খবরে প্রকাশ, শরীয়তপুরের ১২৯টি প্রাইমারি স্কুল ঝুঁকিপূর্ণ। তন্মধ্যে ১২টি স্কুল রহিয়াছে অতি ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায়। আর ১০টি স্কুলকে ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হইয়াছে। যেই স্কুলগুলি পরিত্যক্ত ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, সেইখানে ক্লাস হইতেছে খোলা মাঠে। রোদে পুড়িয়া ও বৃষ্টিতে ভিজিয়া শিক্ষার্থীরা বাধ্য হইয়াই ক্লাস করিতেছে। কেহ কেহ অসুস্থতার কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসিতে পারিতেছে না। কোন কোন বিদ্যালয়ে আকাশে মেঘের গর্জন শোনা গেলেই ছুটির ঘণ্টা পড়িয়া যায়। কোথাও কোথাও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাথার উপর খসিয়া পড়িতেছে প্লাস্টার বা ইটের টুকরা। বৃষ্টির সময় ছাদ দিয়া পড়িতেছে পানি। তাহাতে ভিজিয়া যাইতেছে বইপত্র। এইসব স্কুলে রানা প্লাজার ন্যায় নূতন কোন ট্রাজেডি যে ঘটিবে না তাহার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। ভবন দাবিয়া যাওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, নিম্নমানের নির্মাণ প্রভৃতি নানা কারণেই এইসব বিদ্যালয় আছে ঝুঁকির মুখে। এইসব স্কুলের প্রধান শিক্ষকগণ ভবনগুলির দুরবস্থার কথা জানাইয়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সময়ান্তরে অবহিত করেন এবং সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকার এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর দফতর একটি তালিকা প্রণয়ন করে। সেই তালিকা প্রতিবেদন আকারে পাঠানো হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। তাহার পরও অর্থ বরাদ্দ পাইতে অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী শরীয়তপুর জেলার ৬টি উপজেলায় মোট ৬৬৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। তাহার মধ্যে শতাধিক স্কুল ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি স্কুলের বাহিরেও আরও কয়েক ধরনের বেসরকারি স্কুল আছে, তাহার প্রসঙ্গ না হয় নাইবা টানা হইল। আবার শুধু শরীয়তপুর জেলা নহে, দেশের অন্যত্রও এই সমস্যা বিরাজমান। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে দেখা যায়, দেশে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ের সংখ্যা সাত হাজার ৩৮৫টি। সরকারি আরেক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের সংখ্যা ৮৩ হাজার। এই হিসাবে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে এই পরিসংখ্যানের কিছুটা হেরফের হইতে পারে। কিন্তু মূল সমস্যা এখনও রহিয়া গিয়াছে।
সার্বজনীন শিক্ষার প্রসারে প্রতিটি সরকারই প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করিয়া আসিতেছে। ইহার প্রক্রিয়ায় এই সংক্রান্ত একটি আলাদা মন্ত্রণালয়ও গঠন করা হইয়াছে। তাহাছাড়া সংবিধানের ১৭ ধারা অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার দায়-দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই সরকারি বা বেসরকারি যাহাই হউক, প্রাইমারি স্কুল ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ থাকিবে কেন? আসলে এইক্ষেত্রে মূল সমস্যা হইল বাজেট। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের অভাবে ইতোমধ্যে উপবৃত্তির টাকা দেওয়া সম্ভব হইতেছে না। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী যেইসব স্কুল ভবন ঝুঁকিপূর্ণ আছে তাহার সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করিতে হইলে লাগিবে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। একে তো চাহিদা অনুযায়ী আমরা কাজ করিতে পারিতেছি না, উপরন্তু নূতন নূতন ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করিতেছে। তবে এই খাতে যে দুর্নীতি ও অনিয়ম হয় তাহা বন্ধ করিতে পারিলেও অবস্থার কিছুটা উন্নতি হইতে পারে। মূলত প্রাইমারি স্কুল ভবন সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দুইটি মন্ত্রণালয় জড়িত। এই দুইটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকাটা একান্ত জরুরি। স্কুল ভবন সংস্কার ও অন্যান্য অবকাঠামোগত খাতের উন্নয়নে ক্রমান্বয়ে বাজেট বাড়াইতে হইবে। স্কুলগুলি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নানাভাবে নিজেদের আয় বৃদ্ধিরও চেষ্টা করিতে পারে। এইক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগকে উত্সাহিত করা যায়। ধনাঢ্যবান ও দানশীল মানুষের পাশাপাশি যাহারা সেই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমানে কর্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত, তাহারাও স্কুলভবন সংস্কার বা পুনর্নির্মাণে আগাইয়া আসিতে পারেন। তাহাদের নামে স্কুল ভবনের বিভিন্ন কক্ষের নামকরণ করা যাইতে পারে। এইভাবে আমরা সম্মিলিত চেষ্টায় এই সমস্যা ধীরে ধীরে হইলেও কাটাইয়া উঠিতে পারি।
