সড়ক ও নৌদুর্ঘটনা রোধে অবশ্যই ভাবতে হবে

আপডেট : ১৬ মে ২০১৪, ২২:০৮
বাংলাদেশে অপমৃত্যুর উদ্বেগজনক জায়গাটি কোথায়? দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানি। এ জাতীয় অপমৃত্যু হাল সময়ের আলোচিত গুম, খুন আর অপহরণের চেয়েও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। গত ১৫ মে মেঘনা নদীতেই নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে অসংখ্য মানুষের। সেদিন ৩ শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে মাত্র ২১ জনের লাশ উদ্ধার করা গেছে। মাত্র পক্ষকাল আগে পটুয়াখালীর রামনাবাদ নদীতে লঞ্চডুবিতে প্রাণহানি হয়েছিল ১৬ জনের। সেই শোক কাটিয়ে না উঠতেই আবারও শোকগাথা রচিত হলো মেঘনায়। একই দিন টিভি স্ক্রলে দেখছি-‘মেজর হিসেবে প্রশিক্ষণ নেয়া হলো না ডা. সঞ্চিতার’। সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে হানিফ পরিবহনের একটি বাস ও কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। আগামী ২১ মে মেজর হিসেবে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার কথা ছিল তার। ঐ দিনই কুমিল্লায় বাস-এ্যাম্বুলেন্স সংঘর্ষে ৪জন নিহত হয়েছে। দেশের সড়ক ও নদীপথে এখন এভাবে প্রতি নিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ আমৃত্যু পঙ্গুত্ব বরণ করছে। পত্রিকান্তে জানতে পারি, বাংলাদেশে সড়ক, রেল ও নৌ-দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া দুর্ঘটনাজনিত কারণে ফি-বছর নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ। নৌ-পথে বছরে অপমৃত্যুর সংখ্যা অর্ধ সহস্রাধিকের কম নয়। কেবল সড়ক দুর্ঘটনায়ই দেশে গড়ে প্রতিদিন ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটছে। এ হিসাবে মাসে ৯শ’ জন এবং বছরে ১০ হাজার ৮ শ’ জন মারা যাচ্ছে। তবে সরকারি পরিসংখ্যান মতে এ সংখ্যা দিনে ১৬ এবং বছরে ৫ হাজার ৭ শ’ ৬০ জন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। আইন না মানাই হচ্ছে এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। নিয়ম ভেঙে সামনের গাড়িকে ওভারটেক করতে যাওয়া, অদক্ষ ড্রাইভারের হাতে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া, ড্রাইভারের অনুপস্থিতিতে হেলপারের গাড়ি চালানোর উদ্যোগ গ্রহণ, লঞ্চ, ষ্টিমার কিংবা গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা না করেই রাস্তায় ও নদীতে নামানো। মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে নৌযান চালনা নৌ-দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ ক্ষেত্রে সকলকে আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশসহ চলমান প্রশাসন এ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে তাদের ঢেলে সাজাতে হবে অন্যথায় দুর্ঘটনা রোধে নতুন করে র্যাবের মত দুর্ঘটনা রোধে বিশেষ বাহিনী গঠন করতে হবে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে (১) ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন রাস্তায় এবং নৌপথে চলাচল (২) মোবাইল ফোন ব্যবহার (৩) অতিরিক্ত যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন (৪) ট্রাফিক আইন না মানা (৫) নিয়োজিতদের দায়িত্বে অবহেলা (৬) চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা (৭) অরক্ষিত রেললাইন। আর এ সব কারণে প্রতিদিনই ঘটছে হতাহতের ঘটনা। এভাবে প্রতিদিন মানুষ মরছে। দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। প্রশ্ন হলো দেশে স্রেফ গাফিলতি এবং অনিয়মজনিত একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত কেন ঘটছে? অহেতুক মানুষের কেন প্রাণ যাচ্ছে? সংশ্লিষ্ট বিভাগে যারা দায়িত্বে আছেন তারা কেউ কি এসব দেখেন না? প্রতিবাদ হচ্ছে; কারণ উদঘাটিত হচ্ছে, আইনও হচ্ছে; প্রতিকার হচ্ছে না। কিন্তু কেন? দেশে সন্ত্রাস দমনে যদি বিশেষ র্যাব বাহিনী গঠন করা যায়, দুর্ঘটনা রোধে এ জাতীয় বাহিনী নয় কেন? দুর্ঘটনা রোধে সরকারকে অবশ্যই ভাবতে হবে। দুর্ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে; ঘটবেও। কেন তা রোধ করা যাচ্ছে না? আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় দেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারো কাছেই কাম্য নয়। কয়েক মাস আগে খোদ জাতীয় সংসদে অনভিজ্ঞ ও অল্পবয়স্ক হেলপার বাস-মিনিবাস চালানোর ফলে দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানালেন যোগাযোগমন্ত্রী। তিনি বলেন গাড়ির সংখ্যা যে হারে বাড়ছে সে হারে দক্ষ চালক বাড়ছে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক অমূল্য প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক, শিশু, নববধূ-বরসহ পুরো বরযাত্রী, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা এমনকি সাবেক মন্ত্রীও এ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নিহত হওয়ার খবর আমরা পত্রিকার পাতায় প্রত্যক্ষ করেছি। যার একটিও সহজভাবে মেনে নেয়া যায় না। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর ঘটনা যেমন আমাদের ব্যথিত করে, তেমনিভাবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভবও আমাদের মর্মাহত ও স্তম্ভিত করে। আমরা এর আগেও বহুবার লক্ষ্য করেছি, সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিহতের ঘনিষ্ঠজন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার কিছু লোক রাস্তায় নেমে রাস্তা অবরোধ, হামলা, গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে এক বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করেন। এতে কার কী উপকার হচ্ছে তা আমাদের জানা নেই। তবে এর ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ ও নির্দোষ জনগণ যারা কোনোভাবেই এ দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। যে কোনো হত্যার বিচার আমরা চাই, তবে কোনো হত্যা বা দুর্ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়াক তা আমরা চাই না। পরিশেষে বলবো, সকল দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হউক। আইন না মানার কারণেই একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘচছে। নৌ, রেল ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আমরা আশা করি। লেখক : সাংবাদিক। ই-মেইল[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন