[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

আরোপিত অবিশ্বাস ব্যক্তি পূজার উচ্ছ্বাস

আপডেট : ১৩ মে ২০১৪, ২১:৪৫
সৌম্যদর্শন দেবকান্ত বরুয়া। আসামের প্রাক্তন মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য, বিহারের রাজ্যপাল এবং জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি— এসবই কি তাঁর প্রধান পরিচয়? না, একেবারেই নয়। প্রগাঢ় পণ্ডিত। আমৃত্যু, সাহিত্য আর ইতিহাসের নিবিড় পাঠক। বাগ্মী সাংসদ, হেম বরুয়ার মতো অসমিয়া ভাষার দিকনির্দেশক (যুগসন্ধিক্ষণের) কবি ছিলেন তিনিও। তার ‘সাগর দেখিছা?’ (সাগর দেখেছ?) এক সময় কবিদের, মধ্যবিত্তেরও মুখে মুখে উচ্চারিত হতো। বহুমাত্রিক প্রতিভার দেবকান্তকে, রাজনীতির এই আসাম-সন্তানকে, কংগ্রেস খুব একটা মনে রাখেনি। কিন্তু অনেকেরই স্মরণে, প্রবাদবাক্য হয়ে টিকে আছে তাঁর দুটি বিবৃতি। এক, আলি-কুলি যতদিন, কংগ্রেস ততদিন। দুই, ইন্দিরাই ভারত, ভারত মানেই ইন্দিরা। সত্তরের দশক, জরুরি অবস্থায় ভারত তখন কণ্ঠরুদ্ধ। দেশজুড়ে বাধ্যতামূলক ইন্দিরা-পুজোয় ব্যস্ত কংগ্রেসের সব স্তরের নেতা। এই পুজোকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দিয়ে ঘোষণা করলেন দেবকান্ত— ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা। তাঁর এই ব্যক্তি-পূজার বহরে লহর বইতে লাগল। অবরুদ্ধ কটাক্ষে হাসাহাসি শুরু। সংবাদপত্র চুপ। গালে তার হাত। ভয়, হাসলেই থাপ্পড় পড়বে। বিরোধীরা কারাগারের অন্তরালে বসে ভাবলেন, স্বৈরাচারিতার তোষণে মানুষ কতদূর নামতে পারে, নামালেন দেবকান্তের মতো জবরদস্ত ‘বিদ্বানও’। কেবল দেবকান্ত নন, জরুরি অবস্থার আগেই, আরো বহু গুণী ইন্দিরাভজনা শুরু করে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর অটলবিহারি বাজপেয়ির মতো স্থিতধী বিরোধী নেতাও ইন্দিরাকে দুর্গার সঙ্গে তুলনা করলেন। মকবুল ফিদা হোসেন, চমক আর রং তুলির অনুচ্চারিত গমকে যিনি স্বয়ংক্রিয়, দীর্ঘাঙ্গ প্রতিষ্ঠান, তিনিও ইন্দিরাকে দেবীর আসনে বসিয়ে বিমূর্ত ছবি আঁকলেন। বাঙালির প্রথম স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মক্ষণে এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রশ্নহীন সমর্থন ও আত্মঘাতী পাকিস্তানের বিপর্যয় ইন্দিরাকে আরাধ্য, জ্যান্ত প্রতিমা বানিয়ে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বীহীন কংগ্রেস নেত্রীও পূজা দাবি করতে থাকলেন। তাঁর ভজনায় পক্ষ-প্রতিপক্ষ সবাই ওই সময় একাকার। স্বৈরশাসনের স্বাভাবিক ধর্ম, সে দাবি করে পুজো, চায় প্রশ্নহীন আনুগত্য। আর এই ঘোষিত-অঘোষিত আধিপত্যবোধ প্রথমত তার নিজের, দ্বিতীয়ত দেশের, তৃতীয়ত সমাজের সর্বনাশ ডেকে আনে। গণতন্ত্রকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এর নিকটতম কয়েকটি উদাহরণ— ইরাক আর বাথ পার্টির (আল বাস) সর্বাধিনায়ক সাদ্দাম হোসেনের করুণ পরিণতি। সিরিয়া আর তার একনায়ক বাশার আল আসাদের বিপর্যয়। লিবিয়া এবং ওই দেশের প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মর আল কাজ্জাফির গণপ্রহারে মৃত্যু আর ধ্বংসলীলা। ভারতে, যুক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়, ব্যক্তির চাইতে সমাজ আর দলের গুরুত্ব অনেক বেশি। তার গণতন্ত্রে বহুমুখী রাজনীতির পরিসর বিস্তৃত, উন্মুক্ত। পণ্ডিত জহওরলাল নেহরু থেকে লালবাহাদুর শাস্ত্রী পর্যন্ত সংবিধানের সত্য, সত্যের রাস্তার (রাহ-এ-হক) এ তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রসার যথাসম্ভব সুরক্ষিত থেকেছে। ব্যক্তিকে দলের ঊর্ধ্বে কখনো ভাবা হয়নি। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী প্রথম অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যতিক্রমটি ঘটিয়ে দিলেন, অনুগতরা তাঁকে পরম পূজ্য ভাবতে থাকলেন, দেবকান্ত বরুয়ার ওই সোচ্চার ঘোষণা— ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া... দলকর্মীদের সমবেত ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ। ব্যক্তিপুজোর ঝোঁক, ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনের প্রচারেও প্রকট হয়ে উঠল। যেমন বিজেপিতে, তেমনি কংগ্রেসে, তেমনি আঞ্চলিক দলগুলোর নেতৃত্বসর্বস্ব প্রচারের তুমুল উদযাপনে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ভোটের আগেই প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করে দিতে বাধ্য হলো বিজেপি। এই প্রথম একটি নির্বাচন, যেখানে এ পর্যন্ত অনির্বাচিত অথচ ঘোষিত, ‘প্রধানমন্ত্রী’ দেশ জুড়ে একাই নির্বাচনী ময়দান চষে বেড়ালেন। এই প্রথম একটি ভোটের তোড়জোড়ে দেখা যাচ্ছে, চতুরমুখী বা পঞ্চমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর মত ও পথের অনৈক্য নিয়েও সব দল প্রায় একদিকে, আর প্রবলতম প্রতিপক্ষের ভূমিকায় তিনি—ভাই নরেন্দ্র মোদি একাই বিরুদ্ধ ভূমিতে। নির্বাচনী যুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বাধীন, অনুমেয় জয় তাঁকে যে উচ্চতায় পৌঁছে দেবে, সেখান থেকে আরেক একক আধিপত্যবোধ ও ক্ষমতামত্ততার সূচনার পদধ্বনি কি বেজে উঠবে না? তাঁকে ঘিরে যে উল্লাসের কোথাও ঝড়ো হাওয়ার, কোথাও মন্দ্র বাতাসের দাপাদাপি, তা কীসের লক্ষণ? এ কি শুধু ভোটের তাত্ক্ষণিক উত্তেজনা, না কোনো অদৃশ্য শক্তির ইঙ্গিতে ভারতের চিরায়ত লোকায়ত সত্তার সর্বনাশের সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি? সাম্প্রদায়িক আস্ফাালন, ধর্মনিরপেক্ষতার অবসান নিয়ে উদ্বেগ খুব একটা ঘেরাও করবে বলে মনে হয় না। ’৯০-এর দশকে আজকাল পত্রিকার সম্পাদক অশোক দাশগুপ্তকে বাজপেয়ি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি একান্ত সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন— ভারত কখনো হিন্দু রাষ্ট্র হবে না, হওয়া সম্ভব নয়, দেশের রাষ্ট্রনায়ককে ব্যবহারিক রাজনীতিতে ধর্ম, উগ্র সম্প্রদায় চেতনা থেকে দূরে সরে থাকতে হবে। আমাদেরও মনে হয়, ভারত যুগ যুগ ধরে যে একাত্মতার, পরমত সহিষ্ণুতার সাধনা করে আসছে এবং এখানকার সমাজের বহুমাত্রিক যে বিন্যাস ছড়িয়ে আছে, এসবের বদলে রাষ্ট্রীয় আদর্শ কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ভাবাবেগকে বরদাস্ত করতে রাজি হবে না। মহাজাতির লোকসত্তা, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, সংবিধানের অভিভাবকত্ব, বিচার ব্যবস্থা ও সামরিক বাহিনীর নিরপেক্ষতার অবসানও অসম্ভব। ভয় অন্যত্র, গণতন্ত্রের মৌল শক্তির, সামাজিক বিকাশের আর বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অভিমুখ বদলে যেতে পারে। ‘রাজা’ যা বলবেন, তাকেই অবিভাজ্য সত্য বলে মেনে নেয়ার অরব অনুশাসন নেমে আসবে। আতঙ্ক নয়, এ এক আশঙ্কা। অসত্য হোক আশঙ্কাটি, এটাই প্রার্থনা। ‘ভোট ব্যাংক’ কারে কয়? আরেকটি অত্যন্ত জরুরি প্রসঙ্গ। ৭ মে, বাংলায় আবার ভোট প্রচারে এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। বরাবর আমাদের মনে হয় তিনি ভালো, নির্মেদ বক্তা। শাণিত তাঁর আক্রমণ। বাচনভঙ্গিতে অটল ঘরানা। কী এবং কেন বলতে চান, ভাষায় তা স্পষ্ট। পরপর তাঁর এই তিন সভায়ও উপচে পড়ে উত্সাহ। থেমে থেমে, বারবার নিজেকে ভাই আর বাংলার জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রীকে দিদি বলে সম্বোধন করে বললেন— ভোট ব্যাঙ্ক-এর রাজনীতি করছেন ‘পরিবর্তিত’ নেত্রী। তার এ ব্যাঙ্কের সবাই ওপার থেকে এসেছেন, অনুপ্রবেশকারী। এই ‘ভোটব্যাঙ্ক’ শব্দটি নিয়েই আমাদের প্রথম আপত্তি। এটা কী বস্তু? টাকার মতো ভোটাররা কি এতোই ঠুনকো, এতোই নিষ্প্রাণ যে, এটিএমে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়, ব্যাঙ্ক থেকে তুলে এনে বাজারের পণ্য কিনে উড়িয়ে দিলেই খালাস? ভোটারের পছন্দের, অনিচ্ছার মূল্য নেই? যে কেউ চাইল, আর তারা ব্যবহার যোগ্য হয়ে উঠলেন? দ্বিতীয় আপত্তি, অনুপ্রবেশকারী অর্থাত্ সঙ্ঘপরিবারের ভাষায় যাঁরা বিদেশি, বাংলাদেশি বলে অভিযুক্ত, কেবল তারাই কি মমতা ব্যানার্জির ভোটব্যাঙ্ক। আমরা জানি, আগের লোকসভা ভোটে, বিধানসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে নির্বিশেষের সমর্থন পেয়ে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন মমতা। আমরা তার রাজনীতির প্রশ্নহীন সমর্থক নই। কিন্তু স্বীকার করতে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই যে, বিশেষ কোনো সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠী নয়, বাংলার জনসম্পদের অবিভাজ্য বড় অংশ তাঁকে বেছে নিয়েছেন। নরেন্দ্র নজরে মমতার ‘ভোটব্যাঙ্ক’ মানেই পরদেশি! তাঁর এই বিবেচনাহীন বয়ানের কী জবাব দেবেন বিজেপি’র প্রদেশ নেতৃত্ব? কী বলবে গ্রাম-শহরের বাঙালি এবং সুবে বাংলার সর্বজন? অপেক্ষায় রইলাম। লেখাটি শেষ করবার আগে আবার দেবকান্ত বরুয়ার প্রসঙ্গে ফিরে যাচ্ছি। সম্ভবত ষাট ও সত্তরের দশকে কংগ্রেসের আড্ডায়, কখনো জনসভায় তিনি বলতেন, আলি-কুলি যতোদিন, কংগ্রেস ততোদিন। শ্লোগানের মতো জনপ্রিয় বিবৃতি। কুলি মানে নেপালি ও হিন্দিভাষী চা শ্রমিক, আলি অর্থাত্ চরাঞ্চলের বাঙালি কৃষক। এক সময়, ১৯শ শতকে, পরেও পর্যায়ক্রমে বিহার, ঝাড়খণ্ড পূর্ববঙ্গ থেকে তাদের ব্রিটিশরা আসামি আমদানি করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তিতে ১৯২০ সালে লাইন প্রথা চাপিয়ে দুর্গম অরণ্যে, বাগিচার আশপাশে, ভয়াল ব্রহ্মপুত্রের দুই তীরে এসব হতভাগ্যের বসতি সীমাবদ্ধ করে দেয় বিভাজনবাদী প্রশাসন। যে কংগ্রেসের উদার রাজনীতি স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে তাঁদের ভরসা হয়ে ওঠে, সে দলটিই এসব গরিব, ভূমিহীন, জীবনযোদ্ধাদের বঞ্চিত রেখে দলদাস ভাবতে থাকে। অর্থাত্ তারা জাতীয় কংগ্রেসের সংশয়হীন, প্রশ্নহীন অনুগত বলে সনাক্ত হতে থাকলেন, নিজেদের অজান্তে, তাঁদেরই স্বগোত্রীয়, হঠকারী নেতৃত্বের কায়েমি স্বার্থের তাগিদে। সে এক রক্তাক্ত দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। বলাবাহুল্য, কংগ্রেসই ভোটব্যাংক নামক অবাস্তব ধারণার স্রষ্টা, প্রবক্তা। এক্ষেত্রে অবিভক্ত ভারতের মুসলিম লিগেরও দায় এড়ানো অসম্ভব। দু’পক্ষের পাপ এখনো উপমহাদেশের ‘আমরা-ওরার’ ফাটলকে বড়ো করছে। ফাটলে গড়ছে অদৃশ্য কাঁটাকারের দেওয়াল। লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক ও সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন