সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শক্তি

আপডেট : ১১ মে ২০১৪, ২১:০৫
বেনারসের বেনিয়াবাগে জনসভা করিবার অনুমতি না পাইয়া বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদী এই বলিয়া খেদোক্তি করিয়াছিলেন যে, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে তাহার দায়িত্ব পালন করিতেছে না। ভারতের নির্বাচন কমিশন এই মেঠো অভিযোগ আপাত বিবেচনায় গায়ে না মাখিলেও পারিতেন। কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বলিয়া কথা। তাহার নিরপেক্ষতা বজায় রাখিবার দায় উপেক্ষা করিবার সামান্য সুযোগও নাই। নিরপেক্ষতা হারাইলে কিংবা উহা প্রশ্নবিদ্ধ হইলে তাহার আর কিছুই থাকে না। হয়তো সেই কারণেই ভারতের নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়াছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভিএস সম্পত সংবাদ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে বলেন, ভারতের নির্বাচন কমিশন তাহার কার্যক্রম পরিচালনা করিতে কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠানকে ভয় পায় না। মি. সম্পতের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়া নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে তাহা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধান নির্দেশিত কিছু প্রতিষ্ঠান থাকে যেইগুলি গঠিত হইবার পর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বের বাহিরে স্বাধীনভাবে নিজ কার্যক্রম পরিচালনা করিবার এখতিয়ার লাভ করে। নির্বাচন কমিশন তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। প্রাতিষ্ঠানিক এই স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা কার্যক্ষেত্রে প্রতিফলিত করিবার জন্য সাংবিধানিক ক্ষমতাই কিন্তু যথেষ্ট নহে, যাহাদের স্কন্ধে এই স্বাধীনতার ভার অর্পিত হয়, তাহাদের ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গ লইয়াই প্রতিষ্ঠান। যিনি এই ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে থাকেন এবং যাহারা এইরূপ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহারা নতজানু হইলে বা নিরপেক্ষতা হারাইলে সংবিধানে কি বলা আছে না আছে, তাহাতে কিছুই আসে যায় না। কাগুজে বাঘ কাগজেই শোভা পায়, উহা অবশ্যই নখদন্তহীন এবং নিষ্প্রাণ। ইহার মানে কাগজে লেখা আইন, বিধি-বিধানে তখনই প্রাণের সঞ্চার ঘটে যখন ব্যক্তিত্ব প্রযুক্ত হয়। আরও সহজভাবে বলিলে, পিছনের মানুষ, যখন আইন নির্দেশিত কর্তব্য পালনে অবিচল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখনই কেবল আইনের সার্থকতা বুঝিতে পারা যায়। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, উন্নয়নশীল এবং বিঘ্নসংকুল তথা অনিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক দেশসমূহে প্রায়শ দেখিতে পাওয়া যায় যে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানসমূহ নিজ কর্তব্য পালনে বিচলিত। দৃঢ়তার সঙ্গে নিরপেক্ষতা বজায় রাখিতে অপারগ অথবা অনিচ্ছুক। নির্বাচন কমিশনও সেইসব দেশে ব্যতিক্রম নহে। ফলে নির্বাচন লইয়া প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যাহারা কমিশনে থাকেন তাহারা যেন ধরিয়াই নেন যে, নিরপেক্ষতা অবলম্বন নয় বরং পক্ষপাতিত্ব করিবার জন্যই এবং পদে পদে অক্ষমতার পরিচয় রাখিয়া যাইবার জন্যই তাহাদের বসান হইয়াছে। উন্নয়নশীল দেশসমূহের মধ্যে এইক্ষেত্রে ভারত এক অসাধারণ ব্যতিক্রম। ইউরোপ আমেরিকাসহ উন্নত গণতান্ত্রিক দেশসমূহের ইলেকশন কমিশন কিংবা অন্যকোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করিবে না, এমনটি প্রায় অকল্পনীয়। তাহাদের দারিদ্র্যের সমস্যা নাই, শিক্ষার সংকট নাই। কিন্তু ভারত! বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটি অর্থনৈতিক শক্তি হইয়া উঠিতে শুরু করিলেও এখনও দারিদ্র্য লাঞ্ছিত। নিরক্ষর জনসংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তাহা সত্ত্বেও সেখানে গণতন্ত্র নির্বিঘ্ন। নির্বাচন লইয়া প্রশ্ন উঠে না। কারণ নির্বাচন কমিশন নতজানু নয়। তাহা যে নয় সেই কথাটিই বর্তমান সিইসি পুনর্বার ঘোষণা করিলেন উচ্চকণ্ঠে। এ যাবত্কালের কার্যকারণ দ্বারা প্রমাণিত যে, ভারতের নির্বাচন কমিশন নিজের প্রতি আস্থাশীল, কর্তব্যে অবিচল। পক্ষান্তরে সেখানে গণতন্ত্রের অব্যাহত চর্চার মাধ্যমে এমন একটি সমাজ-মানস তৈয়ার হইয়াছে যাহাতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখিতে সকলেই সচেষ্ট। সেই কারণেই নরেন্দ্র মোদী নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা লইয়া প্রশ্ন তোলায় বিরক্তি প্রকাশ করিয়াছেন রাজনৈতিক সমাজের অনেকেই। ভারতের নির্বাচন কমিশন জনমানসে যে বিশ্বাস ও মর্যাদার জায়গাটি তৈয়ার করিয়া লইয়াছে, তাহাও এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের একটি বড় শক্তি নিঃসন্দেহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন