সাম্প্রতিককালে চলতি রাজনৈতিক কৌশলের কিছু বিষয় নিয়ে তাত্পর্যপূর্ণ বিতর্ক আছে। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ ইত্যাদি ইস্যুগুলোকে কি কৌশলে হ্যান্ডেল করতে হবে— সেটি হলো বিতর্কের একটি প্রধান বিষয়। বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি নিছক বিমূর্ত কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক এটি নয়। দেশের বর্তমান সংকট ও নৈরাজ্য থেকে উত্তরণের কর্তব্যের সাথে তা সরাসরি সম্পর্কিত।
রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচ্য বিতর্কটির একটি দিক হলো, দেশে বর্তমানে বিদ্যমান নানা ইস্যুর মধ্যে কোন্ ইস্যুটি এখন আলাদাভাবে প্রধান, সে বিষয় নিয়ে। আমাদের সামনে বর্তমানে প্রধানত দু’ধরনের ইসু্যু রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার ইস্যু। অপরটি হলো আম-জনতার ভাত-কাপড়ের অধিকার, ঘুষ-দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধ, শোষণ-বৈষম্য নিরসন, সাম্রাজ্যবাদের শোষণ-আধিপত্য দূর করা ইত্যাদি বিষয়ক ইস্যু। বিতর্কের বিষয় হলো—এই দুই ধরনের ইস্যুর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কি? দু’ধরনের ইস্যুর মধ্যে অগ্রাধিকারযোগ্য কোনিট? এই দু’ধরনের ইস্যু কি একটির পর অপরটি, এরূপ পৃথক দুই স্তরে বা দুই পর্যায়ে নিরসনের কৌশল গ্রহণ করা উচিত? নাকি দু’ধরনের ইস্যু এতোটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, তাদের মধ্যে কোনো একটিকে পৃথকভাবে নিরসন করা সম্ভব নয় বিধায় সবটা এক সাথে অর্জনের কৌশল অবলম্বন করা উচিত?
বিতর্কের আরেকটি বিষয় হলো, একদিকে রাষ্ট্র ক্ষমতা এবং অন্যদিকে নীতি-আদর্শ—এই দু’য়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কি হওয়া উচিত তা নিয়ে। এই বিতর্কটির মূলকথা হলো—ক্ষমতার জন্য নীতি-আদর্শের ক্ষেত্রে কতোটা ছাড় দেয়া যেতে পারে? অর্থাত্ রাষ্ট্র ক্ষমতার জন্য কৌশলগত ম্যানুভারের ক্ষেত্রে কতোদূর পর্যন্ত আপস যুক্তিযুক্ত হতে পারে?
একথা প্রশ্নাতীত যে, দেশকে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের বিপদ থেকে মুক্ত করাটা খুবই জরুরি। এ জন্য সাম্প্রদায়িকতাকে, তা সে যে চেহারাতেই বিরাজ করুক না কেন, শক্তভাবে মোকাবিলা করা অপরিহার্য। এটি একটি শক্ত কাজ, একটি কঠিন সংগ্রাম। শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা দিয়ে, জোর জবরদস্তি ও দমননীতি চালিয়ে বা ছল-চাতুরি, ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল অবলম্বন করে এই সংগ্রামে জয়ী হওয়া যাবে না। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো গণশক্তি। সেই গণশক্তিকে এই সংগ্রামে সামিল করার জন্য গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার হলো সবচেয়ে বড় সহায়। গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে বা তাকে পাশ কাটিয়ে সাম্প্রদায়িক বিপদ মোকাবিলার চিন্তা করাটা শুধু আহাম্মকিই নয়, আত্মঘাতীও বটে।
একই সাথে একথাও বলা যায় যে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই না করে কখনোই গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়া যায় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামনে প্রতিটি মানুষের প্রধান পরিচয় হলো একজন ‘নাগরিক’ রূপে। প্রত্যেক নাগরিক রাষ্ট্রের সামনে সমান মর্যাদা সম্পন্ন। অর্থাত্, আমির হোক বা ফকির হোক, হিন্দু হোক বা মুসলমান হোক, নারী হোক বা পুরুষ হোক... রাষ্ট্রের সামনে সকলেই সমান মর্যাদা সম্পন্ন। সকলের ক্ষেত্রে সেই সাধারণ মর্যাদা হলো ‘নাগরিক’ পরিচয়ের মর্যাদা। এটি হলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য। তাই বলতে হয় যে, ‘সাম্প্রদায়িক-গণতন্ত্র’ কিম্বা ‘অগণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িকতা’ —উভয়ই হলো ‘কাঁঠালের আমসত্ত্বের’ মতো অসম্ভব কোনো বিষয়।
গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার বিকাশ হতে পারে পরস্পরের হাত ধরাধরি করে। এ দুটোর মধ্যে একটিকে বাদ দিয়ে, অথবা একটি অর্জনের কাজ পেন্ডিং রেখে, অপরটি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এ সত্যকে মেনে নিলে বলতে হয় যে, অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হলো একীভূত একটি সংগ্রাম। এ কথা অস্বীকার না করলেও সে কথা সবাই কিন্তু যথার্থভাবে মেনে চলে না। অসাম্প্রদায়িকতার যুক্তি দেখিয়ে আওয়ামী লীগ বিগত জাতীয় নির্বাচনে গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করতে দ্বিধা করেনি। আবার, বিএনপি সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে জোট সঙ্গী করে একই সাথে গণতন্ত্রের পূজারী সাজার চেষ্টা করছে।
তবে, মূল বিতর্কের শুরু আসলে এর পরে। প্রশ্ন হলো, অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজটির সাথে ভাত-কাপড়, রুটি-রুজি, শোষণ-বৈষম্য নিরসন, ঘুষ-দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নিবারণ, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-আধিপত্য দূর করা ইত্যাদির জন্য সংগ্রাম কিভাবে ও কতোটা সম্পর্কিত? এ দুটো কি সংগ্রামের পৃথক দু’টি অধ্যায় ও পর্যায়? অনেকে বলতে চেষ্টা করেন যে, উভয় ধরনের সংগ্রাম এগিয়ে নেয়াটা কর্তব্য হিসেবে গণ্য করলেও একটিকে অগ্রাধিকারমূলক বলে বিবেচনা করতে হবে। সেক্ষেত্রে, একটি লক্ষ্যকে প্রথম পর্যায়ে অর্জন করে নিয়ে, তারপর অন্যটি ‘সিরিয়াসলি টেইক আপ’ করার কৌশল নিতে হবে। এই যুক্তিকে অবলম্বন করে কেউ-কেউ রাজনৈতিক কৌশলের বিষয়ে এরূপ তত্ত্ব হাজির করে থাকেন যে—এদেশে আগে অর্থাত্ প্রথম পর্যায়ে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করে নিতে হবে। অন্যভাবে বললে, এদেশে প্রথমে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ ও অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে নির্ধারণমূলক স্থায়ী বিজয় নিশ্চিত করে নিতে হবে। একাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ভাত-কাপড়ের ইস্যুসহ অন্যান্য ইস্যু নিয়ে ‘সিরিয়াসলি’ নামা যাবে।
দু’টি সংগ্রামকে পৃৃথক দু’টি পর্যায়ের ও দু’টি অধ্যায়ের বলে বিবেচনা করে অগ্রসর হলে দেশের মেহনতি মানুষসহ আম-জনতা সেই কৌশলকে কি দৃষ্টিতে দেখবে—সেটি হলো এ প্রসঙ্গে একটি প্রধান প্রশ্ন। আরেকটি প্রশ্ন হলো, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজে কোন শ্রেণির আধিপত্য বজায় থাকবে এবং শ্রেণি শক্তির বিন্যাসের চেহারা ও চরিত্র কি হবে? যা হবে, তাতে করে কি অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে সাফল্য অর্জন করা যাবে?
তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয়ও যে, ভাত-কাপড় ইত্যাদি ইস্যুকে ‘সিরিয়াসলি টেইক আপ’ করার আগে প্রথমে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার ইস্যুটি ফয়সালা করে নিতে হবে তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, সে কাজটি করার জন্য গণশক্তির যে জাগরণ সৃষ্টি অপরিহার্য, তাতে তা নিশ্চিত করা যাবে কি? মুক্তিযুদ্ধে আম-জনতার জাগরণ ঘটেছিল ৬-দফার পাশাপাশি ১১-দফা ভিত্তিক গণঅভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে। ১১-দফাতে গণতন্ত্র, স্বাধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষতার দাবির পাশাপাশি জনগণের ভাত-কাপড়ের দাবি ও অন্যান্য র্যাডিক্যাল দাবি ছিল। মানুষের ভাত-কাপড়ের ইস্যুতে (সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারসহ) স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ব্যাতিরেকে শুধু গণতন্ত্র ও স্বাধিকারের দাবিতে কি মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের গণজাগরণ ঘটতো?
বিদ্রোহী কবি নজরুলের কবিতার একটি চয়ন এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন— ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় শুধু ভাত একটু নুন’। সমস্যা জর্জরিত আম-জনতার নুন-ভাতের ইস্যুকে ‘সিরিয়াসলি টেইক আপ’ না করে তাদেরকে কি অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জান-প্রাণ দিয়ে নামতে উদ্বুদ্ধ করা যাবে? একটি গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক কাঠামোর মধ্যে জনগণের ইহলৌকিক জীবনের সমস্যা সংকটসমূহ সমাধানের প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট করতে না পারলে কি জনগণ সেই সংগ্রামের জন্য যথেষ্ট মাত্রায় উদ্বুদ্ধ হবে? এসব কথা বিবেচনায় নিলে বলতেই হয় যে, অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক ইস্যুতে বিজয়ের জন্য ‘ভাত-কাপড়ের’ ইস্যুকে একই রকম সিরিয়াসনেস নিয়ে একই সাথে টেইক আপ করা অপরিহার্য। ‘ভাত-কাপড়’ ইত্যাদি বিষয়ক ইস্যুগুলোকে পেন্ডিং রাখলে আম-জনতার নুন-ভাতের দাবি যেমন উপেক্ষিত হবে তেমনই অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক ইস্যুর ফয়সালাও অসম্ভব হয়ে থাকবে। ফলে ‘আমও যাবে, ছালাও যাবে’-এর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
ভাত-কাপড়, ঘুষ-দুর্নীতি-অনাচার, শোষণ-বঞ্চনা ইত্যাদি ইস্যুতে সমান গুরুত্বের সাথে শক্তিশালীভাবে সংগ্রাম না করে তাকে দ্বিতীয় পর্যায়ের সংগ্রাম বলে ফেলে রাখলে সমাজে ও রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা ধনিকদের আধিপত্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ফলে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে, ক্ষমতা ও শোষণের লোভে দেশি-বিদেশি শাসক-শোষক গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষণকারী বুর্জোয়া দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আশ্রয় অথবা মদদ দিয়ে চলছে। সাম্রাজ্যবাদ সরাসরিভাবে জামায়াত-শিবিরকে সমর্থন ও সহায়তা দিচ্ছে। বিএনপি এই শক্তিকে জোট সঙ্গী করে রেখেছে। আওয়ামী লীগ জামায়াতকে বিএনপি থেকে সরিয়ে এনে তাদের জন্য একটা ‘জায়গা’ করে দেয়ার ‘কৌশলগত স্কিম’ নিয়ে আগাচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতাকে আদর্শগত ও সামাজিকভাবে মোকাবিলা করার বদলে আওয়ামী লীগ আপস করছে এবং সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলায় বিএনপির সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। উভয় বুর্জোয়া দলই সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর লুটেরা ধনিক শ্রেণি নিয়ন্ত্রিত দল। এই শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রামের তথা ভাত-কাপড়, শোষণ-বঞ্চনা, দুর্নীতি-দুরাচার ইত্যাদি ইস্যুতে সংগ্রামকে পেন্ডিং রেখে দিলে যেহেতু শাসক শ্রেণির উচ্ছেদ সম্ভব হবে না, তাই সেকারণে গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রামে বিজয় অর্জনও নিশ্চিত করা যাবে না। বরঞ্চ সাম্প্রদায়িক ও অগণতান্ত্রিক প্রবণতা ও শক্তি দিন-দিন আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকবে। পরিস্থিতি ক্রমাগত আরো বিপজ্জনক হতে থাকবে। তথাপি কেন ‘দুই পর্যায়ের দুই অধ্যায়ের পৃথক দুই সংগ্রামের’ তাত্ত্বিকরা সেই মারাত্মক ভ্রান্তিই ফেরি করে বেড়াছেন?
কৌশল নিয়ে তত্ত্বগত বিতর্কের দ্বিতীয় দিকটি প্রথমটির সাথে কিছুটা সম্পর্কিত হলেও তার প্রত্যক্ষ বিষয় হলো রাষ্ট্র ক্ষমতা ও নীতি-আদর্শের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ককে কেন্দ্র করে। কেউ-কেউ তত্ত্ব দিচ্ছেন যে, রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যতীত নিছক নীতি-আদর্শ হলো নিষ্ফল ও বন্ধা। নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য ক্ষমতায় যাওয়া প্রয়োজন। ক্ষমতায় যেয়ে নীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, ক্ষমতায় না গিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তাই রাজনৈতিক কৌশলকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে করে ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত করাটিকে অগ্রাধিকারমূলক কর্তব্য বলে গণ্য করা হয়। সেক্ষেত্রে কার্যসিদ্ধিমূলক (pragmatic) কৌশলের পথ নিতে হবে। সেই কৌশল (!) যদি নীতি-আদর্শের পরিপন্থি হয় তাতেও নাকি কোনো অসুবিধা নেই। কারণ ক্ষমতায় একবার যেতে পারলে তারপর নাকি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে আবার নীতি-আদর্শের ধারায় ফিরে আসা যাবে। এসব যুক্তির যথার্থতা কতটুকু?
বাস্তব সত্য হলো, ক্ষমতায় গেলেই ‘যা ইচ্ছা তাই’ করা যায় না। তার প্রথম কারণ হলো, যে শক্তির ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় আরোহণ নিশ্চিত করা হয় সেই শক্তিকে অখুশি করলে সে তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নিবে। পায়ের তলা থেকে মাটি ধসে পড়বে। ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব হয়ে উঠবে। দ্বিতীয় কারণ হলো, রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি চরিত্র থাকে। আমাদের রাষ্ট্র এখন সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে। শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রকে ব্যবহার করছে আম-জনতাকে শোষণ করার কাজে। জনগণের সম্মিলিত আঘাত ব্যতিরেকে রাষ্ট্রের সেই গণবিরোধী চরিত্রের গণমুখী রূপান্তর ঘটানো যাবে না। একারণে দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য ‘পর্যায়ক্রমের’ কৌশল কোনো ফল এনে দিবে না।
একথা হয়তো ঠিকই যে, পর্যায়টি এখনই ‘সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার নয়। সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হতে হলে আগে একটি সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক বিপ্লবী রূপান্তর সাধন করতে হবে। এক্ষেত্রে যে বিষয়টির প্রেক্ষাপটে পর্যায়ের কথাটি প্রাসঙ্গিক সেটি রণনীতির (stratigy)-র বিষয়, রণকৌশলের (tactics)-এর বিষয় নয়। কিন্তু দেশের বিরাজমান সমস্যা-সংকটের বেড়াজাল ছিন্ন করার ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ের প্রশ্ন উঠতে পারে না। সমস্যার জাল একটার সাথে আরেকটা জড়িয়ে রয়েছে। অবস্থা দাঁড়িয়েছে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’-এর মতো। তাই, খণ্ডিতভাবে অথবা পর্যায়ক্রমিকভাবে চলতি সমস্যাগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সমাধান রয়েছে কেবল মাত্র চলতি পরিস্থিতির একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক বিপ্লবী রূপান্তরের মধ্যে।
একথার অর্থ কিন্তু এটি নয় যে, সমস্যার প্রতিটি উপাদানকে ভিত্তি করে পৃথকভাবে সংগ্রাম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নেই। সমাজ বদল হলে তো সব সমস্যা আপনা-আপনি দূর হয়ে যাবে, তাই সে সব নিয়ে আলাদা-আলাদা ভাবে সংগ্রামের প্রয়োজন নেই—এক শ্রেণির কিছু বামপন্থীদের মাঝে এ ধরনের ভ্রান্তি আছে। এ ধরনের চিন্তা সঠিক নয়। মনে রাখা প্রয়োজন যে, শুধু সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য এ্যাজিটেশন ও সংগ্রাম করলেই চলবে না। একই সাথে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, রুটি-রুজির অধিকার, শোষণ-বঞ্চনা লাঘব করা, ঘুষ-দুর্নীতি-অনাচার-দুর্বৃত্তায়ন দূর করা ইত্যাদি ইস্যুতে পৃথক-পৃথক সংগ্রামও গড়ে তুলতে হবে। সে সব প্রতিটি ইস্যুতে সংগ্রামে সম্ভাব্য ব্যাপকতম শক্তি সমাবেশ ঘটানোর কৌশল নিতে হবে। অন্যদিকে, মৌলিক ও সর্বাত্মক পরিবর্তনের জন্য একনিষ্ঠ বামপন্থী-গণতান্ত্রিক শক্তির স্বাধীন রাজনৈতিক উদ্যোগকেও শক্তিশালী করতে হবে।
তত্ত্বের কচকচানি বা ডিবেটিং ক্লাবের আয়েসি বিতর্কের জন্য নয়, রাজনীতিতে সঠিক চলার পথ খুঁজে নেয়ার জন্য রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে তত্ত্বায়ন ও অর্থবহ তর্ক-বিতর্ক আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : [email protected]
