দূষিত বায়ুর শহর প্রসঙ্গে

আপডেট : ১২ মে ২০১৪, ২২:০৯
বসবাসের জন্য বিশ্বের সবচাইতে অযোগ্য শহরের খেতাব পাইয়াছিল ঢাকা। এইবার বিশ্বের সবচাইতে দূষিত বায়ুর দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থান লাভ করিয়াছে। বাংলাদেশ সবচাইতে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের খেতবাও এক সময় পাইয়াছিল। নেতিবাচক এইসব খেতাবপ্রাপ্তি জাতি হিসাবে আমাদের জন্য বড়ই লজ্জার ও পরিতাপের বিষয়। বিশ্বের ৯১টি দেশের এক হাজার ৬০০টি শহরের মধ্যে সবচাইতে বেশি দূষিত ২৫টি শহরের তালিকায় রহিয়াছে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ (সপ্তদশ), গাজীপুর (একবিংশ) ও ঢাকা (ত্রয়োবিংশ)। বায়ুদূষণের উপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পরিচালিত সর্বশেষ জরিপে এই তথ্য প্রকাশ হইয়াছে। বাংলাদেশ পরিবেশ মন্ত্রণালয় বত্সরব্যাপী বায়ুদূষণ পরিমাপের ভিত্তিতেই ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের শহরগুলির দূষণের মাত্রা প্রস্তুত করিয়াছে। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বিশ্বের ২০টি শহরে বাতাসে ক্ষতিকর উপাদানের পরিমাণ বিপজ্জনক অবস্থায় রহিয়াছে। এই শহরগুলির মধ্যে অর্ধেকের বেশি রহিয়াছে ভারতে। উল্লেখ্য যে, সবচাইতে দূষিত শহরের খেতাব পাইয়াছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। অন্যদিকে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও সুইডেনের শহরগুলিতে দূষণের মাত্রা কম পাওয়া গিয়াছে। বায়ুতে অ্যামোনিয়া, কার্বন, নাইট্রেট ও সালফেটের ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোনের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি মানুষের শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। ইহার ক্ষতিকর প্রভাবে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ বা শ্বাসকষ্টজনিত রোগ হইতে পারে। বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ দূষণ, বিশেষত বায়ু দূষণ কমাইয়া আনিবার জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়াছিল এবং এখনও সচেষ্ট রহিয়াছে। বিশেষত টু-স্ট্রোক ইঞ্জিন উঠাইয়া দেওয়া, জ্বালানি হিসাবে পরিবেশবান্ধব সিএনজি চালু করা, নাগরিক বনায়ন করা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য কিছু পদক্ষেপ। কিন্তু ঢাকা হইতে সবুজ হারাইয়া যাইতেছে দ্রুতহারে। ঢাকা পরিণত হইয়াছে ইট-পাথর-কংক্রিটের এক শহরে। ফলে বায়ু কেবল দূষিত হইতেছে, হরিত্ বৃক্ষের বরাতে পরিশুদ্ধ হইবার সুযোগ পাইতেছে না। ঢাকার নিকটবর্তী শহর নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের এই তালিকায় সংযোজন এবং ঢাকার চাহিতে আগাইয়া থাকিবার বিষয়টি কিছু বিষয় ইঙ্গিত করিতেছে। পরিকল্পনাবিহীন নগরায়নে এই শহর দুইটি যেন ঢাকারই অনুসারী, ইহাদের নগরব্যবস্থাপনা সম্ভবত ঢাকার চাইতে নিকৃষ্ট। ঢাকা এবং গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জ শহরের পরিস্থিতি দিনদিন অবনতি হইবার অন্যতম কারণ গ্রাম হইতে শহরে বিপুল সংখ্যক মানুষের অভিবাসন। প্রতিবছর ৫ লাখ মানুষ ঢাকা শহরে অভিবাসী হইতেছে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ শহরে অভিবাসনের হার অনেক উচ্চ। কারণ, অন্য শহরগুলিকে পরিকল্পনা করিয়া গড়িয়া তোলা হয় নাই, গ্রামপর্যায়ে যথেষ্ট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয় নাই। ভারতের রাজধানী দিল্লি, কিন্তু তাহার রহিয়াছে বোম্বে, কলকাতা বা চেন্নাইয়ের মতো আরও বড় শহর। পাকিস্তানে ইসলামাবাদ রাজধানী, কিন্তু তাহার রহিয়াছে করাচি বা লাহোরের মতো বড় শহর। কিন্তু বাংলাদেশে রহিয়াছে কেবল ঢাকা ও চট্টগ্রাম। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে থাকা মানে ঢাকা বা তাহার আশেপাশেই থাকা। বিশ্বে বিভিন্ন বড় শহরে রেল হইলো জনপ্রিয় গণপরিবহন, তাহা ভূমির উপরে হউক, বা নিম্নে। কিন্তু ঢাকা, গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জে সড়কপথই যাতায়তের একমাত্র উপায়। উন্নয়ন বলিতে কিছু উড়ালসড়কের কথা উল্লেখ করা যায়। কিন্তু উহাও সড়কপথ। ফলে যানবাহনের সংখ্যা না কমিয়া বাড়িয়া চলিতেছে। এইসব মোটরগাড়ি নিঃসৃত ধোঁয়া ক্রমশ বায়ুকে দূষিত করিয়া চলিতেছে। রেলব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাইয়া গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ হইতে ঢাকায় যাতায়াত পুরাপুরি রেলনির্ভর করিয়া ফেলা সম্ভব। অথচ কমিউটার ট্রেনগুলি রহিয়াছে নামমাত্র। ইহার সেবা যেমন মানসম্পন্ন নহে, তেমনি যাত্রীদের কাছে উহা জনপ্রিয় হইয়া উঠে নাই। ফলে সড়কপথের অসহনীয় যানজটে নগরবাসীকে নিয়মিত যেমন নাকাল হইতে হয়, তেমনি বায়ুদূষণের তীব্রতায় স্বাস্থ্যঝুঁকি লইয়া বসবাস করিতে হয়। শহরে সবুজের পরিমাণ বাড়াইয়া ও সড়কপথের পরিবর্তে রেলপথের নিরিখে নগরপরিকল্পনা সাজাইয়া, সময় আসিয়াছে সমস্যার গভীরে যাইয়া যথাযথ পদক্ষেপ লইবার মাধ্যমে এইসব খেতাবের লজ্জা হইতে মুক্তি পাইবার।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন