সম্প্রতি বারডেম ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিত্সকদের কর্মবিরতির ঘটনার পর সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই চিত্র দেখা গেল। দেশের বৃহত্তম এই হাসপাতালে অনারারি ও শিক্ষানবিশ চিকিত্সকরা দুই দিনের ধর্মঘটের ডাক দেওয়ায় সেইখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হইতে বহিঃবিভাগ ও জরুরি বিভাগে চিকিত্সা লইতে আসা হাজার হাজার রোগীকে ভোগান্তি পোহাইতে হইয়াছে। আপাতত এই কর্মবিরতি সোমবার রাত হইতে স্থগিত করা হইলেও এই দৃষ্টান্তসমূহ আমাদের নূতন করিয়া ভাবাইয়া তুলিতেছে। তাহাছাড়া চিকিত্সকদের উপর হামলার প্রতিবাদে আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করিয়াছে চিকিত্সকদের সংগঠন বিএমএ। তবে কর্মবিরতির সময় জরুরি বিভাগ খোলা থাকিবে বলিয়া জানা যায়। ইহার আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো চিকিত্সাকেন্দ্রের জরুরি বিভাগের চিকিত্সাসেবা বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। অথচ একটি মহানগরের অন্যতম প্রধান পাবলিক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বন্ধ রাখিবার অর্থ হইল ওই হাসপাতালটির হূত্স্পন্দন বন্ধ করিয়া দেওয়া।
ধর্মঘটের ডাক দেওয়া চিকিত্সকদের অভিযোগ হইল, গত শনিবার রাতে তাহাদের এক সহকর্মীকে রাস্তায় মারধর করা হইয়াছে। প্রশ্ন হইল, যাহাদের সহিত চিকিত্সকদের সংঘর্ষ হইয়াছে, তাহাদের সহিত হাসাপাতালটির রোগীদের কী সম্পর্ক? রোগীদেরই বা এই ঘটনায় অপরাধ কোথায়? ধর্মঘটী চিকিত্সকরা যদি মনে করেন, সম্পর্ক না থাকুক, এই ধর্মঘটের পন্থা অবলম্বনের ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে তাহাদের বর্ণিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে, তবে এই ভাবনার ভিতরে বড় গলদ রহিয়াছে বটে। মনে রাখিতে হইবে, রোগীদের জিম্মি করিয়া ধর্মঘট তখন ডাকা যায় যখন আর কোনো পথ খোলা থাকে না। মুশকিল হইল, যেই প্রজন্মের চিকিত্সকরা কথায় কথায় ধর্মঘটের মতো চরম মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করিতেছেন, তাহারা জন্মের পরই দেখিয়া আসিয়াছে ধর্মঘট জর্জরিত এক বাংলাদেশকে। চারিদিকের অনিয়ম অরাজকতা দেখিয়া দেখিয়া তাহারা যেই ভাবে বড় হইতেছেন তাহাতে তাহাদেরই-বা দোষ কোথায় এমন প্রবণতায়?
কিন্তু চিকিত্সক হইলেন একটি মহত্ পেশাজীবী শ্রেণী। সমাজে তাহাদের মান-সম্মান প্রভাব প্রতিপত্তিও এমন একটি পরিশীলিত স্তরে, যাহার কারণ লুকাইয়া রহিয়াছে তাহার পেশার মহত্ত্বের মধ্যেই। চিকিত্সকরাও সব কিছুর ঊর্ধ্বে মানুষ বিধায়, তাহারাও ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নহেন। তাহাদের ব্যক্তিত্ব মান-অপমান বোধ বেশি বৈ কম নহে, অন্য কাহারও চাইতে। সুতরাং যখন কোনো অঘটন বা দুর্ঘটনা ঘটে চিকিত্সকদের সহিত অন্য পেশার বা শ্রেণীর মানুষের তখন স্বভাবতই তাহারা তাহার তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করিবেন বটে। কিন্তু তাহাদের বোধকরি এই মহান মানবিক সত্যের বিস্মরণ ঘটে যে, মানুষের জীবনমরণকে জিম্মি করিয়া কাজ করিবার মতো অনৈতিক ও অমানবিক কোনো দ্বিতীয় কাজ নাই। সম্প্রতি চিকিত্সকদের সহিত নানা পেশা বা শ্রেণীর মানুষের যে সংঘর্ষ ও তত্প্রতিক্রিয়ায় চিকিত্সকদের কর্মবিরতির যে ঘটনা বার বার দেখা যাইতেছে, সম্ভবত তাহার নেপথ্যে রহিয়াছে চিকিত্সকদের এক ধরনের অপরিণত মানসিকতা।
ইহা স্পষ্ট করিয়া বলিবার সময় আসিয়াছে যে, মনুষ্য সমাজে চিকিত্সকদের দায়-দায়িত্ব এতটাই অধিক যে তাহাদের পরিণত ও অধিকতর উন্নত মানসিকতায় উত্তরণ ঘটাইবার বড় দায়বদ্ধতাও রহিয়াছে। ধর্মঘটের পরিবর্তে তাহারা প্রতিবাদের অন্যকোনো গণতান্ত্রিক পন্থা কি বাছিয়া লইতে পারেন না?
