সম্প্রতি আন্তঃনগর ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে, পুড়িয়া গিয়াছে তিনটি কামরা, অবশ্য তাহাতে হতাহত হয় নাই কেহ। গত সপ্তাহে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন অতিক্রম করিবার পর হোটেল র্যাডিসনের পিছনে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। ট্রেনের খাবারের বগির রান্নার চুলা হইতে আগুনের সূত্রপাত হয় বলিয়া প্রাথমিকভাবে জানা যায়। সিলেট হইতে সকাল ৭টা ২০ মিনিটে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। দুপুর সোয়া ১টার দিকে বিমানবন্দর রেলস্টেশন ছাড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনের কাছাকাছি আসিবার পর দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঐ সময় খাবার গাড়িতে কর্মরত সদস্যরা আগুন নিভাইবার চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হন। সংবাদ হইতে অবশ্য জানা যায় নাই যে, ট্রেনটিতে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল কিনা। এই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সাধারণত ট্রেনগুলিতে থাকে না। অগ্নি নির্বাপনের জন্য ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিতে হইয়াছে। তাহারা পৌঁছাইবার পূর্বে পুড়িয়া গিয়াছে খাবারের বগি ও দুইটি যাত্রী কামরা। তবে ঘটনাটি শহরের মধ্যে না ঘটিয়া গ্রামাঞ্চলে ঘটিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িতে পারিতো। বিশেষত ফায়ার সার্ভিসের সুবিধা পাইতে অনেক বিলম্ব হইতো এবং আরও কয়েকটি কামরা আগুনে পুড়িয়া যাইতে পারিতো, হতাহতের ঘটনাও ঘটিতে পারিতো।
অগ্নিকাণ্ডের পরে রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিয়াছেন। এই ঘটনার পর দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে। এই দুই কমিটি রেলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণ শনাক্ত করিয়া এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার কথা। এই কমিটি হয়তো কেবলই এই ঘটনার তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকিয়া তাহার দায়িত্ব পালন করিবে। কিন্তু সার্বিকভাবে রেলপথ পরিষেবার উন্নয়ন এবং রেলগাড়ির নিরাপত্তাজনিত প্রস্তুতি লইয়া বহু কাজ বাকি থাকিয়া যাইবে। পরখ করিতে হইবে যে, খাবার ঘরে যেই চুলা ও জ্বালানি-ব্যবস্থা ব্যবহূত হয়, তাহা কতটুকু নিরাপদ? বহু মানুষের দেশে রেলপথকে অধিক অগ্রাধিকার দিতে হইবে। রেলব্যবস্থা একই সঙ্গে বহু যাত্রীকে পরিবহন করিতে সক্ষম। এইদিকে সড়কপথে যানজট ও দুর্ঘটনাজনিত ঝুঁকির আধিক্যের কারণে রেলপথের উপর যাত্রীদের আস্থা ক্রমশই বাড়িতেছে। কিন্তু সেই আস্থার প্রতিদান সেবাপ্রদানকারী সংস্থা ঠিকঠাকমতো দিতে পারিতেছে না। আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট ক্রয় করিতে কালোবাজারীর দ্বারস্থ হইতে হয় যাত্রীদের। টিকেট না পাইয়া ফেরত যাইতে হয় বহু যাত্রীকে। অনলাইনে টিকেট ক্রয়ের সুযোগ নাই, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টিকেট পাওয়া যেন সোনার হরিণ। তাহাছাড়া প্রয়োগের তুলনায় দেশে ট্রেনের সংখ্যাও অপ্রতুল। বিশেষত চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যাত্রীর সংখ্যা বহু বাড়িয়াছে, কিন্তু সর্বশেষ সুবর্ণ এক্সপ্রেস চালু হইয়াছে তাহাও কয়েক দশক হইয়া গেল। আন্তঃনগর ট্রেন, কিন্তু উহার বাথরুমগুলিতে যাওয়া যায় না। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা পৃথিবীর বহু দেশে ভ্রমণ করিয়া থাকেন, কিন্তু ঐসব দেশের পরিষেবাগুলি অনুসরণ করিতে তাহাদের উদ্যোগ নাই। কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করিলেও নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে তাহা অচিরেই নিজস্ব সৌন্দর্য হারাইয়া বসে। পৃথিবীর যেইকোনো বড় শহরে রেলগাড়ি হইলো নগরবাসীর সবচাইতে আস্থার বাহন। শহরের অভ্যন্তরে পাতালরেল, উড়ালরেল, ভূমিরেল, কত রকমের রেলব্যবস্থা! অথচ আমাদের দেশে শহরের অভ্যন্তরে কোনোরকম রেলপরিবহন ব্যবস্থা নাই। আন্তঃনগর অথবা লোকাল ট্রেনগুলি শহরগুলির মধ্যে যাত্রীপরিবহন করিলেও তাহার পরিষেবার মান অতি সাধারণ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের তুলনায়ও তাহা বহু পিছাইয়া রহিয়াছে। ইহার নিরাপত্তাব্যবস্থাও সুসংহত নহে। ফলে গত মঙ্গলবারের অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটিতেছে। অত্যন্ত জনবহুল দেশে রেলের উন্নয়নে মনোযোগ না দিলে যাত্রীদের হয়রানি ও যন্ত্রণাই কেবল বাড়িবে, দৈনন্দিন যাতায়াতের কাম্য স্বস্তিও হইবে সুদূরপরাহত।
