অবশেষে দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়াছে। নিশ্চিত হইয়া গিয়াছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর নেতৃত্বাধীন জোটের বিশাল বিজয়। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ২৭২টি আসন। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি একাই সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াইতে চলিয়াছে। আর তাহাদের জোটগত আসনসংখ্যা ইতিমধ্যে ৩৩৯টিতে পৌঁছিয়াছে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)-এর এই বিজয় অপ্রত্যাশিত না হইলেও ভোটের ফলাফল সকল নির্বাচনী পূর্বাভাসকেও হার মানাইয়াছে। ভারতীয় রাজনীতিতে কোনো দলের এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের বিষয়টিও গত তিন দশকের মধ্যে ইহাই প্রথম। এক টুইটার বার্তায় দেশটির ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলিয়াছেন যে, এই জয় ভারতের। শুভদিন আসিতেছে। আর বিজেপি ইহাকে ‘জনতার জয়’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। অন্যদিকে কংগ্রেস পরাজয় মানিয়া লইয়াছে। সেই সাথে দলের দুই শীর্ষ নেতা সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী ইহার দায় নিজেদের কাঁধে তুলিয়া লইয়াছেন স্বেচ্ছায়। নির্বাচনে ব্যাপক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি হইয়াছে। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং ভোট কেন্দ্র দখলের ঘটনাও ঘটিয়াছে কোথাও কোথাও। কিন্তু শত কোটি মানুষের বিশাল এই দেশটিতে নির্বাচনের সমগ্র প্রক্রিয়াটি যেইভাবে সম্পন্ন হইয়াছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলি যেইভাবে ফলাফল মানিয়া লইয়াছে—তাহা অনেকের নিকট স্বপ্নের মতোই মনে হইতে পারে।
ভারতবাসীর তো বটেই, সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টিও নিবদ্ধ ছিল বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দীর্ঘ নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ফলাফলের উপর। কারণ সকল বিচারেই বিশ্ববাসীর জন্য ইহা যে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা—তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। লক্ষণীয় যে, ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার ৫৪৩টি আসনে এই নির্বাচন শুরু হইয়াছিল ৭ই এপ্রিল। মোট ৯ দফায় এই নির্বাচন শেষ হয় ১২ই মে। ভারতের ২৯টি রাজ্য আর ৭টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়িয়া অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল ৮০ কোটি। তন্মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোটার তাহাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করিয়াছেন। ইহা সুবিদিত যে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে স্বচ্ছ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নাই। আর সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করিতে গিয়া তৃতীয় বিশ্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশগুলিতে যেইখানে যুগ যুগ ধরিয়া তুলকালাম কাণ্ড হইতেছে, কোথাও-বা বহিয়া যাইতেছে রক্তবন্যা—সেইখানে গত অর্ধশতকেরও অধিক সময় ধরিয়া বহুজাতিক, বহুভাষিক ভারত সফলভাবে এই বিশাল নির্বাচনীযজ্ঞ সম্পন্ন করিয়া আসিতেছে। ইহার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা না করিয়া উপায় কী! বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও ঠিক তাহাই করিয়াছেন। ‘ইতিহাসের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের জন্য ভারতকে অভিনন্দন জানাইয়া তিনি বলিয়াছেন যে, দেশটি বিশ্বের বাদবাকি অংশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করিল। এই মন্তব্যের যথার্থতা লইয়া দ্বিমত প্রকাশের কোনো অবকাশ নাই। সন্দেহ নাই যে, এই নির্বাচনে মূলত জয় হইয়াছে গণতন্ত্রের।
সমাজের তলা হইতে উঠিয়া আসিয়া বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদী যেইভাবে ভারত জয় করিলেন তাহা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। ইহার পিছনে কী কী বিষয় কাজ করিয়াছে—তাহা লইয়া নানা জল্পনা-কল্পনা চলিতেছে। চলিবে আরও কিছুদিন। তবে নির্বাচনী এই উচ্ছ্বাস অচিরেই থিতু হইয়া আসিবে। আর সম্মুখে পর্বতের মতো মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইবে বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও দুর্নীতিসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত ভারতের হবু প্রধানমন্ত্রী তাহার দেশের জনগণকে যেই শুভদিনের স্বপ্ন দেখাইয়াছেন—তাহাকে বাস্তবে রূপায়িত করিতে হইবে। ইহাই হইল নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা। ভারতের নূতন নেতা এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবেন—ইহাই আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা। তাত্পর্যপূর্ণ এই বিজয়ের জন্য বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এবং বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রাথী নরেন্দ্র মোদীকে আমরা অভিনন্দন জানাই।
