেউ বলতে লাগলেন, অ-বাঙালিদের মমতা বহিরাগত বলেছেন। কারো কারো ধারণা, এই ধরনের শব্দ ব্যবহার অন্যায়, এক ধরনের উস্কানি। বিজেপি হাতের নাগালে? যেন ব্র?হ্মমাস্ত্র খুঁজে পেয়ে গেল, অভিযোগ উঠতে লাগল, মুখ্যমন্ত্রী বাঙালি অবাঙালির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইছেন। বিস্মিত বোধ করছি- পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল, আফগানিস্তান আর ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে যে শব্দের এত কদর, এত লোকায়ত সম্মান, তারই এমন কদর্য বিকৃতি! ভোটের হাওয়াকে ঝড় ভেবে আর জনসভায় জনতরঙ্গ দেখে শব্দের অর্থ বিকৃতির মোড় পুরোপুরি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন মোদিজি। ২৮ এপ্রিল, হুগলির শ্রীরামপুরে বাংলার মাননীয় ‘মেহমানকে’ স্বাগত জানাল জনোচ্ছ্বাস। কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়াম দেখেই বুঝি উথলে উঠল তাঁর আপ্লুত ভাবাবেগ। বুদ্ধি থেকে, স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেল যুুক্তি। বললেন, ভোটব্যাঙ্কের দিকে তাকিয়ে এরাজ্যে মমতাজি রাজনীতি শুরু করেছেন। বাংলাদেশ থেকে যাঁরা আসেন, তাঁদের দেখলে তাঁর মুখ চক চক করতে থাকে। আদর করে তিনি তাঁদের রেখে দেন। কিন্তু বিহার, উড়িষ্যা থেকে গরীব মানুষ কাজে এলে তাঁদের তিনি ‘পর’ ভাবতে থাকেন। তাঁরা হেনস্থার শিকার হন।’ একথা বলেও থামেননি দামোদারদাস। প্রকাশ্য ভাষায় ঘোষণা করলেন- ১৯৪৭-এর পরে ভারতে যারা এসেছেন, তাঁরা বিছানা বেডিং বেঁধে রাখুন, ১৬ মে পার হলেই বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে।’ বিজেপির বিকাশপুরুষের এই উস্কানি, এই মোলায়েম হুমকির জবাব দিয়েছেন মমতা, আবেগ আপ্লুত ঝাঁঝালো ভাষায়, যথার্থ যুুক্তি দিয়ে, ইতিহাসের তথ্য দিয়ে বলেছেন, বিভাজনের আগুন নিয়ে খেলছেন ‘নমো’। কিন্তু বাঙালি সমাজ কি হঠাত্ এতই মোহাচ্ছন্ন হয়ে গেল যে প্রতিবাদ করল না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও কেন জানি মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকল। ভোট প্রচারের রাজনীতি কি এতই দলসর্বস্ব যে জাতির মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি, দেশভাগের ক্ষতটিও ভুলে গেল। যে আসাম বহিরাগত, বিদেশি অনুপ্রবেশের সূতিকাগার, যেখানে বাঙালি খেদাও, বিদেশি খেদাওকে ঘিরে বার বার একপেশে জাতিদাঙ্গা হয়েছে, যেখানে বাঙালি, মাড়োয়ারি, বিহারি, নেপালি এবং হিন্দিভাষী চা শ্রমিক বর্ণনাতীত হেনস্থার শিকার হলেও এত চওড়া সুরে, বুক ফুলিয়ে কেউ কখনো ভোটের সময় বলেননি- অবরো, অআহোম, অসমিয়াদের ভারত থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। বললেন মোদিজি, তা-ও বাংলার মাটিতে, যেখানে দেশভাগের আগে অথবা পরে একবারও জাতিদাঙ্গা দেখা দেয়নি। উনিশ শতকে চটকল, চা বাগান, রেললাইন গড়ে উঠছিল, তখন থেকেই শ্রমিকদের বাংলায় প্রবেশ শুরু (লেবার মাইগ্রেশন)। এই অভিবাসন বাংলার চিরায়ত সম্প্রীতিকে সমৃদ্ধ আর বহুত্বমুখী করেছে। এখনো করছে। সুলতানি আমল থেকে বাংলার নানা জাতি, নানা সম্প্রদায় কখনো এখানকার লোকাচারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে, কখনো স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে বসবাস করছেন। বাঙালি কোণঠাসা হয়েও কখনো তাদের হেনস্থা করেনি। মোদিজি মন্তব্য প্রত্যাহার করবেন কিনা জানি না, তবে ইতিহাসও তাঁর একটু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যার পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে বাঙালির গ্রহণশীলতার, মেহমানদারির ধারাবাহিক ঐতিহ্য। আরেকটি কথা, ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গ থেকে এপার বাংলায় যাঁরা এসেছেন, তাঁদের ক্ষত, তাঁদের দুঃখবোধ স্পর্শ করতে হলে শস্য সবুজ এবং নদীমাতৃক বঙ্গভূমির বেদনা, একটুখানি সহানুভূতি দিয়ে খুঁজে দেখা দরকার। দামোদারদাস মোদির জাতিকে পূর্বপূরুষের ভিটে ছাড়তে হয়নি। আরব সাগরের তীরবর্তী রুক্ষ মাটিতে তাঁর জন্ম। শুষ্ক রাজনীতি আর ইটপাথরে গড়া উন্নয়ন নিয়েই তিনি ব্যস্ত। দেশত্যাগের বেদনা যে কী গভীর, কী রক্তাক্ত-তা কি তাঁর পক্ষে বোঝা সম্ভব? ভাষার জন্য, সংস্কৃতির নিরাপত্তার জন্য, তার জাতীয় অস্তিত্বের জন্য, দেশের স্বাধীনতার পর থেকে বাঙালির আত্মত্যাগ আর রক্তক্ষরণের হিসেব জানা থাকলে হয়তো এমন নির্মম বিবৃতি থেকে বিরত থাকতেন এবং যাঁরা উদ্বাস্তু বা উদ্বাস্তু নন-তাঁদের সবার সহিষ্ণুতাকে বোঝার চেষ্টা করতেন। ৪ মে, রবিবার আসানসোলের ভোট প্রচারে এসেও উত্তেজক, প্ররোচণামূলক বিবৃতি খানিকটা বদলে দিয়ে মোদিজি উদ্বাস্তু এবং অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে একটা ভেদরেখা এঁকে দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে যেসব হিন্দু এসেছেন, তাঁরা শরণার্থী। যাঁরা অনুপ্রবেশ করে বসবাস করছেন, তাঁরা বিদেশি। এটা অবশ্য নতুন কথা নয়, সঙ্ঘ পরিবারের ঘোষিত নীতিরই পুনরাবৃত্তি। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠে, কে অনুপ্রবেশকারী, কে উদ্বাস্তু- এই বহু বিতর্কিত ইস্যুটি ভোটের সময় উঠছে কেন? সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে বড়ো করতে? তার মানে খসে পড়ছে বিকাশপুরুষের পলেস্তারা? দ্বিতীয়ত, কে উদ্বাস্তু, কে শরণার্থী, কে বিদেশি তা নির্ণয়ের পদ্ধতি কী? মুখের অনিয়ন্ত্রিত ভাষা? সমস্যাটি অনেক রক্ত ঝরিয়েছে আসামে। হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছেন। আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে উঠবে। যাঁর সামনে-পেছনে, উন্নয়নের স্বপ্ন ছুটছে। ছুটছে যুবশক্তি। যিনি প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বপ্ন দেখছেন, তাঁর এরকম স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে দায়িত্বশীল হওয়া উচিত নয় কি? বরেণ্য সমাজ বিজ্ঞানী সুজিত্ চৌধুরি একবার বলেছিলেন, ‘ডবল সংখ্যালঘু’ সাজতে কোনো বাংলাদেশি আসামে আসবে না, আসতে পারে না। ভুল বলেননি প্রয়াত ইতিহাসবেত্তা। প্রসঙ্গত আরেকটি কথা, বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত (সারপ্লাস) জনসংখ্যার ভারত প্রবেশের অর্থনৈতিক তত্ত্বটিও আর ধোপে টিকছে না। টি এন সেশনের আত্মজীবনীর লেখক সঞ্জয় হাজারিকা বিষয়টি চাপিয়ে দেয়ার অশেষ কসরত করেছেন। তাঁর চেষ্টা ব্যর্থ। রুটি রোজগারের জন্য বাংলাদেশ থেকে নিরন্তর অনুপ্রবেশ ঘটছে, এই তথ্যকেও অসত্য প্রমাণ করছে বাংলাদেশের উন্নয়ন (৬-৭ শতাংশ), মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং সংরক্ষিত বিদেশি মুদ্রা ভাণ্ডার (২০ বিলিয়ন ডলার)। ১ কোটিরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে কর্মরত। তাঁরাই তাদের সাহস, দুঃসাহস, পরিশ্রমী জেদের দৃষ্টান্ত। এলোমেলো হলেও সম্প্রতি জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা ও অন্যান্য বড় বড় শহরে একজন রিকশা চালকের দৈনিক আয় অন্তত ১ হাজার টাকা, অটো ড্রাইভারদের আরো বেশি। রিকশা চালকদের বড় অংশের বাড়ি ভারতের সীমান্ত লাগোয়া রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা জেলায়। ঢাকা থেকে ৬৪ কিলোমিটারের ভেতরে যাঁদের বাড়ি, তাঁদের প্রধান আয়ের উত্স গার্মেন্টস কারখানা, বিশেষ করে মহিলাদের। (পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে বিশ্বে দ্বিতীয়)। এসব তথ্য যদি নির্ভুল না হয়, তাহলে কোনো বুড়বকও কি অনুপ্রবেশকারীর অপমান আর প্রতিমুহূর্তে গলাধাক্কার ভয় হজম করতে দেশ ছেড়ে এখানে আসে? হ্যাঁ, কেউ কেউ চোরাপথে এসে বিষবাষ্প ছড়াতে চায়, যেমন বাংলাদেশে ছড়াচ্ছে, তাদের রুখতেই হবে। যদি সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়ে কেউ কেউ বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন, বিবেক নিয়ে, যুক্তি নিয়ে তাঁদের পাশে অবশ্যই খাড়া হোক সার্বিক নিশ্ছিদ্র পাহারা। তাঁদের আমরা শরণার্থী ভেবে হেয় করব না, বলব আমাদের ভাই, আমাদের নিকটাত্মীয়। এটাই তো বাঙালির বিবেকের ধর্ম। লেখক:ভারতীয় সাংবাদিক ও সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন