দেশ এগিয়ে যাবে কীভাবে?

আপডেট : ১২ মে ২০১৪, ২২:১৩
রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুস্থ ও স্বাভাবিক ধারা দেশের অগ্রগতির জন্য যে জরুরি একথা এখন সাধারণ ও নিরক্ষর মানুষও বুঝতে পারেন কিংবা উপলব্ধি করেন। তাছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য সরকারের ভালো কাজের প্রচেষ্টাকে অভিনন্দন জানানো এবং খারাপ কাজের সমালোচনা করা বিরোধী দলের দায়িত্বরূপে গণ্য করা হয়। সেদিক থেকে সরকার ও বিরোধী দলের কাছ থেকে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের মতো ভূমিকা আশা করাই স্বাভাবিক। গেল বছরের সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি ৫ জানুয়ারি (২০১৪) নির্বাচনের পর স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু এপ্রিল (২০১৪) মাস থেকে দেশের কয়েকটি স্থানে গুম-খুনের ঘটনা আবারো অনিকেত সংকেত দিতে শুরু করেছে। দেশের উন্নয়ন ব্যাহত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে সরকারের ভেতরের সরকার। অর্থাত্ বর্তমান সরকারের প্রশাসনের ভেতরে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যারা পরিস্থিতি ঘোলা করতে ইচ্ছুক। আর সেই সুযোগে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের অসত্ উদ্দেশ্য থাকতে পারে তাদের। বিষয়টি গুম-খুনের ঘটনাগুলো থেকে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। তাছাড়া অপরাধ প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতার সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মানবিক দিকের উন্নয়নে সচেষ্ট হওয়া জরুরি। সরকারের চেষ্টা থাকবে সেই কাজে শিক্ষা ও উদারনৈতিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করার। তবে স্বাধীনতা অর্জনের ৪৪ বছরে পদার্পণ অর্থাত্ বয়সের মাপে আমাদের দেশ ধনী কিংবা গরীব হওয়ার বিষয়ে অথবা কতদূর এগিয়ে গেল সে সম্পর্কে মূল্যায়নে খুব বেশি কঠোর হওয়ার দরকার নেই। কারণ ভারত অথবা মিসরের দুই হাজার বছরের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস এবং স্বাধীনতার অনেকদিন অতিবাহিত হলেও তারাও খুব বেশি এগিয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড মাত্র দেড়শ’ বছরে উন্নয়নের যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তা তাদের ধনী রাষ্ট্রের তকমা এনে দিয়েছে। আবার অনেক সময় রাষ্ট্রের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই সেই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের অঢেল প্রাপ্তিকে নির্দেশ করে থাকেন; অথচ যা একেবারে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে পরিগণিত। কারণ ক্ষুদ্র সীমানা আর আশি শতাংশ পার্বত্য ও ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা নিয়ে জাপান বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি কীভাবে হয়েছে? সেখানে আবাদি জমি নেই বললেই চলে, পশুপালনের জন্য চারণভূমি কম, তবু শিল্প-কারখানায় কাঁচামাল আমদানি করে বিশ্বব্যাপী তাদের পণ্যসামগ্রী ছড়িয়ে দিয়েছে জাপানীরা। কেবল নিজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা কী যথেষ্ট ছিল না? সুইজারল্যান্ডে নারকেল গাছের প্রাচুর্য নেই অথচ তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চকলেট উত্পাদনকারী রাষ্ট্র। ক্ষুদ্র দেশটিতে বছরের মাত্র চারমাস শস্য উত্পাদনের জন্য উপযোগী আবহাওয়া থাকে। অথচ তারাই দুগ্ধ উত্পাদনে বিশ্বের নন্দিত ও আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত রাষ্ট্র। দেশটি শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বসবাসের সর্বোত্তম জায়গা হিসেবে শীর্ষ স্থান দখল করে আছে এখনো। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য ধনী ও উন্নত দেশের তকমা লাগানো রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবী-জ্ঞানী ব্যক্তিদের চেয়ে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশের জ্ঞানী ব্যক্তিরা একেবারে পিছিয়ে নেই। বরং পেশাজীবীদের মধ্যে জ্ঞান-গরিমায় পার্থক্য কম। বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরস্পর পরস্পরের আন্তঃসম্পর্কের ভেতর দিয়ে সেই দিকটিও আজ স্পষ্ট। উপরন্তু দেশের অগ্রগতিতে ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের সমস্যাও মুখ্য নয়। বরং ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশ অন্য দেশ থেকে যাওয়া অভিবাসীদের বলপ্রয়োগে শ্রম আদায় করে যেভাবে ধনী রাষ্ট্রের শীর্ষে পৌঁছেছে সেই ধরনের ঘটনারও সম্মুখীন হতে হয়নি আমাদের গত ৪৩ বছরে। তাহলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের মূল সমস্যা কী? আসলে বর্তমান বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের মৌল পার্থক্য চেতনা ও আচরণের। আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি সেভাবে গড়ে তোলা হয়নি। ফলে নিজের দেশের সম্পদ বিনষ্টতে আমরা আনন্দ লাভ করি। মনে করি দেশের সম্পদ আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি নামক দলের। আসলে এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। আজ বড় বেশি দরকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আত্মসচেতনতা আর যুবসমাজের ইতিহাসচেতনা। দেশকে এগিয়ে নিতে যুবসমাজকে যথার্থ পথ-নির্দেশনা দিতে হবে। ইতিহাস আমাদের বর্তমানকে নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ করে। আজকের সমাজ ও বিগতকালের সমাজের মধ্যে সংলাপ চলে ইতিহাসে। অতীতকে বর্তমানের আলোতে বোধগম্য করতে হয়। অর্থাত্ বর্তমানকে বুঝতে হলে অতীতের আলো প্রয়োজন হয়। এ হিসেবে বর্তমান যুবসমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার চেতনা বারবার সামনে আনা দরকার। তারা যা করছে কিংবা ভালো-মন্দ বিবেচনা না করে যেসব আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে তাকে মিডিয়ার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত না করে একটি পরিশীলিত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার গড়ে তোলার সময় এসেছে স্বাধীনতার এ ৪৩ বছরে। ১৯৪৭-এর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে এক সার্বিক সংগ্রামে মেতে উঠেছিলেন সেই সময়ের পূর্ব বাংলার যুবকরা। তারা তাদের যৌবনকে ব্যয় করেছিলেন মুক্তিসংগ্রামের দীর্ঘ পথপরিক্রমায়। নিজের পরিচয়কে, নিজের স্বাধিকার চেতনাকে উজ্জীবিত করার সে প্রচেষ্টা ছিল সেই সময়ের যুবসমাজের কাছে স্বপ্ন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আর একুশে ফেব্রুয়ারি, আজ যা আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তা থেকেই বাঙালি নিজেকে চিনেছিল। পরাধীনতার যন্ত্রণা একদিন কুরে কুরে খেয়েছে যাদের তারা রাজপথে নেমেছেন, আর সেই পথই তাদের নিয়ে গেছে আলোর দিকে। সেই সময় থেকে চেতনার নানা মাত্রা স্ফুরিত হয়েছে। বাঙালির স্বাধিকার চেতনার জয়গান ছিল মধ্যবিত্তের ঘরে। পাকিস্তান আমলে নিম্নবর্গের মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না এর তাত্পর্য। সে আমলে কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুসহ অনেক জাতীয় নেতা; তারাও ছিলেন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। দীর্ঘ ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে তাদের গড়ে তুলতে হয়েছিল আমাদের একাত্তরের বিজয় মুহূর্তের প্রস্তুতি। এক বৃহত্ পটভূমি ও সময়পর্বে দাঁড়িয়ে সেই সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার মুক্তিকামী জনশক্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পেরেছি, ধর্ম-বর্ণ-সমপ্রদায়-গোষ্ঠীসহ সব বাঙালি ও বিদেশি বন্ধু জনগোষ্ঠীর আত্মত্যাগ এবং অবদানের মহিমার কথা। তবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব ছিল তখনকার বাস্তবতা। সেই সত্যকে মেনে নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের উচিত এখনকার নিম্নবর্গকে গড়ে তোলা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিয়ে নিম্নবর্গের মধ্যে অসামপ্রদায়িক ও মুক্তবুদ্ধির ভাবনাকে অনুপ্রবিষ্ট করাতে হবে শিক্ষিত যুবসমাজকেই। আদর্শ নাগরিক হতে হলে ইতিহাস সচেতন হতে হবে। কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারে স্মার্ট হলেই চলবে না। আমাদের দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সেই স্পৃহা ও অনুপ্রেরণা থাকতে হবে যা একজন উন্নত বিশ্বের নাগরিকের থাকা বাধ্যতামূলক। দেশকে ভালোবাসুন আর কর্মোদ্যমী হয়ে উন্নয়নে অংশগ্রহণ করুন; চিন্তা করুন দেশের সব ইতিবাচক অগ্রগতিকে নিয়ে। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে। লেখক:সহযোগী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় email : [email protected])

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন