শীঘ্রই দেশের শিক্ষাবোর্ডগুলো এসএসসি’র ফলাফল ঘোষণা করবে। এরপরই ভাল কলেজে ভর্তির জন্য ছাত্রদের শুরু হবে দৌড়ঝাঁপ। বাংলাদেশের এক নম্বর কলেজ নটর ডেম-এ ভর্তির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে সারা দেশ। কিন্তু সেই কলেজ এবারও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অস্বচ্ছ অন্লাইনে ছাত্র ভর্তির কবলে পড়বে। গত ৪ বছর ধরে কলেজটি এই অস্বচ্ছ অনলাইনে ছাত্র ভর্তি নিয়মের কবলে পড়ছে। ছাত্র-অভিভাবক ও কলেজ কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে নটর ডেম কলেজের নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্র ভর্তির অধিকারটুকু রক্ষার আর্জি জানিয়ে রীট করে আসছে। হাইকোর্টও স্থায়ী নির্দেশ না দিয়ে প্রতি বছর সাময়িকী নির্দেশে কলেজে ছাত্র ভর্তির অধিকার রক্ষা করে আসছেন। এর ফলে নটর ডেম কলেজ ছাত্র ভর্তির বিষয়টি নিয়ে হয়রানি হচ্ছে। এতে শিক্ষাদানে বিঘ্নিত হচ্ছে বলে পরীক্ষার ফলাফল খারাপ করছে অতীতের তুলনায়।
নটর ডেম কলেজের অ্যালামনাই এসোসিয়েশন ও নটর ডেম শিক্ষা ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সঙ্গে রয়েছেন ১১৫ জন ব্যারিস্টার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০ অধ্যাপক। তাঁরা সবাই প্রাক্তন নটরডেমিয়ান। তাঁদের প্রিয় কলেজটির শিক্ষা-ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আইনী লড়াই থেকে শুরু করে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছে তারা। তাঁদের দাবি, ৬৫ বছর ধরে নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্র ভর্তি করে শিক্ষাদানে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখে চলেছে, যার দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ তারা। তাঁদের প্রশ্ন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুল-কলেজের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। ঠিকমতো পাঠদান ও পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে কি’না, এসব তদারকি করবে। অথচ শিক্ষাদানের মানোন্নয়নের জন্য কাজ না করে অস্বচ্ছ অন্লাইন ছাত্র ভর্তির দায়িত্ব নেয়াটার মূল কারণ কি ভর্তি বাণিজ্য?
এবারের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। প্রশ্ন ক্রয় করে যারা ভাল ফলাফল করবে, অন্লাইন ভর্তির সুযোগে তারা ভাল কলেজে ভর্তি হতে পারবে। আর প্রকৃত মেধাবী ছাত্র ভাল কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। নটর ডেম কলেজের ছাত্র ভর্তির পদ্ধতিটা মেধাবী ছাত্র বাছাইয়ের উত্তম পন্থা। এর বিকল্প নেই। কিন্তু সেই উত্তম পদ্ধতির বাধ সেধেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন? অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধনাঢ্য ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সন্তান নটর ডেম কলেজে পড়তে আগ্রহী। কিন্তু নটর ডেম কলেজের স্বচ্ছ ছাত্র ভর্তি পদ্ধতির জন্য তারা ভর্তি হতে পারে না। পিছিয়ে-পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানেরা মেধার ভিত্তিতে ভর্তি হতে পারছে। একবার অন্লাইনে ভর্তির নিয়ম চালু করতে পারলে নটর ডেম কলেজে ভর্তি বাণিজ্যের রমরমা তদবির শুরু হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ধনাঢ্য ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বখাটে সন্তান ভর্তি হয়ে কলেজের শান্ত অরাজনৈতিক মনোরম সুন্দর পরিবেশ নষ্ট করে দেবে। ছাত্র রাজনীতি শুরু হয়ে যাবে। এই ছাত্র রাজনীতির কারণেই ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে আজ লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। কলেজটির ফলাফলের সুনামটিও নষ্ট হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, নটর ডেম কলেজটি ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই কি অন্লাইনে ছাত্রভর্তি পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা চলছে?
সরকারের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকে নটর ডেম কলেজ একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ৯টি প্রস্তাবসহ বিশেষ প্রক্রিয়া অনুমোদনের আবেদন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। উল্লেখ্য, নটর ডেম কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল (১৯৪৯) আর্ত-মানবতার সেবার নিমিত্তে, সাধারণ গরীব অথচ মেধাবী ছাত্রদেরকে উন্নতমানের শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে এবং সর্বোপরি সত্ মনোভাবাপন্ন ও মেধাবী কিছু ছাত্রকে এমনভাবে গঠন দান করতে, যাতে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা তাদের উপর ন্যস্ত গুরুদায়িত্ব সততা ও কৃতিত্বের সাথে পালন করতে পারে। নটর ডেম কলেজ শ্রেষ্ঠই, তবে তা হয়েছে এখানকার উন্নত প্রশাসনিক অবকাঠামো, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দের নিরলস ও আন্তরিকতাপূর্ণ কর্মময় প্রচেষ্টার জন্য।
নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ, প্রাবন্ধিক ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও আসন্ন ছাত্র ভর্তি প্রসঙ্গে বলেন, দেশের পিছিয়ে-পড়া জনগোষ্ঠীর মেধাবী সন্তানদের সুযোগ দেয়ার জন্য আমাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নটর ডেম শিক্ষা-ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সভাপতি ড. শাকির সবুর বলেন, নটর ডেম কলেজ সরকারের একটি টাকাও অনুদান হিসেবে নেয় না। নিজস্ব আয়-ব্যয়ের মাধ্যমে দেশে শিক্ষাসেবা দিয়ে লক্ষ লক্ষ সোনার ছেলে গড়ে দিচ্ছে। এই কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কলেজের অন্লাইনে ফরম ফিল-আপ শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র ভর্তির সুযোগ দিলে সরকার ও জাতির জন্য কোন ক্ষতির কারণ দেখছি না। এছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যামেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্লাইনে ভর্তি পদ্ধতিটাই বাজে পদ্ধতি। তারা আরও মনে করেন, যে মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, সেই মন্ত্রণালয়ের অন্লাইনে ছাত্র ভর্তির বিষয়টি স্বচ্ছ হতেই পারে না।
লেখক : কবি, প্রকাশক ও মহাসচিব, নটর ডেম শিক্ষা-ঐতিহ্য রক্ষা কমিটি
