ময়মনসিংহ শহরের বাঘমারা এলাকার এক গৃহকর্তা ও তাহার স্ত্রী তাহাদের গৃহপরিচারিকার ওপর যেইভাবে নির্যাতন চালাইয়াছেন তাহা নির্মমতা ও অসভ্যতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ইহাতে যে কেহ প্রশ্ন তুলিতে পারেন, আমরা কি আইয়্যামে জাহিলিয়াতের যুগে বসবাস করিতেছি? একজন গৃহপরিচারিকার কী এমন অপরাধ থাকিতে পারে যে জন্য তাহার পেটে ও পিঠে ইস্ত্রির ছ্যাঁকা দিতে হইবে? শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম তেলের ছিটা দিতে হইবে এবং খুন্তি দিয়া খুঁচাইয়া খুঁচাইয়া নির্যাতন চালাইতে হইবে? যদি গৃহপরিচারিকা কোন গুরুতর অপরাধ করে, তাহার জন্য ন্যায়সংগত পথে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এমনকি তাহাকে অব্যাহতি দেওয়া যায় অনায়াসেই।
গৃহকাজে যাহারা সহায়তা করেন, আধুনিক বিশ্বে তাহাদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। তাহারা কোন ক্রীতদাস নহে। কিন্তু আমাদের এখানে অনেকে বিনা বেতন বা সামান্য বেতন ও খোরপোষের বিনিময়ে তাহাদের কাজে নিয়োগ দেন। উন্নত দেশে গৃহকর্মী বা পরিচারিকাদের বেতনভুক্ত স্টাফের মর্যাদা দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এখনও এক শ্রেণীর সচ্ছল গৃহস্থ বা সম্ভ্রান্ত পরিবার আছে যাহারা বাড়িতে কাজের ছেলে বা মেয়ে রাখিলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের তুলনায় খুব একটা পার্থক্য করেন না। তাহারাও সেই বাড়িকে নিজের বাড়ি মনে করে এবং সহসা অন্যত্র যাইতে চাহে না। কিন্তু আজ এই ঐতিহ্য ম্লান হইয়া যাইতেছে। উঠতি ধনী ও মধ্যবিত্ত সংসারে এই সংকট অধিক দৃশ্যমান বিধায় ইহার সহিত দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা থাকিলেও থাকিতে পারে। আবার পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা অন্য অনেক কিছুর ন্যায় প্রতিনিয়ত বদলাইয়া যাইতেছে। এই ভাঙ্গাগড়ার মাঝে নানা সামাজিক সমস্যা দেখা দেওয়াটাও অস্বাভাবিক নহে। সমাজে গৃহপরিচারিকাদের আইনী সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনীয়তা আমরা কতটুকু উপলদ্ধি করি তাহাই এখানে বিবেচ্য বিষয়।
বাংলাদেশে কত সংখ্যক নারী গৃহপরিচারিকার কাজ করে, সেই সম্পর্কে সুনিশ্চিত করিয়া কিছু বলা যায় না। যেহেতু গৃহপরিচারিকাদের বেশিরভাগই অল্পবয়সী, তাই ২০০৬ সালের শ্রম জরিপ হইতে একটি ধারণা পাওয়া যাইতে পারে। সেই জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন। তন্মধ্যে ৪ লক্ষ ২১ হাজার গৃহপরিচারিকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই গৃহপরিচারিকাদের বয়স ১২ হইতে ১৭ বত্সর। তাহাদের অর্ধেকই প্রতিদিন ১২ হইতে ১৪ ঘণ্টা কাজ করিয়া থাকে। ইহার পর এই ব্যাপারে আর কোন জরিপ হইয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। তবে শুধু এই দেশেই নহে, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও আমাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক গৃহের কাজ করিতেছে। তাহাদের আশি ভাগই নারী। তাহারাও নানাভাবে নির্যাতন ও অত্যাচারের শিকার হইতেছে। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী তাহাদের অধিকার রক্ষা করা যাইতেছে না। সুতরাং সরকারকে দেশীয় গৃহপরিচারিকাদের ভালমন্দ যেমন দেখিতে হইবে, তেমনি প্রবাসী গৃহপরিচারিকাদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায়ও সোচ্চার হইতে হইবে। তাহাদেরকে অবমাননাকর পরিস্থিতি হইতে উদ্ধার করিতে হইবে। তাহাদের জন্য ন্যূনতম বেতন-ভাতা, কর্মঘণ্টা, ছুটি, ওভারটাইম ইত্যাদির ব্যবস্থা করাও জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
