সম্ভবত বছর দশেক আগে আমি ‘বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ শব্দগুচ্ছটি প্রথম শুনি। তখন এটি মাঝে-মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞানতাবশত ব্যবহার করতো। ভুলবশত ব্যবহূত হতো বলেই হয়তো কেউ এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেননি। তবু কেউ কেউ এ নিয়ে ব্যক্তিগত মন্তব্য করেছেন আমাদের কাছে। একটি জাতীয় দৈনিক এ বিষয়ে তাদের অবস্থান নিয়ে একটি সম্পাদকীয় ছেপেছিলেন ‘বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ বলিতে কিছু নেই, এই শিরোনামে (্ঐ পত্রিকায় তখন সবকিছু সাধু ভাষায় লেখা হতো)। তারপর বিষয়টি মানুষের আড়ালে চলে যায়। তবে সম্প্রতি খুব সমারোহের সাথে ব্যাপকভাবে ঐ ভুল বিষয়টি যত্রতত্র লেখা হচ্ছে। ইচ্ছাকৃতভাবে লেখা হচ্ছে বলে মনে হয়। অনার্স পড়ানো হয় এমন কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বলছে। জাতীয় গণমাধ্যমে অর্থাত্ দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রায়শ এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহূত হচ্ছে। আমার নিজের এ বিষয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। তবে এই ভুলটা মারাত্মক বলেই এ বিষয়ে কথা বলার অবতারণা। কলেজ কলেজই সেখানে অনার্স পড়ানো হোক আর এমএ পড়ানো হোক। আর বিশ্ববিদ্যালয়কে তো আলাদা করে চিনিয়ে দিতে হবে না । তবে এখন চারদিকে ছোট্ট ছোট্ট ঘরে যেভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সে কারণে এ নিয়েও উত্কণ্ঠা বাড়ছে।
আমি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ব্যাপারটি মেনে নিতে পারি দুটো কারণে। প্রথমত. সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী কোন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে যে এখন থেকে সব অনার্স পড়ানো কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বলতে হবে ? আমি যদ্দূর জানি সেটা করা হয়নি। দ্বিতীয়ত. আর একটা কারণে আমি মানতে পারি যদি এই শব্দগুচ্ছ সবাই মিলে মান্য করে। ভাষাতত্ত্বের নিয়মে অনেক অসিদ্ধ শব্দ একসময় মূল ভাষায় গৃহীত হবার সুযোগ পায় যদি সবাই সেটাকে মান্য করে বা মেনে নেয়। এভাবে অনেক অশ্লীল বা স্ল্যাং বা লোকভাষাও মান্যভাষা হিসেবে মূল ভাষার শব্দকোষে গৃহীত হয়। সেক্ষেত্রেও ঐ শব্দের অর্থ বা প্রয়োগ নিয়ে কারো কোন আপত্তি থাকে না। থাকে তার জাত-পাত নিয়ে। আমার ধারণা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শব্দগুচ্ছটির অর্থ ও প্রয়োগজনিত ভুল এত বেশি মারাত্মক যে তা মেনে নেয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। যারা এর প্রয়োগ করছেন তারা হয় না বুঝে করছেন না হলে নিজেদের স্মার্ট ভাবার জন্য করছেন। এই রোগটা সম্ভবত শুরু হয় যখন নব্বই দশকের গোড়াতে এ দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীভুক্ত কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স পড়ানো হতো। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সিলেবাসে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সিলেবাস ও একই সাথে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিতো। একটা মানসম্পন্ন লেখাপড়া তখন চালু ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাপ কমানোর জন্য একটা অদ্ভুত, ভুলে ভরা কনসেপ্ট নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত হয় যাকে খুব হলে একটা বোর্ড বলা যেত। এটা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্টরা উচ্চশিক্ষা বিস্তারের নামে যা যা করেছে তাতে আমাদের উচ্চশিক্ষার বারোটা বাজতে বাকি নেই। অন্য প্রতিষ্ঠানও এসবের জন্য দায়ী, তবে সেটা এখানে প্রসঙ্গ নয়। এখন অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স খোলার হিড়িক পড়ে গেছে আমাদের দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায়। এর সঙ্গে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু অসত্ আমলা জড়িত হয়ে গ্রামে-গঞ্জে অলিতে-গলিতে যত্রতত্র ছোট ছোট কলেজে অনার্স ও কোন কোন ক্ষেত্রে এমএ পড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে। সেখানে কোন অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা যেমন নেই, তেমনি নেই বইপত্র শিক্ষকসহ অন্য সহায়ক সামগ্রী। অন্যায়ভাবে টাকা-পয়সার বিনিময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শ’য়ে শ’য়ে কলেজে অনার্স ও এমএ কোর্সের অনুমোদন দিয়েছে যার ভয়াবহ পরিণতি আমরা হয়তো অচিরেই দেখতে পাবো। কিছু মাস্টার্স পাস ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে নিম্নমানের কলেজে যেভাবে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স খোলা হয়েছে তার কোন যৌক্তকতা নেই। কিছু বেকার ছেলে বা মেয়ের চাকরির সুযোগ এখানে হয়েছে সেটা সত্য তবে এর তো কোন প্রয়োজন ছিলো না। এত ছেলেমেয়ে অনার্স বা মাস্টার্স পড়ার তো কোন প্রয়োজন নেই। এর জন্য পুরনো বনেদী কলেজগুলোই যথেষ্ট ছিলো। এটা কোনভাবে শিক্ষার বিস্তার নয়।
কলেজকে কলেজ বললে তার কী কোন ক্ষতি বৃদ্ধি হয় ? নাকি তার খ্যাতি নিয়ে সমস্যা হয়। ১৮৭৩ সালে রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্ভবত পূর্ব বাংলায় প্রথম এই কলেজে অনার্স কোস চালু হয় কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। তখন বাংলাদেশে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো না। এখনকার অনেক বাঘা বাঘা পণ্ডিত রাজশাহী কলেজে পড়তেন। সেই রাজশাহী কলেজকে তার সম্মান বাঁচিয়ে রাখার জন্য একে কী এখন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বলতে হবে ? বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বলে কী বোঝাতে হবে যে এখানে অনার্স ও এমএ পড়ানো হয় ? আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত অনার্স পড়ানো হয় না। সেখানে এমএ ও উচ্চতর গবেষণা হয়। আর কলেজগুলোতে পড়ানো হয় অনার্স ও মাস্টার্স। তাহলে আমাদের এই দুর্গতি কেন? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও এর সাথে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গকে অনুরোধ করতে চাই এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা যেন তারা দেন অথবা একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেন সঠিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে। তাহলে এই যাচ্ছেতাই কাণ্ড বন্ধ হবে বলে হয়।
লেখক :অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
