বাস্তবের পূর্বাভাসকে কেউ কেউ অনেক সময় মেনে নিতে পারেন না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক অথবা সমাজের কোনো কোনো অংশের পছন্দ-অপছন্দকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে সত্যের নির্মোহ ইঙ্গিতকে এড়িয়ে যান। যা ঘটেছে, ঘটতে পারে, তা না দেখার ভান করে কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছার সমর্থনে যুক্তি দেখাতে থাকেন। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপির জয়ের সম্ভাবনাকে, ভোটের আগে, ভোটের পরে সঙ্কুচিত চোখ দেখা হয়েছে। তবে আমার মতো সাধারণ সাংবাদিক পাঁচ মাস জুড়ে পশ্চিম, পূর্ব ও উত্তর ভারত সফর করতে করতে বারবার একটা কথাই বলার চেষ্টা করেছি, দেশজুড়ে মোদী হাওয়া বইছে। ঝড়ও উঠতে পারে। অনেকেই সংশয় বাঁকা চোখে তাকিয়েছেন। বলেছেন, ব্রুটাস শেষ পর্যন্ত তুমিও! না, শেক্সপিরিয়ান ট্রাজেডির অন্যতম খলনায়ক হওয়ার চেষ্টা করিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নরেন্দ্র ভাই মোদীর অক্লান্ত পরিশ্রম, তাঁর জনসমাবেশে উপচে পড়া ভিড়, অতি বিজ্ঞাপিত হাসি এবং আত্মপ্রত্যয় দেখে মনে হয়েছে, বাউল বাতাস বইছে, ঝড় আসন্ন। অবশেষে ঝড়ের চেয়ে জোরালো তুফান উঠলো। আর তাতে প্রায় সমূলে উপড়ে গেল শতবর্ষের কংগ্রেসি বটবৃক্ষ। কেবল কংগ্রেস নয়, বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের আকাঙ্ক্ষাও তছনছ হয়ে গেল। ব্যতিক্রম শুধু পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস আর তামিলনাড়ুর এডিএমকে। দুটি দল যথাক্রমে পেয়েছে ৩৪ আর ৩৭ আসন। এবার সম্ভবত তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী আর জয়ললিতাকে হাতে হাত রেখে প্রধান বিরোধীদের ভূমিকা পালন করতে হবে। বিজেপি নিজেও এতো বড়ো সাফল্যের হিসেব কষেনি। দিন কয়েক আগে, বাংলার একজন বিজেপি নেতা আমাকে বলেছিলেন, আপনিতো মোদীকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েই দিলেন। বললাম, আমি বানাবার কে? বানাচ্ছে দমকা হাওয়া। ৩ দিন আগে একজন বিদেশি বন্ধুকে বলেছি, বিজেপি একাই ম্যাজিক ফিগার। ২৭২ পেরিয়ে যাবে। এখন দেখছি এই হিসেবও ভুল। ভারতীয় জনতা পার্টি ২৮৩ আসনে জনরায় পেয়ে গেছে। সব শরিক দলকে নিয়ে তাতে এনডিএর আসন সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৩৩৮। সর্বশেষ ফল এখনও জানা যায়নি। তবুও, সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-র ৬৫ অতিক্রম করবে কিনা সন্দেহ আছে। স্বাধীনতার পর কংগ্রেস এরকম ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়নি। আসন সংখ্যা কুল্লে ৪৪। রাহুলের ব্রিগেড কোথায় গেল, হদিস নেই, রাহুল নিজেই হেরে গেছেন। আর তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী নরেন্দ্র ভাই মোদী গুজরাটের ভদোদারায় রেকর্ড ভোটের জয়ের ব্যবধান ৫ লক্ষ ৭০ হাজার। বেনারসেও তাঁর মস্তকে জয়ের মুকুট। প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাঁর ভোটের তফাত্ ৬০ হাজার।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, দেশজুড়ে এই জয় কার? কৃতিত্ব নরেন্দ্র মোদীর, না বিজেপির। আলংকারিক ভাষায় আমরা বলব, এই জয়ের প্রধান কারিগর ভারতীয় জনতা, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। প্রবল সঙ্কটেও মাথা নত করেনি। চিন-ভারত যুদ্ধ, ’৭১-এ বাংলাদেশের সমর্থনে পাক হামলার প্রতিরোধ, ’৭৫-এর জরুরি অবস্থা, ’৮৩ সালে শ্রীমতী গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, কিছুদিনের জন্য কংগ্রেস শাসনের অবসান, ’৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর কর-সেবকদের ধাক্কায় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংস-এরকম অসংখ্য ঘটনার পরেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দিশা হারায়নি। লোকতন্ত্র তার বিজয়ী মুখ নিয়ে জেগে রইল। এই ভোটও প্রমাণ করলো, জয় তাঁর নিশ্চিত এবং সুদূরপ্রসারী। মোদী ক্যারিশমাকে অস্বীকার করছি না। ভারতের যুবশক্তি তাঁর ভাষণে, তাঁর আশ্বাসে ভরসা খুঁজে পেয়েছে। ভোটের পরিশ্রমেও তিনি বেনজির। একাই তাঁর যাত্রাপথ ৩ লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি। সভা করেছেন ৪৪০টি। এর আগে কোনো প্রার্থীকে, কোনো দলের নেতাকে এভাবে ছুটতে দেখা যায়নি। কেউ কেউ বলেছেন, অর্থ নাকি রসদ জুগিয়েছে। বিষয়টির এতো সরলীকরণ সঙ্গত নয়। মানুষের ভাবাবেগ আর ইচ্ছা কি এতই হালকা, টাকা ফেললেই ঢলে পড়ে? মনে হয় না। মানুষ ভোট বাক্সে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রয়োগ করে। নির্বাচিতকে ক্ষমতায় বসায় না, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। ভারতের ১৬তম সাধারণ নির্বাচনে ঝড় তুলেছেন মোদী। সায় দিয়েছে জনতা। জাত-পাত, আঞ্চলিকতা এবং তথাকথিত ভোট বাক্সে সর্বনাশা অঙ্কে হানা দিয়েছেন। তাঁকে সমর্থন করেছে জনশক্তি। এভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে ভোটের রায়কে খতিয়ে দেখলে, বিচার করলে গণতন্ত্রের শক্তি বাড়ে। মোদী আর তাঁর দল এখানে কারিগরের ভূমিকায় অবতীর্ণ। হ্যাঁ, তিনি প্রধান ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু তাঁর আসন্ন শাসনের ইমারত গড়তে তাঁকে সাহায্য করেছে সমাজের সম্মিলিত শক্তি, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। তাঁরা কেন্দ্রে মিলিজুলি সরকার চায়নি। দাবি করেছে সরকারের স্থায়িত্ব।
মোদী এবং তাঁর দলের রাজনৈতিক চেহারা যাই হোক না কেন, তাঁদের অপ্রত্যাশিত জয় প্রমাণ করলো, দলীয় অথবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাফল্যে ভেসে উঠছে জনের স্বপ্ন। স্বপ্নের বাস্তব। ভোটের ফলাফল ঘোষণা প্রায় শেষ পর্বে, কাঙ্ক্ষিত লাড্ডু মুখে দেবার আগেই, প্রেসমিট করে অত্যন্ত সতর্ক ভাষায় বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিং বলেছেন, দেশের সব শ্রেণীর, সব ভাষার, সব সম্প্রদায়ের মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। এই জয় ভারতের সাধারণ মানুষের। এই জয়ের উল্লাসে ভেদাভেদের রাজনীতি যেন প্রশ্রয় না পায়। এই জয় যেন মুছে দেয় জাত-পাত আর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তফাত্।
রাজনাথ সিং-এর এই বিবৃতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে মুহাম্মদ আলী জিন্নার সেই ভাষণকে-পাকিস্তান সব সম্প্রদায়ের, সব জাতির দেশ। মোদী এখনো নিশ্চুপ। জয়ের আনন্দে তিনি স্তম্ভিত, বিস্মিত। ছুটে গেছেন মায়ের কাছে, বাড়িতে। টিভিতে বারবার ভেসে উঠছে বৃদ্ধা জননী আশীর্বাদ করছেন তাঁর গৃহত্যাগী ছেলেকে। মা-ছেলের সম্পর্কের এ এক চিরন্তন ছবি। এই ছবি থেকে, রাজনাথ সিং-এর ভাষণ থেকে বেরিয়ে আসছে আরেক ভবিষ্যত্ চিত্র। মঙ্গলবোধ আর সম্ভাব্য সুশাসনের। তাঁর দলের অভিমুখও পরিষ্কার। সাম্প্রদায়িকতার অতি চেনা ছাপ এবার তাঁরা মুছে ফেলতে চাইবেন। প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের লেনদেনে ভারতের বিরুদ্ধে দাদাগিরির যে অভিযোগ আছে, সেটাও আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলবেন। ভোট সভায়, দিনকয়েক আগেই মোদী বলেছেন, মিলিয়ে দেবো এক নদীর সঙ্গে অন্য নদীকে। আমাদেরও বিনীত প্রার্থনা, ভোটের আগের প্রতিশ্রুতি সত্য হোক, স্রোতের সঙ্গে মিশে যাক স্রোত।
লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা
