চল্লিশ বছর বয়স।
এটা আর যাই হোক, যুদ্ধে যাওয়ার বয়স নয়। এই চল্লিশে নাকি চালশে পড়ে যায় চোখে। এই চল্লিশে মানুষ গোছানো সংসারে বসে স্মৃতিচারণে মজেন। এই চল্লিশে ক্রীড়াবিদরা অবসর নিয়ে ফেলেন। কিন্তু তিনি এই বয়সেও যুদ্ধে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন!
ওয়াল্ট ডিজনি একবার বলেছিলেন—মানুষের স্বপ্ন কেউ কেড়ে নিতে পারে না; নিজের ভেতরে সাহসটা থাকলে স্বপ্ন পূরণ হবেই।
এমন কতো উদ্ধৃতিই তো ‘মনীষীদের বাণী’ খুঁজলে পাওয়া যায়। আমরাও তো এমন কতো কথা বলি। আমরাও বলি, মানুষ তার স্বপ্নের মতো বড়। কিন্তু আমরা কী এই চল্লিশ বছর বয়সেও যুদ্ধে যাওয়ার স্বপ্ন দেখার সাহস রাখি? আমরা এই সাহস রাখি বা না রাখি, একজন মানুষ; হ্যা, একজন মানুষ এই সাহস দেখিয়েছিলেন। দেখিয়েছিলেন বলেই আজ তিনি আধুনিক ক্রিকেটের নতুন এক প্রেরণার নাম—প্রবীণ তাম্বে।
হ্যা, খোদ রাহুল দ্রাবিড়ের ভাষাতেই পৃথিবী জুড়ে সব ক্রিকেটারের লড়াই করে যাওয়ার প্রেরণার নাম চল্লিশ পার করে ফেলা প্রবীণ তাম্বে। এই কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে দুটি বৈধ ডেলিভারিতেই হ্যাটট্রিক করে ফেলা প্রবীণ তাম্বে। গতকালকের আগ পর্যন্ত ১৩ উইকেট নিয়ে এবারের আইপিএলের দ্বিতীয় সেরা বোলার ৪২ বছর ২১৫ দিন বয়সী সেই প্রবীণ তাম্বে।
তাম্বেকে নিয়ে কোনো আলোচনা করতে গেলে এই বয়সের ব্যাপারটা উল্লেখ না করলেই নয়।
তাম্বের চেয়ে অনেক বেশী বয়সী খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটও খেলেছেন। সত্তর বছর বয়স পার করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার ঘটনাও ঘটেছে পৃথিবীতে। তাম্বের চেয়ে বেশী বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকও হয়েছে কোনো কোনো ক্রিকেটারের। তাহলে তাম্বের বয়সটা কেন হঠাত্ আলোচ্য ব্যাপার হয়ে উঠলো?
কারণ, এই বয়স পর্যন্ত একটু আশার আলো ছাড়াই তাম্বের নিরলস লড়াই চালিয়ে যাওয়া। আজকের দিনে টেস্ট খেলুড়ে কোনো দেশে একজন মানুষ ৪০-৪১ বছর বয়স পর্যন্ত ক্রিকেট খেলেও সেখান থেকে জীবিকাটা চালাতে পারবেন না; এটা কল্পনা করাও কঠিন। বিশেষ করে ভারতের মতো জায়গা; যেখানে নাকি আইপিএল-টেলের কল্যাণে আকাশে রুপোর চাকতি উড়ে বেড়াচ্ছে, সেখানে এই বয়সী একজন ক্রিকেটার টাকা ছাড়াই লড়ে গেছেন এই বয়স পর্যন্ত!
হ্যা, আপনি বিস্মিত হলেও এটাই সত্যি। আর এটাই তাম্বেকে করে তুলেছে অতুলনীয়।
১৯৭১ সালের ৮ অক্টোবর, তখনকার বম্বেতে জন্ম হয়েছিল তাম্বের। এই নগরীর হাজারো শিশুর মতো ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়ে উঠছিলেন তাম্বে। স্বপ্ন ছিল একদিন তিনিও ঘরের ছেলে সুনীল গাভাস্কারদের মতো ভারতীয় জার্সি পরবেন। ক্রিকেটার তিনি হয়েছেন; কিন্তু ভারতীয় জার্সি তো দূরে থাক, কোনো পেশাদার দলেই ঠাঁই মেলেনি তাম্বের।
তাম্বে লড়াই ছাড়েননি। চোখের সামনে দুনিয়া বদলে গেছে, নিজে বদলে গেছেন। বম্বে হয়ে গেছে মুম্বাই। চোখের সামনে টেন্ডুলকারের অভিষেক হয়েছে, কিংবদন্তী হয়ে অবসরে গেছেন। সৌরভ, শচীন, দ্রাবিড়, ধোনি; কতো জনের উত্থান-পতন দেখেছেন। তাম্বে নিজেও কী কম বদলেছেন? ওজন বেড়েছে, চোখের শক্তি কমেছে, ফাস্ট বোলার থেকে লেগস্পিনার হয়েছেন। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি তাম্বের—ওই ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন।
সংসার চালাতে হেন কোনো কাজ নেই যে করেননি। ভারতে, ইংল্যান্ডে বিভিন্ন অ্যামেচার লিগে খেলে বেড়িয়েছেন, এটা-ওটা কাজ করেছেন, পাতিল স্পোর্টস অ্যাকাডেমির নেটে ‘বড়’ খেলোয়াড়দের পয়সার বিনিময়ে বল করে দিয়েছেন, এই আইপিএলের শুরু দিয়েই লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে চাকরি করেছেন।
বন্ধু কুরুভিল্লা, দ্রাবিড়রা বড় হয়ে গেছে। এসে কাঁধে হাত রেখে নির্বাক দাঁড়িয়ে থেকেছে। সবার অস্পষ্ট কথাটা ছিল—অনেক হয়েছে; এবার ক্ষান্ত দাও। তাম্বের সংসারও বলে, এবার ক্ষান্ত দাও। তাম্বে কথা শোনেন না। বলের পর বল করে যান, লড়াইয়ের পর লড়াই চলে। তাম্বে লড়ে চলেন। ’
এর মধ্যে ২০০০ সালে মুম্বাই রঞ্জি দল ঘোষণা হলো; প্রাথমিক দলে রাখা হয়েছিল তাম্বেকে। আনন্দে ফেটে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। মূল দলে থাকা হল না। তারপর আরও এক যুগ কেটে গেছে। ভারতের নাবালক ক্রিকেটারটি পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার হোলি খেলছে। আর তাম্বে ক্ষুধা পেটে নিয়ে লেগ স্পিন করেই যাচ্ছেন নেটে।
অবশেষে। অবশেষে সেই রাহুল দ্রাবিড় রুখে দাঁড়ালেন। বলা যায় সময়, স্রোত আর ক্রিকেট দুনিয়া জুড়ে চলতে থাকা তারুণ্য ও অর্থের জোয়ারের বিপক্ষে লড়লেন এবার দ্রাবিড়। গত মৌসুমের আইপিএল দলে অন্তর্ভুক্ত করা হল সেই প্রবীণ তাম্বেকে। ৪২ বছর বয়সী সত্যিকারের ‘প্রবীণ’ মানুষটি নামলেন জীবনের প্রথম পেশাদার ম্যাচ খেলতে।
এরপর? এরপর তো ইতিহাস। গত আইপিএলটা যেমন-তেমন কাটলেও চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী, এবারের আইপিএলে বিচিত্র রেকর্ডসহ সেরা বোলারদের একজন। এখন সময়টা প্রবীণের।
এই উল্টো সময়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে রাহুল দ্রাবিড়ের গলা ধরে আসছিল। শুধু বললেন, ‘আমি নিজেও আমার জন্য অতো বড় অনুপ্রেরণা নই, যতোটা তাম্বে আমাদের অনুপ্রেরণার নাম। আমি মনে করি, পৃথিবী জুড়ে সব তরুণের আদর্শ হওয়া উচিত প্রবীণ তাম্বে। অর্থ নয়, খ্যাতি নয়, সাফল্য নয়; শুধু লড়ে যেতে হবে খেলার প্রতি ভালোবাসার জন্য। নিজের স্বপ্নের জন্য ও যে লড়াইটা করেছে, যে পরিশ্রম করেছে; তা এক কথায় অনন্য।’
কলিন পাওয়েল একবার বলেছিলেন—স্বপ্ন কোনো জাদুতে পূরণ হয় না; স্বপ্নপূরণ হয় পরিশ্রমের ফলে।
প্রবীণ তাম্বের চেয়ে ভালো আর কে বোঝে কথাটা!
