[ সা ম্প্র তি ক ]

আর কত খুন, গুম, অপহরণ?

আপডেট : ১২ মে ২০১৪, ২২:১৩
দেশবাসী এখন গভীর শঙ্কা এবং উত্কণ্ঠায়। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমিও এর বাইরে নই। কারণ আমি নিজেও এই শঙ্কা নিয়েই প্রতিদিন ঘর থেকে বের হই যে, আদৌ ঘরে ফিরে আসতে পারব কিনা। হয়তো আজ আমি, কাল আপনি যেকোনো সময় গুম, অপহরণ কিংবা খুনের শিকার হয়ে যেতে পারি। না হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা আমরা কেউই দিতে পারব না। সঙ্গত কারণেই এমন শঙ্কা উত্কণ্ঠার বিষয়টি চলে এসেছে, এজন্য যে, দেশে খুন, গুম, অপহরণ আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের সাত জনকে অপহরণ ও খুনের ঘটনায় র্যাব-১১ জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে এমন মর্মান্তিক ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে বলেও অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়। (দৈনিক ইত্তেফাক, ৫ মে ২০১৪)। এমন ঘটনা সত্যিই হয়ে থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গাটি আর থাকছে না। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাধারণ মানুষ যখন চরম উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তখনও সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এক্ষেত্রে আশ্চর্য হওয়ারও কিছু নেই এজন্য যে, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলে যেকোনো সরকারের মন্ত্রীরা সাধারণত বলে থাকেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। এবারও এর ব্যতিক্রম আমরা ঘটতে দেখিনি। সরকারের মন্ত্রীরা যেমন কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, ঠিক তেমনি দেশের সরকার-বিরোধী শক্তি তারাও এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিষয়টিকে কীভাবে আরো বেশি ঘোলাটে করা যায় সেদিকটা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এর অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশের এ যাবত্কালে প্রতিষ্ঠিত নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর এই সংস্কৃতির বিন্দুমাত্র উন্নয়ন আজও ঘটেনি। কীভাবে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা যায়, এই চিন্তাটি এখনও অনেক রাজনীতিবিদই লালন করেন। আবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টিও রীতিমত বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি গুম, হত্যা, অপহরণ নিয়ে দেশবাসী উদ্বেগের মধ্যে থাকলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরাও মানতে চাইছেন না যে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো অবনতি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা দেশের জনগণকে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে আশ্বস্ত করেন। এছাড়াও পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে, পরিসংখ্যানের দিক থেকে অপহরণের ঘটনা খুব বেশি না হলেও এর ভয়াবহতা জনমনে ভীতি ছড়াচ্ছে। কিন্তু এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অনেকেই নিজেদের অসহায়ত্বের কথা বলছেন (প্রথম আলো, ৪ মে ২০১৪)। একদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দেশবাসীকে শঙ্কিত না হতে আশ্বস্ত করছেন আবার বাস্তব অবস্থায় দেশবাসী শঙ্কিত না হয়ে পারছেন না। বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ শক্তিকে ঘায়েল করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করাটাই বড় রাজনীতি। অনেক গুম, অপহরণ কিংবা খুনের ঘটনাও প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতারই ফল। সেটি নিজ দলেরই হোক কিংবা অন্য দলেরই হোক। মূলত রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক শত্রুতার জের ধরেই এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। আবার অনেকেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করেও এমন মর্মান্তিক অবস্থার সুযোগ নিতে দ্বিধা করছেন না। কিন্তু প্রশ্ন হলো যারা এমন নির্মমতার সঙ্গে জড়িত, তারা কেউ কি একবারও ভেবে দেখেছেন নিজের দিকটা? ওই পরিস্থিতির শিকার আপনি হলে কেমন চিত্র হতো? গুম, খুন, অপহরণ খুব স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে, এ কথা বলার অপেক্ষাই রাখে না। এক্ষেত্রে বাস্তবতাকে আড়াল করে অপরাধীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না বলেই অপরাধীরা প্রশ্রয় পেয়ে যাচ্ছে। ফলে একের পর এক অপরাধ ঘটাতে থাকে তারা। যখন নিজের ওপর আঘাত আসতে থাকে তখন টনক নড়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের। কিন্তু তখন আবার অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রয়াত সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ দাবি তুলেছিলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।’ এটি আজ আমাদের সবার দাবিতে পরিণত হয়েছে। কারণ সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে ৭ জন অপহরণের পর গোটা জেলায় যখন বিক্ষোভ চলছিল তখনও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলছিলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আতঙ্কিত না হওয়ার ইস্যুতেই সাত জনের লাশ শীতলক্ষ্যায় পাওয়া গেল। তাহলে কেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে দেশবাসী কিছুটা হলেও আতঙ্কিত হবে? স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে দেশবাসী বিস্মিত হয়েছে। আর দেশের সিভিল সমাজ যখন জনগণের নিরাপত্তার দাবিতে কিংবা খুনের ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে দাঁড়ায় তখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বাধাগ্রস্ত হয় দেশবাসী তখন আতঙ্কিত না হয়ে পারেন না। আবার একটি দেশে অপরাধী শনাক্ত করতে কিংবা গ্রেপ্তার করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীর হুকুম লাগে তখনও দেশের সুশাসনের বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। দেশে অপহরণ, গুম, খুন বেড়ে গেলেও তা আমলে না নেয়ায় অপরাধীদের সাহস বেড়ে গেছে এবং তারা পূর্ণ উদ্যমে অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষের নিরাপত্তাহীনতার মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে। কে কোথায় অপহূত হবে, কোথায় কার লাশ পাওয়া যাবে, কে চিরদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে—এমনই উদ্বেগ, আতঙ্কে গোটা বাংলাদেশের মানুষ। গোটা দেশের মানুষ যখন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তখন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও একদল আরেক দলকে দায়ী করার কাজে ন্যস্ত (বিশেষ করে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে এবং বিএনপি আওয়ামী লীগকে)। এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি কখনোই বন্ধ হবে না? দেশে অপহরণের মাত্রা নিয়ে সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটিতে র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়, দেশে গত একযুগে অপহরণের শিকার ও নিখোঁজ হয়েছেন ১০ হাজার ১৬১ জন। এদের মধ্যে তিনশ’ জনের লাশ পেয়েছে স্বজনরা। উদ্ধার হয়ে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন আড়াই হাজার ব্যক্তি। বাকি প্রায় সাত হাজার হতভাগার এখনো কোনো খোঁজ পায়নি স্বজনরা। অপহরণ ও গুমের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন তিন সহস্রাধিক ব্যক্তি। ইদানীং নিরাপত্তা বাহিনীর নামে একটি অপরাধী চক্র এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। নানা ধরনের বিরোধের জের ধরেই এগুলো করা হয়ে থাকে। র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দাবি করেন, ধীরে ধীরে নিরাপত্তা বাহিনীর অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও অপরাধ রোধে সাফল্যের হার বাড়ছে। বর্তমানে র?্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার নাম, তাদের পোশাক ও হ্যান্ডক্যাফ অপহরণ ও গুমের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ সুযোগ গ্রহণ করছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের, প্রভু রাষ্ট্রকে খুশি করার, দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি ও নানা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে অপহরণ, গুম ও নিখোঁজ আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানান। কেউ প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্যও আত্মগোপন করেছে। এছাড়া চলতি বছরের তিন মাসে দেশে ১৯৬ জন ব্যক্তি অপহূত হয়েছেন। তাদের মধ্যে লাশ হয়ে ফিরেছেন ৬২ জন। জানা যায়, ১২ বছরের মধ্যে ২০০২ সালে ১০৪০, ২০০৩ সালে ৮৯৬ জন, ২০০৪ সালে ৮৯৮ জন, ২০০৫ সালে ৭৬৫ জন, ২০০৬ সালে ৭২২ জন, ২০০৭ সালে ৭৭৪ জন, ২০০৮ সালে ৮১৭ জন, ২০০৯ সালে ৮৫৮ জন, ২০১০ সালে ৮৭০ জন, ২০১১ সালে ৭৯২ জন, ২০১২ সালে ৮৫০ জন ও ২০১৩ সালে ৮৭৯ জন অপহরণ, গুম ও নিখোঁজ হয়েছেন। এমন প্রতিবেদন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, অপহরণ, গুম কিংবা খুনের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতিটি সরকারের সময় এমন ঘটনা ঘটেছে। শুধু অপহরণ কিংবা গুম নয়, বিগত একবছরে বিভিন্নভাবে দেশের সাধারণ মানুষকে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কোনোটির যথাযথ বিচার হয়েছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে পেট্রোল বোমায় মানুষ নিহত হওয়া এবং এর কোনো উপযুক্ত বিচার না হওয়া, পুলিশের গ্রেপ্তার-বাণিজ্য, প্রতিটি অপরাধ ঘটার পর শত শত এমনকি হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের এবং এক্ষেত্রে সাধারণদের হয়রানি প্রভৃতি কর্মকাণ্ড নির্দ্বিধায় চলমান থাকাতে নানাবিধ অপতত্পরতা অতি উত্সাহে ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সরকার কি বলতে পারবে যে অন্তত একটা কাজ বন্ধের যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছে? এক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাই বা কেমন? তারা কি শুধুই দর্শক? এ কথা আমরা সবাই জানি যে, গুম, অপহরণ আর হত্যার প্রথম প্রকাশ্য আইনগত লাইসেন্স দেয়া হয় গত বিএনপি সরকারের আমলে। জাতীয় সংসদ দ্বারা প্রণীত এবং পাসকৃত যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩-এর মাধ্যমে। ওই আইনের মাধ্যমে ২০০২-এর অক্টোবর থেকে ২০০৩-এর মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত তথাকথিত অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় যেসব ব্যক্তি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত, আহত-পঙ্গু হয়েছিলেন তারা কেউই কোনো কারণে ওইসব অপরাধের জন্য বিচার চাইতে পারবেন না। আমাদের মহান জাতীয় সংসদ আইন করে বলে দিল, এ দেশে যারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত-নির্যাতিত-পঙ্গু হবেন তারা কোনো মামলা করতে পারবেন না। এভাবেই তাদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে রেখে দেয়া হয়। অতএব সাম্প্রতিক সময়ের অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে না পারলে সামনে ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। এক্ষেত্রে শুধু সরকারকে নয় বিরোধী দলকেও সহযোগিতার মনোভাব দেখাতে হবে। তবে এ কথা সত্য যে, সরকারের নির্দেশে যদি কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকে কিংবা ‘যারা আমার লোকদের খুন-অপহরণ করছে শুধু তাদেরই ধর’— এমন নির্দেশ থাকে তাহলে অপরাধ কমবে না। বরং অপরাধীরা সাহস নিয়ে এগিয়ে যাবে অপরাধ ঘটাতে। আর তখন অপরাধীদের হাত থেকে রেহাই পাবেন না শাসক দলের নেতা-কর্মীরাও। লেখক :সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন