সাম্প্রতিক

নিরাপত্তা সংকট ও উত্তরণের উপায়

আপডেট : ১৫ মে ২০১৪, ২২:১০
দেশের রাজনীতি কোন্ দিকে যাচ্ছে-এমন চিন্তা সম্ভবত: এখন খুব কম নাগরিকই করেন। ক’দিন আগেও রাজনীতি নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে ছিল চুলচেরা বিশ্লেষণ। যদিও তখন দেশে শান্তি ছিল না, স্বস্তি ছিল না। বর্তমানে দেশের নাগরিকরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছে। গুম-খুনই এখন আলোচনার মূল বিষয়। এসব মানবাধিকারের জন্য দুঃসহ এক অবস্থা সৃষ্টি করেছে। দেশে অপহরণ, গুম, খুন এতই ঘটছে যে, বিষয়টি ডাল-ভাতের মতো সস্তা হয়ে গেছে। গত ক’বছর যে হারে অপহরণ আর গুম বেড়েছে তাতে মনে হয় দেশটা যেন অপহরণ আর গুমের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। মনে পড়ে শামসুর রাহমানের কবিতার সেই লাইনটি- ‘এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।’ বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক নেতাই শুধু নন; অন্য অনেকেও আজ বলছেন—গোটা দেশ আজ পরিণত হয়েছে মৃত্যু উপত্যকায়। গুম হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী এমনকি স্কুল ছাত্রও। কারো লাশ মিলছে দিন কয়েক পরে। আর কারো হদিস নেই বছরের পর বছর। ইলিয়াস আলী গুমের দুই বছর পর একই দিন জাতি জানলো সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক অপহরণ হয়েছেন। তবে এ অপহরণ রাতে নয়, দিনদুপুরে। একেবারে প্রকাশ্যে। নারায়ণগঞ্জে ঘটে এ ঘটনা। তার মাত্র কয়েকদিন পর একই এলাকা থেকে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৭ জন অপহূত হন। আবু বকর ফিরে আসলেও অপহরণ রহস্য আজো অনুদঘাটিত। প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, পুলিশের তত্পরতায় কোন কোন অপহূত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অপহরণকারীরা গ্রেফতার হচ্ছে না কেন? আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী- ২০১৩ সালে ৬৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার আর বাকি ৬৩ জনের মধ্যে ছয়জন ছাড়া পেলেও ৫৭ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। প্রকৃত গুম ও খুনের সংখ্যা তো আরো বেশি। আসকের আরেক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী- ২০১০-১৪ সাল পর্যন্ত অপহূত হয়েছেন ২৬৮ জন। তাদের মধ্য থেকে ৪৩ জনের লাশ পাওয়া গেছে, অপহরণের পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে ২৪ জনকে, ১৪ জনকে পুলিশে সোপর্দ করা হয় আর বাকি ১৮৭ জনের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এদিকে চলতি বছরের চার মাসে অপহূত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। বুঝাই যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে গুম আর অপহরণের ঘটনা মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে গেছে। অনেক ঘটনাকে রাজনীতিকীকরণ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় অপহরণ ও গুমের মতো জঘন্যতম অপরাধকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। শীর্ষ মহলের এ ধরনের আচরণের ফলে এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী হোক আর তাদের নাম ভাঙিয়ে হোক আর যেভাবেই হোক- অপহরণের মতো যেসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— ১. দেশের প্রত্যেক নাগরিকই ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ২. দেশে বহুসংখ্যক মানুষ নিষ্ঠুর ও অমানবিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। ৩. দেশে এখন আইনের শাসন আর নেই বললেই চলে। ৪. গুম-অপহরণের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা থাকায় উপযুক্ত বিচার পাওয়া থেকে নাগরিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। গত বছরের শেষ দিকে রাজনৈতিক হানাহানির কারণে অনেক প্রাণ গেছে। সে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ের পরিস্থিতি একেবারে আলাদা। ঢালাওভাবে বলার অবকাশ নেই যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়েই এসব ঘটনা ঘটছে। নির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক দলের কর্মীরাই এখন আর অপহরণ বা গুমের শিকার হচ্ছেন না। এখন গুম ও অপহরণ হচ্ছেন খোদ সরকারি দলের লোকজনও। এ থেকে উত্তরণের উপায় কি? বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আমাদের শাসন প্রক্রিয়ার কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার এবং সেগুলো বাস্তবায়ন। দেশে সুশাসন কায়েম করা দরকার। তবে এই মুহূর্তে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন- দেশকে একটি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনা। যখন কোন দল, প্রতিষ্ঠান, সরকার বা ব্যক্তি নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন তার ক্ষমতা অপব্যবহারের ও দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে পরমবাদ বা কর্তৃত্ববাদ বলা হয়। এমন পরিস্থিতি কাম্য নয় কখনো। স্বাভাবিক মৃতু্যুর গ্যারান্টি কোথায়? আজ স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্যও কি প্রার্থনা করতে হবে? লেখক : এম.ফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন