মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩নং সেক্টর কমান্ডার, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ২৮তম আসামি ও যুদ্ধোত্তর কালের অন্যতম প্রতিরোধ যোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএনএম নূরুজ্জামান ওরফে শাহ্রাজ ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরের এক শুভলগ্নে বর্তমান নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার অন্তর্গত সায়দাবাদ গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মুন্সিবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন।
তার পিতামহ আব্দুস সোবহান চৌধুরী একাধারে স্থানীয় জমিদার ও আইনজ্ঞ ছিলেন এবং পিতা এডভোকেট আবু আহম্মেদ (পরবর্তীতে ম্যাজিস্ট্রেট) ও মাতা লুত্ফুন্নেসা বেগম।
তিনি ১৯৫৫ সালে সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে ২য় বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট আর্টস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে ইতিহাসে অনার্সসহ ২য় বিভাগে স্নাতক সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি তদানিন্তন পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে গ্র্যাজুয়েট কোর্সের একজন ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। পাকিস্তানের কাকুল মিলিটারি একাডেমি থেকে কৃতিত্বের সাথে দীর্ঘ দুই বছর কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যয়ন ও সামরিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে নিয়মিত কমিশন প্রাপ্ত হয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত হন।
পরবর্তীতে পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে বাঙালি হওয়ার অজুহাতে প্রয়োজনীয় পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ কমিশন্ড সার্ভিস জীবনে মাত্র ২টি পদোন্নতি পেয়ে মেজর পদে উন্নীত হন অথচ তার ব্যাচের অবাঙালি অফিসারগণ প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের কম নম্বর পেয়েও উচ্চতর পদোন্নতি লাভ করে।
তিনি ১৯৬৮ সনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ২৮নং আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হন এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ঢাকা সেনানিবাসের এক বন্দিশালায় দীর্ঘ সময় আবদ্ধ থাকেন। ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনের মুখে তাকে পাক সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করে মুক্তি দেয়া হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙালিদের উপর গণহত্যা, নির্যাতন শুরু করলে তিনি ঢাকা থেকে পায়ে হেঁটে এসে নরসিংদী এবং রায়পুরাতে অবস্থান নেন। এপ্রিল এর প্রথম দিকে ঢাকা, গাজীপুর এবং বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে আগত বাঙালি সেনা, ই.পি.আর, আনসারদের তিনি সংগঠিত করেন এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। নরসিংদী, রায়পুরা, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া প্রভৃতি এলাকার ছাত্র-জনতাকেও একই সময়ে তিনি সংগঠিত করেন এবং নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএনএম নূরুজ্জামান ভারতে চলে যান এবং সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের ৩নং সেক্টরের সেকেন্ড-ইন কমান্ড নিয়োজিত করা হয় ও পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর’ ৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর’ ৭১ পর্যন্ত অকুতোভয় এই বীর সেনানায়ককে ৩নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ৩ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন এলাকা ছিল হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার অংশ বিশেষ এলাকা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএনএম নূরুজ্জামান অত্যন্ত দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সঙ্গে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন এবং তার নেতৃত্বে ৩ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য সফল অপারেশন পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএনএম নূরুজ্জামানকে ‘‘বীর উত্তম’’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
১৯৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর তার চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয় এবং সামরিক বাহিনী থেকে অবসর প্রদান করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরিকালীন সময়ে তিনি ফিলিপাইন, সেনেগাল, কানাডা, সুইডেনসহ আরও কয়েকটি দেশে অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে সুইডেনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি অকাল মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার বনানীস্থ সাময়িক কবরস্থানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়। জাতি ব্রিগেডিয়ার এএনএম নূরুজ্জামান বীর উত্তম-এর মত একজন অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক বীর সেনানীকে অকালে হারাল এবং নরসিংদীবাসীও হারাল তাদের গর্বের এ সন্তানকে।
ইতোপূর্বে নরসিংদী বাসী ও মরহুমের থানা এলাকায় মেঘনা খাল থেকে আলীনগর পর্যন্ত প্রস্তাবিত সড়কটি বীরউত্তম নুরুজ্জামান সড়ক নামাকরণ করার জন্য এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দীর্ঘদিন যাবত্ আবেদন করে আসছেন।
লেখক :সাবেক সহকারী পরিচালক, আইএসপিআর
