বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সঙ্গে গ্রন্থাগার এইরূপভাবে জড়িত যে উহার গ্রন্থসংখ্যা ও আসনব্যবস্থা অপর্যাপ্ত থাকিলে শিক্ষার্থীদের নিবিষ্ট ও গবেষণামূলক শিক্ষার ব্যাঘাত ঘটিতে বাধ্য। একটি মর্যাদাসম্পন্ন ও পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৪৪ বত্সর পার করিবার পরও ইহার কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার আজ অবধি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় নাই। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও ইহার গ্রন্থাগারটি এই ২০১৪ সালে আসিয়াও আধুনিকতার ছোঁয়া পায় নাই। অভিজ্ঞ গ্রন্থাগারিকের অভাব, আসনস্বল্পতা, বইয়ের স্বল্পতা, যাতায়াতের সমস্যা, সংগৃহীত গ্রন্থের প্রতি অযত্ন-অবহেলা প্রভৃতি একযোগে গ্রন্থাগারটির দৈন্যদশাকে প্রকট করিয়া তুলিয়াছে।
পত্রিকান্তরে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে গ্রন্থাগারের মূল ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করিবার সময় ইহার আয়তন নির্ধারণ করা হইয়াছিল এক লক্ষ হাজার বর্গফুট। সেই সময় ৫৫ হাজার বর্গফুটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হইলেও বাকি রহিয়া যায় প্রায় ৪৫ হাজার বর্গফুট, যাহার নির্মাণকাজ আজ অবধি সম্পন্ন করা সম্ভব হয় নাই। গ্রন্থাগারটিতে প্রায় লক্ষাধিক বই থাকিলেও প্রয়োজনের তুলনায় তাহা অপ্রতুল। তাহাছাড়া নূতন বিভাগসমূহের জন্যও ন্যূনতম রেফারেন্স বই যেন সোনার হরিণ। অভিজ্ঞ গ্রন্থাগারিকের অভাবের কারণে গ্রন্থাগারে যথাযথভাবে বইয়ের রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভবপর হইয়া ওঠে না। স্বভাবতই রেফারেন্স নিয়া বই খুঁজিতে বিলম্ব হওয়াটাই শিক্ষার্থীদের ভবিতব্য হইয়া উঠিয়াছে। ইংরেজি ভাষায় লিখিত গ্রন্থসমূহ কম্পিউটারের মাধ্যমে অনুসন্ধান সম্ভব হইলেও বিপুল পরিমাণ বাংলা ভাষায় লিখিত গ্রন্থসমূহকে খুঁজিতে হয় মান্ধাতা আমলের এনালগ পদ্ধতিতে; এই ঢিমেতাল অবস্থার প্রেক্ষিতে গ্রন্থাগারে ডিজিটালের ছোঁয়া যেন আকাশকুসুম কল্পনা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনটির পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় উন্নীত করিয়া আধুনিকীকরণ ব্যতিরেকে যথাযথ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব নহে কিছুতেই। কেননা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল, পিএইচডিসহ প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে গ্রন্থাগারটিতে আসন রহিয়াছে মাত্র ২৭৫টি। হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে, প্রতি আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫১ জন। এই বিপুল আসন ঘাটতি সুষ্ঠু পঠনপাঠনের যে বৃহত্ অন্তরায়, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, বিশ্বের সকল উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়েই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী নিরিবিলি নির্ঝঞ্ঝাটে তাহাদের অধ্যয়ন কার্য চালাইয়া থাকে গ্রন্থাগারের সুশৃঙ্খল পরিবেশে। তাহার ব্যতিক্রম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও নহে। তাই স্বল্পসংখ্যক আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগারের দ্বার খুলিবার বহু পূর্বেই লাইনে দাঁড়াইতে বাধ্য হয়। লাইনে দাঁড়ানো ও আসনে বসা লইয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতাহাতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটিয়াছে একাধিকবার। অধ্যয়নের জন্য একটি আসন পাইবার এই অসুস্থ এবং অপ্রত্যাশিত প্রতিযোগিতা বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষাপরিবেশের হীনস্বাস্থ্যের দিকেই ইঙ্গিত করে। অথচ গ্রন্থাগারের অসম্পূর্ণ অংশটির নির্মাণ সম্পন্ন করা হইলে পাঁচ শতাধিক আসন বৃদ্ধি করা সম্ভব সহজেই।
এমতাবস্থায় মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রন্থাগারটির অবশিষ্ট নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা আশু কর্তব্য। পাশাপাশি গ্রন্থাগারের সেবার মানোন্নয়নের দিকেও মনোযোগ দিতে হইবে। লাইব্রেরীটি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখিবার ব্যবস্থা করা ছাড়াও নূতন গ্রন্থ ও জার্নাল এবং আধুনিক ডিজিটালাইজড পদ্ধতিতে গ্রন্থাগারের বই বিন্যস্তকরণের জন্য প্রশিক্ষিত লাইব্রেরিয়ান ও প্রয়োজনীয় কর্মচারী নিয়োগ প্রদান অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছে। নূতন গ্রন্থের চাহিদা মিটাইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেও আপলোড করা যাইতে পারে ই-বুক। গ্রন্থাগারের এইরূপ অনলাইন সংস্করণ আমাদের দেশেও এখন বিরল নহে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ইহার উদাহরণ। বিশ্বায়নের যুগে জ্ঞানের আকরতুল্য গ্রন্থকে সহজলভ্য করা যায় আধুনিক প্রযুক্তির আশ্রয় লইবার মাধ্যমেও। এই উদাহরণ সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রহিয়াছে। প্রায় প্রতিটি উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য ফি বত্সর আক্ষরিক অর্থে কয়েক কোটি টাকার বই ক্রয় করিতে হয়। বিদেশি একটা বইয়ের দামও দশ-পনের হাজার টাকা পর্যন্ত হইতে পারে। অথচ গ্রন্থাগারের একটি অংশ ই-বুক দ্বারা সমৃদ্ধ করা হইলে হাজার হাজার গ্রন্থ প্রিন্ট ভার্সনের তুলনায় নামমাত্র মূল্যে ক্রয় করা সম্ভব হয়। এই সমস্ত ই-বুক রাখিবার জন্য ভারি ভারি তাকেরও দরকার পড়ে না। মোট কথা, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটির আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রদান অতি জরুরী। ইহা দুরূহ কোনো কাজও নহে। সুতরাং তাহার বিলম্ব কাম্য নহে কিছুতেই।
