গাড়িতে অননুমোদিত গ্লাসের ব্যবহার অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে

আপডেট : ১০ মে ২০১৪, ২০:৫৭
একের পর এক নির্দেশ জারি করাটাই যেন রেওয়াজে পরিণত হইয়াছে। সেই নির্দেশ বাস্তবায়িত হইল কি হইল না তাহা দেখিবার কেহ নাই। অবস্থাদৃষ্টে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জনপ্রিয় একটি পঙক্তি মনে পড়িয়া যাইতে পারে—যেইখানে কবি বলিয়াছেন, ‘আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ’। তদ্রূপ নির্দেশ দান করাটাই যেন সরকারি প্রশাসনের আনন্দ বা আত্মতৃপ্তির বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সম্প্রতি অনুরূপ আর একটি নির্দেশ জারি করা হইয়াছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত সেই নির্দেশে বলা হইয়াছে যে, ১০ই মের মধ্যে মাইক্রোবাসে লাগানো কালো, রঙিন, মার্কারি ও অস্বচ্ছ গ্লাস অপসারণ করিতে হইবে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই প্রজ্ঞাপন কিছুটা সংশোধন করা হইলেও জিপ ও কারসহ অন্য সকল গাড়ির ক্ষেত্রে কী নীতি অনুসৃত হইবে, তাহা স্পষ্ট করা হয় নাই। ফলে সৃষ্টি হইয়াছে বিভ্রান্তির। এই অবস্থায় অদ্য রবিবার হইতে শুরু হইতেছে নির্দেশিত গ্লাস অপসারণ অভিযান। সাধারণ মানুষ অবশ্য এই ধরনের নির্দেশ ও অভিযান লইয়া খুব একটা মাথা ঘামান বলিয়া মনে হয় না। কারণ তাহারা জানেন যে, যখনই সরকার বিব্রত হইতে পারে এমন গুরুতর কোনো দুর্ঘটনা ঘটে—তখনই নির্দেশনা জারি করার হিড়িক পড়িয়া যায়। সেই সাথে ঢাকডোল পিটাইয়া শুরু হয় অভিযান। আবার আতশ বাজির মতো দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিয়া নিভিয়া যাইতেও সময় লাগে না। এইবারের নির্দেশনাটিও যে নারায়ণগঞ্জের লোমহর্ষক সাতখুনের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়াজাত, তাহা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ভাবখানা এমন যে, আগে এই ব্যাপারে কোনো নির্দেশ বা নিষেধাজ্ঞা ছিল না। অর্থাত্ প্রশাসনের নাকের ডগায় দীর্ঘদিন ধরিয়া কালো, রঙিন ও অস্বচ্ছ গ্লাসধারী যেইসব গাড়ি চলাচল করিতেছে—তাহা বৈধ বা আইনসম্মত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা যে সম্পূর্ণ বিপরীত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও তাহা স্বীকার করিয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে ঢালাওভাবে এই ধরনের গ্লাস ব্যবহারের অনুমতি কখনোই ছিল না। তবে ক্ষেত্রবিশেষে তাহা অনুমতি সাপেক্ষ ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে নূতন করিয়া তাহা অপসারণের নির্দেশ জারি করিয়া চমক সৃষ্টি অথবা নিজেদের দায়িত্বহীনতা আড়াল করিবার চেষ্টা হইয়াছে মাত্র। জননিরাপত্তার জন্য এই ধরনের গ্লাস এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। ইহাও অনস্বীকার্য যে, নাইন-ইলেভেনপরবর্তী বিশ্ব বাস্তবতা এবং সমগ্র উপমহাদেশ জুড়িয়া ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসী তত্পরতা সেই ঝুঁকিকে বহুলাংশে বাড়াইয়া দিয়াছে। আমাদের গত এক দশকের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতাও কম ভয়াবহ নহে। একের পর এক গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হইতেছে। বাড়িতেছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। এমতাবস্থায়, এই ধরনের গ্লাস অপসারণের প্রশ্নে কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকিবার কথা নহে। কিন্তু এই স্ববিরোধিতার মধ্যেই যে আমাদের বসবাস—হতাশাব্যঞ্জক হইলেও তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। গাড়িতে অননুমোদিত গ্লাসের ব্যবহার অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে। তবে ইহার জন্য নূতন করিয়া প্রজ্ঞাপন জারিই যথেষ্ট নহে, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। কালো ও অস্বচ্ছ গ্লাসযুক্ত যেইসব গাড়ি বিল্ড-ইন অবস্থায় দেশে প্রবেশ করিতেছে—সংশ্লিষ্ট বন্দরেই তাহা বন্ধ করিতে হইবে। আর অভ্যন্তরীণভাবে গ্লাসে এই ধরনের কালো বা অস্বচ্ছ স্টিকার বা বিশেষ ধরনের কাগজযুক্ত গাড়িগুলিকে ঘটনাস্থলে জব্দ বা আটক করিয়া পুলিশ হেফাজতে আনিতে হইবে। আইন অমান্যকারী যাত্রী বা চালকদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করিতে হইবে আইনানুগ ব্যবস্থা। একের পর এক প্রজ্ঞাপন জারি করিয়া যাহা সম্ভব হয় নাই, তাহা নিশ্চিত করিবার জন্য এই ধরনের দুইএকটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট বলিয়া আমরা মনে করি। নির্দেশ যদি বাস্তবায়নই করা না যায়—সেই নির্দেশ জারি করিবার আবশ্যকতাই-বা কী, তাহা আমাদের বোধগম্য নহে।