বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস ও পাখি সংরক্ষণের গুরুত্ব

আপডেট : ১০ মে ২০১৪, ২১:৫৫
পরিযায়ী পাখিরা প্রতি বছর যে ভৌগোলিক পথে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিয়মিতভাবে পরিভ্রমণ করে থাকে তাকে উড়ন্ত পথ বলে। দেশান্তরী হওয়ার মূল কারণগুলোর মধ্যে ঋতু পরিবর্তন, খাদ্যের প্রাপ্যতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও বংশানুক্রমিক ধারা অন্যতম। শীত মৌসুমে হিমালয় পর্বতমালা এবং সুদূর সাইবেরিয়া থেকে, কদাচ উত্তর মেরু থেকেও কিছু পাখি আমাদের দেশে প্রতিবছরই আসে এবং আবার ফিরে যায়। এই সাংবার্ষিক আসা-যাওয়াই হচ্ছে পাখির পরিব্রজন, অভিপ্রায়ন বা মাইগ্রেশন। অভিপ্রায়ত পাখিকে আমরা বলি শীতের পাখি, অতিথি পাখি, পরিব্রাজক, যাযাবর বা পরিযায়ী পাখি। আমাদের দেশে দু’দলের শীতের পাখি বা অতিথি পাখি আসে। এদের এক দল কেবল এদেশেই আসে এবং এখান থেকেই ফিরে যায়। অন্য দল বাংলাদেশ থেকে আরো দক্ষিণে যায়। তারা এই আসা যাওয়ার সময় বাংলাদেশে কিছু সময় ব্যয় করে। এদেশে যাবার জন্য শীতের পাখিদের দেহে কিছু বাহ্যিক এবং কিছু আভ্যন্তরীণ উদ্দীপক কাজ করে। প্রথম উদ্দীপক হচ্ছে চামড়ার নিচে খুব পুরু হয়ে জমে উঠা চর্বি। দ্বিতীয় হচ্ছে, আবহাওয়াগত যেমন দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি, দৈনিক গড় তাপমাত্রা এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ। সারা পৃথিবীতে পাখি প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৯৯০০-১০,০০০টি আছে বলে বিশেষজ্ঞগণের ধারণা। ভারতীয় উপমহাদেশের পাখি প্রজাতির সংখ্যা ১২০০টি এবং বাংলাদেশে ৬৫০ প্রজাতি পাখি আছে বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খানের মতে আমাদের দেশে ৭৩৬ প্রজাতির পাখি আনাগোনা করে থাকে। ইতোমধ্যে গত ১ দশকে ২টি পাখি প্রজাতি যেমন- পিংক হেডেড ডাক ও রাজ শকুন বিলুপ্ত হয়ে গেছে, মহাবিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রয়েছে ১৯টি প্রজাতি। আমাদের দেশে পরিযায়ীর পাখির প্রজাতি সংখ্যা ২৫০-৩০০টি বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। শীতের পাখিরা কেন বছরে একটি নির্দিষ্ট সময়ে আসে এবং ফিরে যায় সে ব্যাপারে কোন বিশেষ মতবাদ নেই। বেশ কিছু মতবাদের ভিত্তিতে সামান্য যুক্তি দাঁড় করানো যায় মাত্র। শীতের শুরুতে হিমালয়ের তিন হাজার মিটার উচ্চতা থেকে এভারেষ্ট পর্বতের চূড়া, সাইবেরিয়া এবং উত্তর মেরু এলাকার দিনের তাপমাত্রা হ্রাস পায়, শীতের প্রচণ্ডতা বাড়ে, হ্রাস পায় দিনের আলোর পরিমাণ। সেই সাথে সকল খাদ্যবস্তু বরফের পুরো আবরণে ঢাকা পড়ে। ফলে পাখিরা উত্তর মেরু ও সাইবেরীয় থেকে দক্ষিণে; হিমালয়ের উঁচু এলাকা থেকে নীচু এলাকা, পাদদেশে বা দক্ষিণের সমভূমি এলাকায় নেমে আসে ঐসব প্রতিকূল অবস্থা থেকে আত্মরক্ষার জন্য। বাংলাদেশে প্রায় ২৫০-৩০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আছে। এর মধ্যে প্রায় ২১০টি শীতকালীন অতিথি পাখি এবং অবশিষ্ট পাখি বত্সরের অন্য সময় বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে আমাদের দেশে এসে থাকে। অতিথি পাখির মধ্যে উল্লখযোগ্য রাজহাঁস, দাগী রাজহাঁস, রাজ সরালি, পাতি সরালি, মান্দারিন হাঁস, ঝুঁটি হাঁস, চকাচকি, লেঞ্জা হাঁস, খুন্তে হাঁস, বালি হাঁস, তিলি হাঁস, লালশির, নীলশির, গিরিয়া হাঁস, পিয়ং হাঁস, ভূতি হাঁস, স্মিউ হাঁস, পাতি মারগেঞ্জার, শুমচা, পাপিয়া, খঞ্জন, ফুটকি, সাহেলি, চ্যাগা, গুলিন্দা, সারস, গ্রিধিনি, মানিক জোড়, এশিয় শামখোল, নীলকণ্ঠ, বৌরী, চামচ ঠুঁটো বাটান ও বিভিন্ন জাতের সৈকত পাখি ইত্যাদি। পাখির আবাসস্থল ধ্বংস, বন উজার, গ্রামীণ গাছ-গাছালির অভাব, জলাভূমির জবরদখল, পরিযায়ী পাখি নীলাভূমি হাওর-বাঁওড়ে ব্যাপকহারে মাছ শিকার; নদী ও সমুদ্রের নতুন চরে জেলে এবং শিকারীদের উত্পাত; যথেচ্ছ ভাবে পাখি পাচার ও নিধনের ফলে ইতোমধ্যে আমাদের দেশে আশংকাজনকভাবে পাখির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘‘Destination Flyways: Migratory Birds and Tourism’’পরিবেশ পর্যটনের জন্য পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল ও জলাভূমি সংরক্ষণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। আমাদের দেশের হাওর-বাঁওড় ও চরাঞ্চলে শীতের অতিথি পাখি দেখার জন্য হাজার-হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন ঘটে থাকে। পরিবেশ পর্যটনকে উত্সাহিত করার জন্য পরিযায়ী পাখি ও আবাসস্থল সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। পাখি আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আপনারা জেনে খুশি হবেন বাংলাদেশ বন বিভাগ অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কাজে বিশেষভাবে নিবেদিত। ইতোমধ্যে সারাদেশে অপরাধ দমন ইউনিট গঠন করা হয়েছে এবং ২০১৩ সালে প্রায় ৭৫০০ পাখি উদ্ধার করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়েছে। পাখিসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য সরকার নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেনঃ- ১। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ সংসদে পাস হয়েছে এবং উক্ত আইনের ১নং ও ২নং তফসীলে ৬৫০ প্রজাতির পাখি Protected Bird হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২। পরিযায়ী পাখি শিকার হত্যার জন্য সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ (এক) লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। ৩। সুন্দরবন ও টাংগুয়ার হাওরকে Ramsar Site ঘোষণা করা হয়েছে। ৪। বাংলাদেশ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১১ সালে EAAFP (East Asia Australasian Flayway Partnership) এর সদস্য হয়েছে এবং ৫টি এলাকাকে Flayway Site ঘোষণা করেছে এর মধ্যে টাংগুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, সোনাদিয়া ও নিঝুম দ্বীপ। এ সকল এলাকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত স্ট্রেংদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়ার্ল্ডলাইফ প্রটেকশন প্রকল্পের আওতায় বনবিভাগ/এনজিও/বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে একাধিক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ৫। সারাদেশে পাখি ব্যবসায়ীদেরকে বন্যপাখি ধরা বা বিক্রয় না করার জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতন করা হয়েছে। ৬। পাখিসমৃদ্ধ এলাকা ও পাখিপ্রেমী ব্যক্তিদেরকে উত্সাহিত করার জন্য Bangabandhu Award for Wildlife Conservation প্রদান করা হচ্ছে। ৭। স্কুল/কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতন করার জন্য সারাদেশে সভা-সমাবেশ আয়োজন করা হচ্ছে। ৮। বিরল প্রজাতির শকুনের মরনঘাতী ওষুধ ডাইক্লোফেনাক উত্পাদন নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জাতীয়ভাবে শকুন দিবস করা হচ্ছে। ৯। সারাদেশে ৪টি অঞ্চলে উদ্ধারকৃত ও আহত পাখিকে সেবাদান করার জন্য বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ১০। পাখিসমৃদ্ধ এলাকাকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় Ecological Critical Area ঘোষণা করেছে। আমরা প্রত্যেকেই যদি আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখিদের সংরক্ষণের গুরুত্ব সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে পারি তাহলে আমাদের প্রচেষ্টা স্বার্থক হবে। পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি আমাদের দেশের পরিবেশ ও পর্যটন শিল্পকে প্রসারিত করবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পরিযায়ী পাখির ইতিবাচক ভূমিকা সম্বন্ধে বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদসহ সকলকে সোচ্চার হতে হবে। পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল হাওর-বাঁওড় ও বিলসহ সকল জলাভূমি সংরক্ষণ করার আহ্বান জানাচ্ছি। পাখ-পাখালির কলতানে আমাদের দেশ ভরে উঠুক এই প্রতাশা করছি। লেখক:বন সংরক্ষক বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল, বাংলাদেশ বন বিভাগ।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন