রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও নারী উন্নয়নকর্মিগণ। তারা মনে করেন রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ বিফল হচ্ছে। তাদের মতে, অপরাজিতা, জয়িতা, বীরাঙ্গনা এমন শব্দগুলো থেকে বেরিয়ে এসে, মানুষ হিসেবে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরি। তারা বলেন, অনেকে মত প্রকাশ করেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রধানত রাজনৈতিক কারণে পিছিয়ে আছে। কিন্তু এর অন্যতম কারণ সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। অবস্থা পরিবর্তনে বা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা করতে পর্যায়ভিত্তিক সকলকে দায়িত্ব নেয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন বিজ্ঞজনরা।
গতকাল সিরডাপ মিলনায়তনে সুইচ এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট এন্ড কো-অপারেশন (এসডিসি)-এর অর্থায়নে পরিচালিত অপরাজিতা প্রকল্পের আওতায় এক জাতীয় সেমিনারে তারা এ মত প্রকাশ করেন। সেমিনারটি যৌথভাবে বেসরকারি সংস্থা খান ফাউন্ডেশন, ডেমোক্রেসি ওয়াচ, প্রিপ ট্রাস্ট ও স্টেপ্স টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট আয়োজন করে।
‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ২০১৪:নারীর প্রতিনিধিত্ব’ শীর্ষক এই সেমিনারের ধারণাপত্র মতে, ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী প্রতিনিধিদের সংখ্যা ছিল ২৯০০ জন। ২০১৪ সালের ৪৫৮টি উপজেলা নির্বাচনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫০৭ জনে। অর্থাত্ মাত্র পাঁচ বছরে উপজেলা নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে ৪৮ শতাংশ।
এতে বলা হয়, ১৯৯৭ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৩ হাজার ৫০০ পদে এক লাখ ৮০ হাজার নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৩ সালের নির্বাচনে তা কমে দাঁড়ায় এক লাখ ২৪ হাজার জনে। সর্বশেষ ২০১১ সালের নির্বাচনে তা আরো কমে দাঁড়ায় মাত্র ৯০ হাজার জনে। মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
ধারণাপত্র মতে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী প্রতিনিধিদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ গৃহস্থালী, ২০ শতাংশ ব্যবসা ও ১৪ শতাংশ চাকরিজীবী। সামাজিক অবস্থানে দেখা যায়, ৬৬ শতাংশ নারী সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। ২৬ শতাংশ নারী প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য। বাকি ৮ শতাংশ শিক্ষকতায় নিয়োজিত আছেন।
তাছাড়া মূলধারার রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫৪ শতাংশ নারী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ৩৩ শতাংশ নারী বিএনপি ও ১১ শতাংশ নারী অন্যান্য দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। ৬৪ শতাংশ জয়ী নারী প্রতিনিধি মনে করেন, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে তারা নির্বাচিত হয়েছেন। ২৩ শতাংশ রাজনীতিক দলের সংশ্লিষ্টতা ও ১৩ শতাংশ পারিবারিক প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।
নারীর অংশগ্রহণ কমা ও অবস্থার পরিবর্তনে প্রধান অতিথি অর্থনীতিবিদ কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ বলেন, সরকারের দায়িত্ব বললেই তা নিশ্চিত হবে না। প্রধানমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, নির্বাচন কমিশনার, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সকলকে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর এক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে কাজ করতে হবে। শিশু, নারী, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এ সকল বিষয়ে দলের ঊর্ধ্বে দেখার আহবান করেন তিনি।
খান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট রোখসানা খন্দকারের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, সাবেক সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন আমিনুজ্জামান, ডেমোক্রেসি ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক তালেয়া রহমান ও বেশ কিছু উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস-চেয়ারম্যান।
