চীনের একটি প্রবাদ আছে, “তুমি যদি শত বছরের পরিকল্পনা কর তবে গাছ লাগাও, আর যদি হাজার বছরের পরিকল্পনা কর তবে মানুষ গড়ো।” চীনের এই শিক্ষা পরিকল্পনাই চীনকে বিশ্বের বুকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার যত নিত্যনতুন ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত তার মূল কারণ এই অঞ্চলে বিশ্বশক্তির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থা মোকাবেলা একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি দিয়েই সম্ভব। এই সত্য আমরা উপলব্ধি করেছি বটে তবে ততক্ষণে বিপরীত শক্তি আমাদের সম্মুখ পথ রুদ্ধ করার সকল শক্তি অর্জন করে বসে আছে। এখন আমরা একটি পথ বের করি আর তারা তা মূলেই ধ্বংস করে মিটিমিটি হাসে। চীন শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পক্ষান্তরে আমরা কী করছি?
বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের অতীব সম্ভাবনাময়ী একটি দেশ। এর মাটিতে ফলে সোনালী ফসল। মাটির নিচে স্রষ্টার ঢেলে দেয়া খনিজ সম্পদে ভরপুর। এখানকার মেধাশক্তিও ধারালো অস্ত্রকে ছাড়িয়ে যায়। এতদসত্ত্বেও হতাশার অনেক কারণ আছে। বিশেষত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে ভয়ানক এক হতাশার চিত্র ভেসে আসে চোখের সামনে। মনে হয় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাওয়া একটি জাতিকে অঙ্কুরেই নি:শেষ করে দেয়ার খেলায় মেতে উঠেছে কেউ। ইদানিং সব ধরনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। বিসিএস থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাই এই মহল এর কালো ছায়া থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। তদন্ত কমিটি গঠনই হচ্ছে শুধু। এর কোন রেজাল্ট নেই। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কেউ পরীক্ষার আগের দিন প্রশ্ন পেয়ে রাতারাতি ভালো রেজাল্ট করে ফেলবে, আর আমরা কেন সারা বছর এত কষ্ট করেও ভালো রেজাল্ট করতে পারবো না? প্রশ্ন ফাঁস এখন একটা মামুলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাবি’র প্রশ্নই যদি ফাঁস হয়ে যায় তখন আর কী বাকী থাকলো? দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের শিক্ষাগুরুগণই যদি নৈতিকতাকে নির্বাসনে পাঠান তবে তদন্ত কমিটি কাদের দিয়ে হবে?
১৮/৪/২০১৪ ইং তারিখে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাটি আগে একবার জালিয়াতির অভিযোগে বাতিল হওয়ার পর পুনঃঅনুষ্ঠিত হলো। হায় আফসোস! অবস্থা আগের চাইতে নাজেহাল। হলের দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষকও উত্তরপত্রের কপি সরবরাহের দায়ে এক্সপেল হয়েছে। প্রার্থীদের কথা বাদই দিলাম। যদি প্রশ্ন ফাঁসই না হবে তবে সাজানো উত্তর পাওয়া কি করে সম্ভব? নকল করার সুবিধার্থে পুরুষ মহিলা সেজে পরীক্ষা দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অবাক কাণ্ড! তবে পরীক্ষা কেন্দ্রের মেইন গেটে চেকিং এ নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর কী কাজ? তারা তো তাদের দায়িত্ব পালন করেইনি, উল্টো পরীক্ষার হলে নিরপরাধ প্রার্থীদের অযথা চেক করে তাদের অনেক সময় নষ্ট করার মত ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ সরকারি ও প্রাইভেট খাতে টাকা ছাড়া চাকরি সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। কোন কোন প্রাইভেট ব্যাংকে সার্কুলার ছাড়াই টাকার বিনিময়ে প্রয়োজনীয় লোক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে গরীব মেধাবী প্রার্থীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চাকরির জন্য নির্ধারিত লিখিত পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখে ভাইভায় ফার্স্ট হয়েও তাদের চাকরি জোটে না। প্রায় প্রতিদিনের পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি লিখতে দেখা যায় অসংখ্য মেধাবী প্রার্থীকে, যাদের সরকারি চাকরির জন্য নির্ধারিত বয়স সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছে। মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সরকারি চাকরির জন্য বেঁধে দেয়া বয়স সীমা অতিক্রমের শেষ বছরও যাদের চাকরি হচ্ছে না তারা যাবে কোথায়? কোন উপায় না পেয়ে এই যুবকদের কিছু অংশ অন্যায়ের সাথে জড়িয়ে পড়ে। মনে হচ্ছে গরীবদের মেধাবী হতে নেই। মেধাবী হওয়াই অপরাধ। ভাবখানা যেন এমন, ভিটেবাড়ি কিছু থাকলে তা বেচে এনে মামাদের হাতে দাও, চাকরি নাও। নচেত্ পথে পথে ঘুুরো। না খেয়ে মরো। উেকাচ দিতে পারাটাই এখন বড় যোগ্যতা। যদি তাই হয় তবে আবেদন ফরমে একটি কলাম রাখা হোক এই শিরোনামে যে, ‘কত টাকা ঘুষ দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন?’
যেন জাতিকে তার অস্তিত্বের খোরাক তথা মেধা শূন্য করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা বাদ দিয়ে দিন দিন ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে আমরা অবিলম্বে পরিত্রাণ চাই।
লেখক :গবেষক
[email protected]
