অবশেষে ঐশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আদালত। অর্থ্যাত্ ঐশীর বিচার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু যে সমাজ, রাষ্ট্র একজন ঐশী তৈরি করে, লালন করে সেই সমাজ আর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কে অভিযোগ গঠন করবে? কোন্ আদালতে তার বিচার হবে ? প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে যাবে। কারণ উত্তর করবার মত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি এদেশে। এদেশে গড়ে উঠেছে আধুনিক হবার স্বপ্নবিলাস, বিশাল বিশাল অট্টালিকা, প্রযুক্তির অবাধ বিচরণক্ষেত্র, শত শত কারুকাজময় নিম্ন, মধ্যম ও উত্তম শ্রেণির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মেধা উপস্থাপনের বর্ণিল প্লাটফর্ম ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যা গড়ে ওঠতে গড়ে ওঠেনি সত্, স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, তা হল মূল্যবোধ। সমাজ, সরকার বা রাষ্ট্র হল, দেশের সর্ববৃহত্ প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হল, জাতিকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে ও সর্বোপরি নিরাপদ রাখতে নৈতিক সমর্থন, সহযোগিতা দেয়া এবং তা নিশ্চিত করা। দুঃখজনক হলেও বলতে হয়, আমাদের দেশে সমাজ, সরকার বা রাষ্ট জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মোড়কে নেই। কখনই থাকে না। ওসব ব্যক্তি, গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানের মোড়কে আবৃত থাকে। আবৃত রাখা হয় ব্যক্তি, গোষ্ঠী স্বার্থেই। আবার সমাজবিজ্ঞানের কোন পুস্তক পড়লে সমাজকেন্দ্রিক ঠাসা কিছু মুদ্রিত তথ্য, তত্ত্ব বা উপাত্ত পাই।
সরকারকে দেখলে দেখি দলীয় স্বার্থ উদ্ধার, রক্ষার সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা। আর রাষ্ট্র? সরকার দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত এক কাগজের বাক্স। হাঁ, খুব আবেগপ্রবণ হয়েই লিখছি। কারণ জাতীয় প্রচার মাধ্যমে বেশ ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ পেল, পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান এবং তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যাকাণ্ডের মামলায় তাদের মেয়ে ঐশী রহমানসহ তিন জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ৫ জুন মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে। ভালো কথা। অপরাধের শাস্তি কার্যকর হওয়া জরুরি, অপরাধ রোধেই। কিন্তু ঐশীর নেপথ্যচারীদের বিচার তো আগে হওয়া জরুরি। জানি, বিস্ময়ের সুযোগ এখানে লাগামহীন। কেননা সমাজ, সরকার বা রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচার কাজ সম্পন্ন করা রীতিমত দুঃস্বপ্নের শামিল। এ রকম ঘটনার চর্চা বা প্রত্যক্ষ করবার কোন অতীত অভিজ্ঞতা, ভাবনা নেই বলেই হয়ত। আর এটাই আমাদের চরম ব্যর্থতা। আমাদের সব সম্পূর্ণতার এক বিশাল অস্পূর্ণতা।
নৃশংস ঘটনার পর স্যাটেলাইট চ্যানেল ও মুদ্রিত প্রচার মাধ্যমের সহায়তায় যখন ঐশীকে দেখলাম, বুকটা কেঁপে উঠেছিল। কারণ আমি তখন একজন ঐশীকেই শুধু দেখিনি। দেখেছি আমাদের সামাজিক, সরকারি ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার করুণ চিত্র। জীনসের প্যান্ট, ফতুয়া আর গায়ে চাঁদর জড়িয়ে পুলিশ বেষ্টিত হয়ে যে মেয়েটি ভাবলেশহীনভাবে হেঁটে যাচ্ছিল তার সাথে হেঁটে যাচ্ছিল গোটা সমাজ ব্যবস্থা, গোটা রাষ্ট্র। কি করে এরকম ঐশীরা নিজেদেরকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে তার জবাবটা বোধহয় তারাই দিতে সক্ষম, যারা তাদেরকে অন্ধকারে ঠেলে দেবার নেপথ্যে রয়েছে। অনেক তথ্যের মধ্যে যে তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ তা হল, পুলিশ বাবার অঢেল সম্পদ। যা অবৈধ আয়ের সহজ স্তূপ। ফলে ঐশীর মাসিক হাত খরচ ছিল লক্ষ টাকা। যা বিপথগামী হবার জন্য যথেষ্ট সহায়ক। ঐশী মাদকাসক্ত ছিল। এ ধরনের অভ্যাসে শিশু থেকে বয়স্করা অভ্যস্থ হয়ে পড়ছে।
অভাব, মানসিক বিপর্যস্থতা, আধুনিকতা, সামাজিক অবক্ষয়, অবাধ মাদক সরবরাহ, ব্যবসায়িক হীন মানসিকতা, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারীদের অপরাধ প্রবণতা, ঠুনকো সমাজনীতি ও শিক্ষানীতি ইত্যাদি কারণ রয়ে যায় মাদকাসত্তির পেছনে। বলাবাহুল্য সমাজকে, দেশকে নিরাপদ রাখতে সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। অভাব নেই পলিসির এবং পলিসি বাস্তবায়নের ব্যয়বহুল প্রদর্শনযোগ্য তত্পরতার। আছে আইনী সামাজিক সংগঠনসমূহ। আরও আছে অপরাধীকে প্রতিহত করবার অস্ত্র, গোলা-বারুদ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। নেই শুধু অপরাধকে প্রতিহত ও নির্মূল করবার সত্ ও স্বচ্ছ মানসিকতা আর আদর্শ। আর যা আছে তার সবকিছুই ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ভিত্তিক। ফলে সীমান্ত ডিঙিয়ে মাদক, অবৈধ অস্ত্রে সয়লাব দেশ। জানা যায়, ঐশী প্রায় রাত করে ঘরে ফিরত। সে রাত্রিকালীন পার্টিতে অংশগ্রহণ করত। ঐশীর এ ধরনের আচরণের পেছনে পারিবারিক অমনোযোগিতা, প্রশ্রয় যথেষ্ট সক্রিয় ছিল ধারণা করা যায়। কারণ এ ধরনের আচরণ পরিবেশগত দুর্বলতায় বিকশিত হয়। পাশাপাশি জীবন ধ্বংসকারী ক্লাব, হোটেলগুলো তরুণদেরকে হাতছানি দেয় এবং দিচ্ছে। কিছু অসত্ ব্যবসায়ী আর তাদের লালনকারী কিছু অসত্ প্রশাসনিক ব্যক্তির স্বার্থে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়। এই অপসংস্কৃতির স্থাপনাসমূহ তরুণদেরকে বিপথগামী করে দিচ্ছে। আমাদের সামাজিক, সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে নাইট ক্লাবগুলো আদৌ জরুরি কিনা বিনোদন বা আনন্দ ফূর্তির জন্য সেটাও ভাবতে হবে। যদি জরুরি হয় তবে শৃংখলা রক্ষায় তার উপর কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে কর্তৃপক্ষের তা ঠিক করতে হবে। তরুণ সমাজের ঐসব এলাকায় প্রবেশাধিকার তাকে ধ্বংস হবার জন্য যথেষ্ট কার্যকর হওয়ায় তরুণদের জন্য এসব এলাকা নিষিদ্ধ হতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যবসায় সম্পৃক্তদের উপর কড়া নজরদারি বাঞ্ছনীয়। নজরদারদের নৈতিকতাবোধ তার আগে পরীক্ষিত হতে হবে। সেইসাথে নজরদারদের নজরদার থাকতে হবে।
ঐশী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ত। আর এতে সংবাদ পরিবেশনে বেশ মজাদার সূত্র পেয়ে যায় কোন কোন সংবাদকর্মী ও সংগঠন। আমাদের সমাজে রয়েছে সীমা নির্ধারণীয় তিনটি বিত্ত। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। তিনটি বিত্তের মধ্যে রয়েছে আচরণগত ও ধারণাগত ব্যপক দূরত্ব। বিত্ত বৈষম্যের কারণে শ্রেণীগত পারস্পরিক অশ্রদ্ধাবোধও রয়েছে। সাধারণত ব্যয়বাহুল্যের কারণে উচ্চবিত্তের ছেলেমেয়েরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করে থাকে। তারা তাদের সামাজিক অবস্থানকে এক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখে। এটা যেমন সত্য, তেমন সত্য মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও আর্থিক সংকটের মাঝেও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা অর্জনের জন্য।
ভবিষ্যতের এক সমৃদ্ধ অবস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে। এমন সত্যকে পাশ কাটিয়ে উচ্চবিত্তদের কট্টাক্ষ করবার জন্যই অনেক সময় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলকে সমালোচনায় দাঁড় করানো হয়। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের কারণে নয়, বরং পারিবারিক লাগামহীন প্রাচুর্য, উচ্ছৃৃংখলতাই ছেলেমেয়েরা ধারণ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসে। অবশ্য কোন কোন স্কুল শিক্ষার্থীদের শৃংখলার বিষয়ে উদাসীন এটাও সত্য। পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গির বেপরোয়া উপস্থিতিও দেখা যায়। এ সকল স্কুলে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেয়া জরুরি।
হত্যাকাণ্ডের নির্মম ঘটনার পরপরই আমরা দেখেছি, কোন কোন প্রচার মাধ্যম বিভিন্ন ধরনের রসালো তথ্যে ঐশীকে উপস্থাপন করেছে। পত্রিকার কাটতির জন্য হলুদ সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করা হয়েছে। এতে এমন নির্মম ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবার এবং প্রতিহতের জোরালো আহ্বান প্রকাশ পায়নি। পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তরুণকে সমাজকে ব্যবহার করে তাদের পণ্যেও প্রসার ঘটাচ্ছে। জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে অস্বাভাবিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে টেলিফোন কোম্পানীগুলো। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত টকটাইম রেট কমিয়ে সাশ্রয়ীর আড়ালে জীবনকে মূল্যহীন করে দিচ্ছে তরুণ সমাজের। বিশৃংখল হবার বিরাট সুযোগ এখানে।
সমস্যা দূর করার চাইতে সমস্যা সৃষ্টি না হবার বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত। যে কোন ধরনের অবক্ষয়ের উত্স, প্রেক্ষিত এবং দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন থাকে। এটি একটি প্রক্রিয়া, যাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা, অবহেলা, স্বার্থপরতা অধিকতর মাত্রায় থাকে। অপরাধীর বিচারের চাইতে অপরাধকে সষ্টি হতে না দেয়ার চেষ্টা, উদ্যোগ অপরিহার্য। যে,যারা, যেসব প্রতিষ্ঠান অপরাধ জন্ম দেয়, লালন করে তাদের আগে বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে আমি মনে করি।
লেখক:উন্নয়ন কর্মী
