সামাজিক ব্যাধির নিরাময় জরুরি

আপডেট : ০৯ মে ২০১৪, ২১:৪৯
দেশের নানা প্রান্ত হইতে প্রতিদিন খবর আসিতেছে খুন খারাবির। গুম খুনের কোনো কোনো ঘটনা দেশ জুড়িয়া চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করিয়াছে। ইহারই মধ্যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল হইতে চরমপন্থি তত্পরতার খবর পাওয়া যাইতেছে। গত ৪ বত্সরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহে প্রায় তিনশত খুনের ঘটনা ঘটিয়াছে বলিয়া পত্রিকান্তরে রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বিভিন্ন চরমপন্থি গ্রুপের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বেশিরভাগই নিহত কিংবা কারান্তরীণ রহিয়াছে। এখন নিম্ন পর্যায়ের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা সক্রিয় রহিয়াছে। তাহারা বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের ভাড়াটিয়া হিসাবে কাজ করিয়া থাকে। মোটের উপর সারাদেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে তাহা যে স্বস্তিদায়ক নহে সেই কথা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। বিরাজমান অবস্থাটিকে বিভিন্ন মহল তাহাদের নিজ নিজ অবস্থান হইতে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করিয়া চলিয়াছেন। গুম খুনের ঘটনাকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার কোশেশও চলিতেছে বিস্তর। আবার বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনা বলিয়া আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক নহে এইরকম মতও দিতেছেন কেহ কেহ। কিন্তু গোটা পরিবেশ পরিস্থিতি যে সামাজিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ সেই বিষয়টি গুরুত্ব পাইতেছে না। সমাজবিজ্ঞানীরা বলিয়া থাকেন, কোনো সমাজের বেশির ভাগ মানুষের মনে যখন এই ধারণা বদ্ধমূল হইয়া যায় যে, নীতি নিয়মের সহজ সরল পথে কোনো কিছুই হইবার নহে, তখন অনৈতিক পথ বাছিয়া লইতে মানুষ দ্বিধা করে না। যখন দেখা যায় যে, কোনো প্রকারে প্রভাবশালী হইয়া উঠিতে না পারিলে সমাজে টিকিয়া থাকা কঠিন, তখন কিছু মানুষের পক্ষে প্রভাব অর্জনের প্রতিযোগিতায় নামিয়া পড়া বিচিত্র নহে। আর সেই প্রতিযোগিতার পথটি সবসময় মসৃণ ও সুস্থ স্বাভাবিক হইবে, এমন কথা বলা যায় না। যেইভাবে পারা যায় ধনশালী হইতে হইবে, এমন নাম করিতে হইবে যাহাতে নাম শুনিলে লোকের গা শিহরিত হইয়া উঠে। সম্পদ ও প্রভাব অর্জনের জন্য প্রতিপক্ষ নিধন এবং আইন অমান্য করিতে গিয়ে বেপরোয়া হইয়া উঠিতে তাহারা দ্বিধা করে না। এই কথা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, উন্নয়নশীল দেশসমূহে অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সংকীর্ণ হইয়া আসিয়াছে। ব্যবসায় বাণিজ্য, চাকুরী-বাকুরী, চিকিত্সা এমনকি শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন কোনো জায়গা নেই যেইখানে ন্যায্যতার আশা করিতে পারা যায়। অনেকে পরিহাস করিয়া বলিয়া থাকেন যে, এইসব দেশ ‘অফুরন্ত সম্ভাবনার’ দেশ। এই ‘অফুরন্ত সম্ভাবনা’ শব্দ দুইটিকে তাহারা ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করেন না। তাহাদের এই সম্ভাবনার অর্থ হইল প্রভাব ও অর্থ থাকিলে এইসব দেশে যাহা চাই তাহাই পাওয়া যায়। আর ওই জিনিস না থাকিলে বৈধভাবে ন্যায়সঙ্গত পন্থায় যাহা পাওয়ার তাহার কিছুই পাওয়া যায় না। বিচার পাওয়া যায় না। অথচ তথাকথিত প্রভাব থাকিলে অবিচারের গায়ে ন্যায় বিচারের লেভেল আঁটিয়া দেওয়াও কঠিন নহে। এই সামাজিক পরিস্থিতিতে সমাজের গর্ভ হইতে ক্ষুব্ধ-নিরাশ মানুষের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসে অন্ধ নির্দয় কবন্ধ দৈত্য। সেই দৈত্যের বিবেক নাই। সে যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারে। প্রতিহিংসার আগুনে সে পোড়াইয়া দিতে চাহে সমস্ত নিয়ম-শৃংখলার বাঁধ। সে কন্টকাকীর্ণ করে শান্তির পথ। সেইসব দৈত্য নিজেদের রক্ষা করিবার জন্য বিবিধ আমব্রেলার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া থাকে। আর সেই আমব্রেলা বা ছাতাটি রাজনৈতিক হওয়াও বিচিত্র নহে। এই অবস্থাটি সমাজে একদিনে তৈয়ার হয় নাই। ক্রমে ক্রমে বাড়িয়াছে দেনা। সেই ঋণ শোধ করিতে হইতেছে। শুধু কোনো গোষ্ঠীকে এই জন্য এককভাবে দায়ী করা যায় না। এই অবস্থা হইতে বাহির হইয়া আসিবার কোনো পথ কি নাই? আছে সেই পথ নিশ্চয়ই। আর সেই পথটি হইল সমাজের যিনি যেই অবস্থানে আছেন, সেই অবস্থানের সীমারেখাটি মানিয়া চলা। সেই সীমারেখাটি হইল আইন নির্দেশিত সীমারেখা। সীমালংঘনকারীদের আল্লাহতায়ালা পছন্দ করেন না। একদল সীমালংঘন করিলে অন্যপক্ষও তাহা করিবে। এই এক ভয়ংকর সংক্রামক নারকীয় ব্যাধি। যন্ত্রণাদায়ক এই সামাজিক ব্যাধির উপশম দরকার।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন