মাধব রায়
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা)
ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
ক্ষমতা
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই নীলকান্তবাবু সবাইকে নিয়ে বের হলেন, মর্নিং ওয়াক করবেন। রাস্তার বাউন্ডারি ওয়ালে কিছু পোস্টার লাগানো, উপজেলা নির্বাচনের পোস্টার। অণু বললো— বাবা, মানুষ ইলেকশনে কেন দাঁড়ায় ?
ক্ষমতায় যেতে। বললেন নীলকান্তবাবু। ক্ষমতা সবাই ভালোবাসে। আচ্ছা তোরা কি জানিস পদার্থবিজ্ঞানেও ক্ষমতা আছে ?
না, বললো আকাশ, পদার্থবিজ্ঞান কি ক্ষমতায় যেতে চায় না কি ?
না, পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষমতা আর রাষ্ট্রের ক্ষমতা এক নয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা হলো রাষ্ট্র চালাবার দায়িত্ব। আর পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষমতা হলো কাজ করার হার।
বুঝিয়ে বলো মামা। চন্দ্রা বললো।
কাজ করার হার হলো,প্রতি সেকেন্ডে কী পরিমাণ কাজ করতে পারে তার হিসাব। কাজ তো বুঝেছিস ?
হ্যাঁ, বললো রেখা। ঐ যে বললে বল প্রয়োগে কোনো বস্তু সরে গেলে কাজ হয়।
ঠিক তাই, বললেন নীলকান্তবাবু। কোনো ব্যক্তি বা কোনো যন্ত্র এক সেকেন্ডে যে পরিমাণ কাজ করতে পারে, সেটি তার ক্ষমতা। যে ব্যক্তি বা যে যন্ত্র কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারে, তার ক্ষমতা বেশি।
যেমন ধর, তুই স্কুলে যাবি। এক রিক্সাচালক তোকে বাসা থেকে বিশ মিনিটে স্কুলে পৌঁছালো,আরেকদিন অন্য রিক্সাচালক তোকে পৌঁছাতে ত্রিশ মিনিট লাগালো। তাহলে যে রিক্সাচালক ত্রিশ মিনিটে পৌঁছালো, তাঁর ক্ষমতা কম। একই দূরত্ব একজন কম সময়ে আরেকজন বেশি সময়ে পৌঁছালো। যার সময় কম লাগলো তাঁর ক্ষমতা বেশি। বুঝলি ?
কিছুটা বুঝেছি। বললো রেখা।
মানে হলো, তাড়াতাড়ি কাজ করার সাথে ক্ষমতা ব্যাপারটি জড়িত। এর সাথে আবার শক্তি ব্যাপারটাও জড়িত। শক্তি কী, মনে আছে তো ?
শক্তি তো সেদিন তুমি বলেছো, বললো অণু— বল বা ফোর্সই তো শক্তি।
না। বললেন নীলকান্তবাবু। অনেকেই তোর মতো ভুল করে বলে বল আর শক্তি এক।
রেখা বললো— কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম তো বললেন— আমরা শক্তি আমরা বল, আমরা ছাত্রদল।
নীলকান্তবাবু বললেন— ও হ্যাঁ, আজ তো ১১ জৈষ্ঠ্য, কবি নজরুলের জন্মদিন। ঠিকই বলেছিস, নজরুলের কবিতা— আমরা শক্তি আমরা বল আমরা ছাত্রদল, মোদের চোখে বিশ্ববাসীর স্বপ্ন দেখা হোক সফল। কিন্তু সেটি কবিতায়। নজরুল বুঝিয়েছেন, বল মানে মনোবল, আর শক্তি মানে মানসিক শক্তি। এই দুটো এক, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে বল আর শক্তি ভিন্ন। তবে কাজ আর শক্তি এক। কাজ করার মোট সামর্থ্যই হলো শক্তি।
কথা বলতে বলতে তারা সবাই মাঠে এসে উপস্থিত। নীলকান্তবাবু বললেন, একটা কাজ করা যাক। তোরা সবাই মাঠের চারপাশ ঘুরে আয় দৌড়ে।
সবাই প্রস্তুতি নিলো। নীলকান্তবাবু মোবাইল ফোনের স্টপওয়াচ অপশনের বাটন টিপে রেডি হলেন। বললেন ওয়ানটুথ্রি, সবাই দৌড় শুরু করলো। তিনি দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন। দেখতে দেখতেই আকাশ দৌঁড়ে এসে তাঁকে ছুঁয়ে দিলো। তিনি তাড়াতাড়ি স্টপওয়াচ দেখলেন পাঁচ মিনিট দশ সেকেন্ড। এরপর রেখা এলো ছয় মিনিটে। সবাই একে একে এসে তাঁকে ছুঁতে লাগলো আর হাঁপাতে থাকলো। হঠাত্ চেয়ে দেখলেন বিন্দু আসেনি। সে দৌঁড়ে মাঠের অর্ধেক এসে বসে রয়েছে। তিনি বললেন বিন্দুকে ধরে ধরে নিয়ে আয়। ওর আর দৌড়াবার সামর্থ্য নেই। সবার আগে দৌড়ে এসেছে আকাশ। ওর ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। আমি হিসাব করে বলে দিতে পারবো কার ক্ষমতা কত ওয়াট।
আমারটা আগে বলো— বললো রেখা।
নীলকান্তবাবু বললেন— বলবো, যদি তোর ভর কত বলতে পারিস।
রেখা বললো— আমি সেদিন আমাদের ওয়েট মেশিনে মেপেছি, সাতাশ কেজি।
ভেরিগুড। বললেন নীলকান্তবাবু। তাহলে তোর ক্ষমতা হবে, (মোবাইলের ক্যালকুলেটরে হিসাব করছেন তিনি) দুইশ চুরানব্বই ওয়াট।
কীভাবে হিসাব করলে মামা ? বললো আকাশ।
নীলকান্তবাবু বললেন, ক্ষমতা হলো কাজ ডিভাইডেড বাই সময়। কাজ হলো বল এবং সরণের গুণফল। রেখার ভর হলো সাতাশ কেজি, অভিকর্ষজ ত্বরণ জি, নাইন পয়েন্ট এইট দিয়ে গুণ করলে হলো তার ওজন। মানে বল। আর মাঠের চারিদিক হলো চারশ মিটার, গুণ দিলাম। একে ছয় মিনিট মানে তিনশ ষাট সেকেন্ড সময় দিয়ে ভাগ করলেই ক্ষমতা দুইশ চুরানব্বই ওয়াট হলো।
কিন্তু বিন্দু যে আসতে পারলোই না। তার ক্ষমতা কত ?
তার ক্ষমতা তো হিসাব করিনি, তবে সে তার সামর্থ্য হারিয়ে ফেললো। তার শক্তিও হারিয়ে ফললো। যে যতবার মাঠ ঘুরতে পারবে তার কাজের পরিমাণ তত বেশি, শক্তিও তত বেশি। মানে কাজ করার সামর্থ্যই হলো শক্তি। শক্তি আর কাজ একই। কাজের এককও জুল, শক্তির এককও জুল। আর ক্ষমতার একক ওয়াট, এক সেকেন্ডে এক জুল কাজ করতে পারলে ক্ষমতা এক ওয়াট।
আর দুই সেকেন্ডে দুই জুল কাজ করলে ? চন্দ্রা বললো।
রেখা বললো, দুই ওয়াট।
না, বললো আকাশ। তাহলেও এক ওয়াট। সে ফাঁকটা বুঝতে পেরেছে। কাজকে সময় দিয়ে ভাগ করতে হয়। তাহলে দুইকে দুই দিয়ে ভাগ করলে তো এক ওয়াট।
ওয়াট কেন হলো মামা ? বললো চন্দ্রা।
হ্যাঁ, স্কটল্যান্ডের বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটের নামানুসারে ক্ষমতার একক ওয়াট।
বলতে বলতেই বিন্দু এসে হাজির। তাকে হাতে ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে এসেছে অণু।
নীলকান্তবাবু বললেন, চলো আজ বাসায় ফেরা যাক। বিন্দুর সামর্থ্য বা শক্তি নিয়ে আরেকদিন গল্প করা যাবে।
