বুথ ফেরত সমীক্ষা এবার ভারতীয় জনতা পার্টিকে লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়েও বেশি আসন পাওয়ার আভাস দিয়েছে। ভীষণ খুশি এতে ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি। অবশ্য তৃপ্ত বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী নিজেও। সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ হতে না হতেই বিজেপি তথা এনডিএ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ইঁদুর দৌড় শুরু হয়ে গেছে। কে স্পিকার হচ্ছেন, কে লোকসভার চিফ হুইপ হবেন কিংবা কে সরকার দলীয় নেতা হবেন— এসব পদপিপাসু বিজেপির রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরের ডজনখানেক নেতা এখন মোদীর দ্বারস্থ হচ্ছেন।
যদি বুথ ফেরত সমীক্ষার ফল বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে কংগ্রেস সরকার গড়তে না পারলেও কোনভাবেই সোনিয়া-রাহুলের দল বিরোধী আসনে নড়বড়ে অবস্থানে থাকবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের অভিমত, বিজেপি বা এনডিএ এককভাবে সরকার গঠন করার পর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকারী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কংগ্রেস একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ল এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। লোকসভায় বিজেপির আসন সংখ্যার দাপট থাকলেও ইচ্ছা করলেই কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে কিছু করা সম্ভব হবে না এনডিএ সরকারের। কেননা জোর করে লোকসভায় কিছু করে নিলেও উচ্চকক্ষ অর্থাত্ রাজ্যসভায় কংগ্রেসের প্রতিনিধিরাই তখন এর বিরোধিতা করবেন। রাজ্যসভায় আসন সংখ্যার বিচারে কংগ্রেসের চেয়ে অনেকটাই পেছনে থাকছে বিজেপি।
তর্কের খাতিরে কিংবা রহস্য করেও বলা যেতেই পারে, ‘মোদীর যদি লোকসভা হয়, তবে সোনিয়া-রাহুলের হাতেই রাজ্যসভার নেতৃত্ব থাকছে’। অন্তত আরো দুই থেকে আড়াই বছর। যতদিন না কংগ্রেসের তুলনায় বেশি রাজ্যে বিজেপি তাদের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা না করতে পারছে। কেননা রাজ্যের বিধানসভার আসন অনুযায়ী রাজ্যসভার রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী দিতে পারে।
ভারতের ২৮ রাজ্যের মধ্যে কংগ্রেস এখন এককভাবেই ৯টি এবং জোটগতভাবে আরো ৩টি মিলিয়ে ১২ রাজ্যে শাসন করছে। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি বা এনডিএ এককভাবে ৬ এবং জোটগতভাবে ১০ রাজ্যে শাসন করছে। ২৫০ আসনের রাজ্যসভা হচ্ছে ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ। লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩টি। লোকসভাকে নিম্নকক্ষ বলা হয়। রাজ্যসভার ২৫০ আসনের মধ্যে দেশে শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান গবেষণায় অবদান রাখার জন্য ১২ আসন রাষ্ট্রপতি সরাসরি মনোনয়ন দেন। শচীন টেন্ডুলকার, রেখা, জাভেদ আক্তার উল্লেখযোগ্য বিশিষ্ট ব্যক্তি রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন এখন। রাজ্যসভায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের ৮২ সদস্য রয়েছেন। অন্যদিকে এনডিএর রয়েছেন ৬১ সদস্য। রাজ্যসভায় কংগ্রেসের একক সদস্যই আছেন ৭২ জন। বিপরীতে বিজেপির ৪৭ জন। রাজ্যগুলোর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে যে যত বেশি ভাল করবে রাজ্যসভায় আসন সংখ্যা সেই দলের বেশি হবে।
রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার হিসেবেও বিজেপির চেয়ে কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে। এই মুহূর্তে কংগ্রেস ক্ষমতায় রয়েছে হরিয়ানা, রাজস্থান, আসাম, মিজরাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, গোয়া ও অন্ধ্রপ্রদেশে। কেরালায় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ইউসিডিএফ, মাহারাষ্ট্রে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন এনসিপির জোট এবং জম্মু-কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্সের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট রাজ্য সরকার চালাচ্ছে।
অন্যদিকে বিজেপি এককভাবে শাসন করছে হিমাচল প্রদেশ, উত্তরখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, কর্ণাটক এবং ছত্তিশগড়। আর জোটের রয়েছে আরো চারটি রাজ্য। সেগুলো হল— পাঞ্জাব, বিহার, ঝাড়খণ্ড, নাগাল্যান্ড।
রাজ্যসভায় আসন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে, অন্ধপ্রদেশে ১৭ রাজ্যসভার সদস্যের মধ্যে কংগ্রেসের আছে ১৩ জন। বাকি চারজন তেলেগুদেশম পার্টির। অরুণাচল প্রদেশের এক আসনে কংগ্রেস একাই আছে। আসামে ৭ আসনের ৬ আসন কংগ্রেসের। ব্যারোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্টের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। বিহারে ১৬ আসনে জনতা দলের (ইউনাইটেড) দশটি এবং ভারতীয় জনতা পার্টি- বিজেপির ৪ সদস্য আছেন। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় জনতা দলের ২ জন সদস্য রাজ্যসভার প্রতিনিধি। পাঁচ আসনের ছত্তিশগড়ে তিনজন বিজেপি এবং দুই জন কংগ্রেসের সদস্য রয়েছেন। বিজেপি শাসিত গুজরাটের ১১ রাজ্যসভার সদস্যের মধ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপির ৮ জন সদস্য রয়েছেন। বিপরীতে কংগ্রেসের রয়েছেন মাত্র তিনজন সদস্য। হরিয়ানায় কংগ্রেসের শাসন চললেও পাঁচ-আসনের ওই রাজ্যে কংগ্রেস লোকদলের দুই জন সদস্য উচ্চকক্ষে রয়েছেন। বাকি তিন জন সদস্য আছেন ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের। বিজেপি শাসিত হিমাচল প্রদেশে রাজ্যসভায় বিজেপির দুই জন প্রতিনিধি রয়েছেন। বাকি এক জন কংগ্রেসের। চার আসনের জম্মু-কাশ্মীরে কংগ্রেসের এক জন এবং ন্যাশনাল কংগ্রেসের দুই জন সদস্য রয়েছেন রাজ্যসভায়। ঝাড়খণ্ডে ’মিলিঝুলি’ সরকারের চিত্রটা একটু ভিন্ন। সেখান থেকে রাজ্যসভার সদস্য যেতে পারেন মাত্র ৬ জন। তৃণমূলের এক জন, নির্দলীয় এক জন, কংগ্রেসের ২ জন, রাষ্ট্রীয় জনতা দলে একজন এবং বিজেপির ১ জন সদস্য রয়েছেন ২৫০ আসনের রাজ্যসভায়। ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত কর্ণাটকে ১২ রাজ্যসভার সদস্য রয়েছে। এরমধ্যে বিজেপির সদস্য ৬ জন, কংগ্রেসের ৪ জন ছাড়াও দুই জন রয়েছেন রাজ্যসভায় নির্দলীয় সদস্য। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট শাসিত কেরালা থেকে ৯ জন রাজ্যসভার সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে কংগ্রেসের একক সদস্য আছেন ৩ জন। বামপন্থিদের রয়েছেন ৫ জন এবং ২ জন রয়েছেন কংগ্রেসের সদস্য। আর এখানে কেরালা কংগ্রেসের ১ জন সদস্য রয়েছেন। ১১ আসনের মধ্যপ্রদেশ বিজেপি শাসিত রাজ্য। ওই রাজ্য থেকে রাজ্যসভায় বিজেপির সংসদ সদস্য ১০ জন। আর এক জন রয়েছেন কংগ্রেসের সদস্য। কংগ্রেস এবং ন্যাশালন কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপি শাসিত মহারাষ্ট্রের রাজ্যসভার আসন সংখ্যা ১৯। এর মধ্যে কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা ৬। ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপির সদস্য সংখ্যা ৬। ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপির এই রাজ্য থেকে রাজ্যসভায় প্রতিনিধি রয়েছেন ৩ জন। ভারতের একমাত্র শিবসেনাদের প্রতিনিধি রয়েছেন এই মহারাষ্ট্র থেকে। বাল ঠাকরের দলের রাজ্যসভার প্রতিনিধি রয়েছেন ৪ জন। মণিপুর থেকে একজনই কংগ্রেসের প্রতিনিধি রয়েছেন রাজ্যসভায়। মেঘালয় থেকে ন্যাশানাল কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপির একজন রাজ্যসভার সংসদ সদস্য। মিজোরাম থেকে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের একজনই প্রতিনিধি রয়েছেন রাজ্যসভায়। এক আসনের নাগাল্যান্ডেও সেখানে রাজ্যসভার প্রতিনিধি নাগা পিপলস ফ্রন্ট। নাগাল্যান্ডেও বিজেপির সঙ্গে নাগা পিপলস ফ্রন্টের জোট সরকার চলছে। এক আসনের দিল্লি থেকেও কংগ্রেসের একজন নির্বাচিত রাজ্যসভার সদস্য রয়েছেন রাজ্যসভায়।
বিজু জনতা দলের শাসন চলে উড়িশ্যায়। সেখানে বিরোধী আসনে রয়েছে কংগ্রেস এবং বিজেপি দুই দলই। ১০ আসনের এই রাজ্য থেকে বিজু জনতা দলের ৬ জন নির্বাচিত সদস্য রয়েছেন রাজ্যসভায়। অন্যদিকে বিজেপি ১ জন, কংগ্রেসের একজন এবং নির্দলীয় ১ জন সদস্য আছেন রাজ্যসভায়। কেন্দ্রশাসিত পুণ্ডচেরিতে থেকে কংগ্রেসের একজন রাজ্যসভার সদস্য আছেন। শিরোমনি আকালি দলের সঙ্গে জোট করে বিজেপি শাসিত পাঞ্জাবে ৭ আসনের মধ্যে শিরোমনি আকালি দলের ৩ জন সদস্য রয়েছেন, বিজেপির এক এবং কংগ্রেসের ৩ জন প্রতিনিধি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। রাজ্য সভার ১০ আসন বিশিষ্ট বিজেপি শাসিত রাজস্থানে বিজেপির রয়েছেন ৬ সদস্য। সেখানে বাকি চার জন কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসাবে গেছেন রাজ্যসভায়। তামিলনাড়ুতেও রাজ্যসভার সদস্য ১৮। জয় ললিতার এআইএডিএমকে শাসিত এই রাজ্য থেকে বিজেপির একজনও প্রতিনিধি নেই রাজ্যসভায়। তবে কংগ্রেসের এখান থেকে রাজ্যসভার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ৪ জন, এআইএডিএমকে সদস্য রয়েছেন ৫ জন, ডিএমকের ৭ জন এবং বাম ফ্রন্টের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন তামিলনাড়ু রাজ্য থেকে। বাম ফ্রন্ট শাসিত ত্রিপুরা থেকে একজনই প্রতিনিধি আছে বাম ফ্রন্টের।
রাজ্যসভার সব চেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশ। বহুজন সমাজবাদী পার্টি বিএসপি শাসিত এই রাজ্য থেকে ৩১ জন রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হতে পারেন। মায়াবতির দল থেকে রাজ্যসভায় রয়েছেন ১৪ জন। মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টির সদস্য আছেন ১০ জন। উত্তর প্রদেশ থেকে বিজেপির ৩ জন এবং কংগ্রেসের মাত্র ২ জন রাজ্যসভার প্রতিনিধি রয়েছেন। ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং নির্দলীয় দুই জন প্রতিনিধি গিয়েছেন রাজ্যসভায়। বিজেপির শাসিত ৩ রাজ্যসভার আসন বিশিষ্ট উত্তরখণ্ড। সেখানে বিজেপির ২ জন এবং কংগ্রসের এক জন প্রতিনিধি রয়েছেন। তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ১৯ আসন রয়েছে রাজ্যসভার জন্য। এর মধ্যে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের ১০ আসন রয়েছে। বাম ফ্রন্টের রয়েছে বাকি ৯টি আসন। এই রাজ্যেও বিজেপির রাজ্যসভার কোন আসন নেই। কংগ্রেসের কোন আসন নেই মমতার ওই রাজ্যে।
বর্তমান লোকসভার হিসাব বলছে, ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সে বা ইউপিএ-এর মধ্যে রয়েছে ২২৬টি আসন। এর মধ্যে এককভাবে কংগ্রেস ২০৬ আসন নিয়ে ইউপিএ-টু সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ১৩৮ আসন নিয়ে বিরোধী আসনে বসেছিল। ১১৭টি আসন নিয়ে যার নেতৃত্বে আছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি।
এমতাবস্থায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার গঠন করলেও বিরোধী দল হিসাবে কংগ্রেস শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে বলেই আশা করা যায়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
[email protected]
