বাংলাদেশে নার্স সংকটের কারণে চিকিত্সাসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে। দুর্ভোগ বাড়িতেছে রোগীদের। সর্বশেষ হেলথ ওয়াচ রিপোর্টে বলা হইয়াছে, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ২ লক্ষ নার্সের ঘাটতি রহিয়াছে। সমপ্রতি সরকার একসঙ্গে ৪ হাজার ১ শত জন নার্স নিয়োগ দিয়াছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তাহা নগণ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্টান্ডার্ড অনুযায়ী ডাক্তার ও নার্স অনুপাত হওয়া উচিত ১:৩। কিন্তু এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের বাস্তবতায় তাহা হইল ২.৫:১। জনসংখ্যা ও বেড অনুপাতে নার্সের সংখ্যা হইল যথাক্রমে ৫০০০:১ এবং ১৩:১। একদিকে দেশে নার্সের সংকট রহিয়াছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত নার্সের ব্যাপক চাহিদা আছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই ১.৫ মিলিয়ন নূতন নার্স দরকার। এই দুই দিক বিবেচনা করিয়া নার্সিং শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ ও তাহার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে নার্সের (মিডওয়াইফসহ) সংখ্যা ২৮ হাজার ৭৯৩ জন। তন্মধ্যে ১৭ হাজার ৭৯৪ জন নার্স (রেজিস্টার্ড নার্স-মিডওয়াইফ) সরকারি নার্সিং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত। আর প্রায় ১৩ হাজার নার্স দেশে অবস্থিত বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওতে কর্মরত। ইহাছাড়া সরকারি ১২০ জনের লিয়েনসহ মোট ১ হাজার ১০০ জন নার্স বিদেশে কর্মরত। পক্ষান্তরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে মোট চিকিত্সক সংখ্যা ৪৬ হাজার ৯৫১ জন। আর সরকারি-বেসরকারি মিলাইয়া হাসপতালে ও ক্লিনিকে মোট বেডসংখ্যা ৯১ হাজার ১০৬টি। যদিও অধিকাংশ হাসপাতালে নির্ধারিত বেডের চাহিতেও বেশি রোগী ভর্তি হয়,তথাপি এই পরিসংখ্যান হইতে ডাক্তার, নার্স ও ভর্তিকৃত রোগী সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। ইহাতে দেখা যাইতেছে, ডাক্তার অনুপাতে নার্সের সংখ্যা সত্যিই কম। অথচ হওয়ার কথা বেশি। কেননা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একজন চিকিত্সকের বিপরীতে ৩ জন নার্স স্টান্ডার্ড হিসাবে বিবেচনা করা হইলেও আসলে দরকার ৪ হইতে ৫ জন। কেননা রোগীর সেবায় একজন নার্সের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহারা আন্তরিক সেবা দিয়া একজন রোগীকে সুস্থ হইতে সহায়তা করেন। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈনিকদের সেবা-শুশ্রূষার মাধ্যমে সুস্থ করিয়া তোলেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। ইহার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে, রোগীর সম্পূর্ণ নিরাময়ের জন্য একজন নার্সের ভূমিকা অনুপেক্ষণীয়। কেহ কেহ মনে করেন, রোগীর সুস্থতায় অর্ধেক অবদান ডাক্তারের, আর বাকিটা নার্সদের। এমতাবস্থায় মানসম্পন্ন চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করিতে হইলে রোগী, ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যাগত সমন্বয়সাধন জরুরি।
দেশে কাঙ্খিত হারে নার্সের সংখ্যা বাড়াইতে হইলে নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজের সংখ্যাও বাড়াইতে হইবে। নার্সিং কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করিতে হইবে। বিদেশের বাজার ধরিতে চাহিলে প্রি-সার্ভিস শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে। শিক্ষার্থীদের বিদেশি ভাষায় দক্ষতাও বাড়াইতে হইবে। নার্সিং পেশার উন্নতি সাধনে নার্সিং কলেজগুলিতে ক্রমান্বয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েট চালু করিতে হইবে। বিদ্যমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বাড়াইতে হইবে আসন। বাংলাদেশের নার্সদের বিদ্যমান সংকটগুলির দিকেও দৃষ্টি দেওয়া দরকার। একদিকে পর্যাপ্ত নার্সের অভাব রহিয়াছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত নার্স চাকুরী পাইতেছেন না বলিয়া জানা যায়। অনেকের চাকুরীর বয়স পার হইয়া যাইতেছে। এই সমস্যা দূর করিতে হইলে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের শূন্য পদগুলিতে অবিলম্বে নার্স নিয়োগ দিতে হইবে। একইসঙ্গে নূতন নূতন পদও সৃষ্টি করিতে হইবে। প্রয়োজনে বয়সসীমা কিছুটা শিথিল করিয়া পূর্বের নিয়মমাফিক ব্যাচ, মেধা ও জ্যেষ্ঠতা অনুসারে নার্স নিয়োগ দিতে হইবে। এ ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
