[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

বিজেপির বিজয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সম্পর্ক

আপডেট : ১৭ মে ২০১৪, ২২:১১
ভারতের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মতামত জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হলো। নজিরবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিজেপি ভারতের লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হলো। নয়াদিল্লী থেকে অনু আনন্দের প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায় দিল্লীর উপকণ্ঠে বিজেপি পদ্মফুল অংকিত দুটি বিরাটকায় হস্তির সমাহার ঘটিয়ে দলটির নিরংকুশ বিজয় উদ্যাপন করছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক নির্বাচন ভারতের লোকসভাকে ঘিরে বিশ্বময় বিজেপির যে বিজয় ডংকা এতদিন সরব ছিল, তা আজ নিখিল ভারতের সর্বত্র বিজেপির বিজয় কেতনে পত্ পত্ শব্দে নিনাদিত হচ্ছে। বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের ক্যারিশমা ও তাঁর জন-সম্পৃক্ত বিষয়ে প্রচারণা কৌশল বিজেপির বিজয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে, এটা প্রথম থেকে আঁচ করা গেলেও দলটি যে এত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, বা পেতে পারে, এমন অবস্থা কেউ ঠাওর করেনি। গান্ধীর মৃত্যুর পর তাঁর ইমেজে সওয়ার হয়ে ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ৪১৫ আসনে জয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর এ পর্যন্ত আর কোন রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি। এদিক থেকে রেকর্ড গড়লো বিজেপি। লোকসভার মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি জোট ৩৩৯ আসনে জয়ী হলেও কংগ্রেস জোট কেবল ৫৯ আসনে জয়ী হয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে বিপুল বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। এটা এক অবাক করার মত ঘটনা যে, ভারতের কেন্দ্রে সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ২৭২ আসনের চেয়েও ১১ আসন বেশি পেয়ে বিজেপি এককভাবে ২৮৩ আসনে জয়লাভ করেছে। অনু আনন্দ তরুণী, বৃদ্ধা ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিজেপির ব্যাপক সমর্থনে যারপরনাই অবাক হয়েছেন। ভারতের এনডিটিভি বিজেপির অর্জনকে বিপুল বিজয় (landslide victory) হিসেবে অভিহিত করেছে। নয়াদিল্লী থেকে বিবিসি এক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে নির্বাচনে বিজয় অর্জনের মাত্রা বিজেপির প্রত্যাশারও বাইরে (beyond BJP’s expectation)। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠে, বিজেপির এমন অভূতপূর্ব বিজয়ের নির্ধারক কি? লন্ডন মেয়রের উপদেষ্টা ডক্টর গোরারড লিয়নস এক টুইটার মন্তব্যে বলেন, ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতির ভয়ংকর কঠিন সময়ে বিজেপির বিজয় এক অভূতপূর্ব ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা (exciting event)। আমরা বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নববিজয়ী বিজেপি এবং এর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাই। তবে বিজেপির জয়ের পর দিল্লীর মসনদে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির শক্তিশালী আসন গ্রহণ নিয়ে পূর্ব থেকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে যে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা বিরাজ করছিল, তার একটি পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন এ মুহূর্তে। দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ভারত একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে। এখন নতুন নেতৃত্বে ভারতের সাথে অত্রাঞ্চলের দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি কি হবে তার স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। মূলত বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদির আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইমেজ তেমন স্বচ্ছ নয়। সেই ভয়াবহ গুজরাট দাঙ্গার গ্লানি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নরেন্দ্র মোদির ইমেজ এত বেশি ক্ষুণ্ন করেছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ভিসা বাতিল করেছিল। গত মাসাধিককালের নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন জনসভায় মোদি যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার ঘৃণা ছড়িয়ে গিয়েছেন, তাতে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ বিশেষত বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বেশ উদ্বিগ্নতায় ভুগবে, এটাই স্বাভাবিক। অতএব, আন্তর্জাতিক অনুচ্চ ইমেজ সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় ভোটারদের হূদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছেন ৬০ বছর ধরে কংগ্রেসের বিভিন্ন ব্যর্থতার চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরে। বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, নিম্নগামী অর্থনীতি, অধোগামী প্রবৃদ্ধি প্রভৃতি মৌলিক অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে বিজেপি ব্যবহার করেছে প্রচারণা কৌশলে। যে সমস্ত ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে ওবামার প্রচারাভিযানে প্রযুক্তির ব্যবহারে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছিলো, তাঁদেরকে নরেন্দ্র মোদি বিজেপির প্রচারকার্যে শতভাগ ব্যবহার করে ভারতের আনাচে-কানাচে প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের দুর্নীতি, অদক্ষ শাসন, ব্যর্থতাগুলোকে উপস্থাপিত করে নির্বাচনী রায় বিজেপির পক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছেন। নিখিল ভারতের জনগণের ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে হিন্দুধর্মের চেতনা লুক্বায়িত আছে, তাকে রাজনৈতিক প্রচারণায় জাগরিত করে মোদি ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগণকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, বিজেপি ভারতীয়দেরকে স্বীয় মূল্যবোধে বেঁধে রাখতে পারবেন। এক্ষেত্রে কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর বিদেশ-পরিচয় বিজেপির জন্য মোক্ষম সুযোগের সৃষ্টি করতে পেরেছে। অর্থাত্ ধর্মকে প্রচারের কৌশল হিসেবে বিজেপির ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, সম্ভবত আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিজেপির ধর্মকার্ড তেমন গুরুত্ব পাবে না। এতদসত্ত্বেও প্রতিবেশীদের মনোজাগতিক বলয়ে বিজেপি বেশ অস্বস্তির বীজ বপন করেছে অনেক আগে থেকেই। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সম্পর্কে ভারতের “বৃহত্ শক্তি-ভূমিকা” পালনের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি ছাড়া বিজেপি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তেমন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। বিজেপি বা ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ চ্যালেঞ্জের মুখেই ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছেন। বোধকরি, ক্ষমতায় আরোহণের পর বিশ্বরাজনীতির আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আন্তঃক্রিয়ায় বিজেপির ধর্মবাদী চরিত্র লুক্বায়িত রাখায় কৌশল অবলম্বন করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনী প্রচারণায় নরেন্দ্র মোদি ভারতে বসবাসরত বাংলাদেশি মুসলমানদের বিতাড়নের হুংকার ছেড়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি নিশ্চয়ই তাদেরকে ভারতছাড়ার ব্যাপারে তেমন কঠোর নীতি গ্রহণ করবেন না। তাঁর বিবেচনায় অবশ্যই বাংলাদেশে চাকরিরত প্রায় বিশ হাজার ভারতীয়ের বিষয়টা গুরুত্ব পাবে এবং তখনি “দাও” এবং “লও” নীতিতে আঞ্চলিক সহিষ্ণুতাই প্রকাশ পাবে। পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে মোদির সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বক্তব্যও নিশ্চয়ই ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার কাছে স্তিমিত হয়ে যাবে। তাছাড়া, কংগ্রেসের তরুণ নেতা রাহুল গান্ধী যেভাবে বিজেপি ও মোদির নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ভবিষ্যত্ চিত্র অংকন করেছিলেন বিজেপি রাহুলের সেই বক্তব্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে ভারত ও প্রতিবেশীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নতুন বন্ধন তৈরির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সচেষ্ট থাকবেন। বিজেপির ধর্মকেন্দ্রিক বক্তব্য যে ভারতের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নীতিতে সীমিতভাবে ব্যবহূত হবে, তা বোধগম্য হয় বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিং-এর সাম্প্রতিক বক্তব্যে: “দেশের সব শ্রেণীর, সব ভাষার, সব সম্প্রদায়ের মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। এই জয় ভারতের সাধারণ মানুষের। এই জয়ের উল্লাসে ভেদাভেদের রাজনীতি যেন প্রশ্রয় না পায়। এই জয় যেন মুছে দেয় জাত-পাত আর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তফাত্।” রাজনাথের এ বক্তব্যে বিজেপির ভবিষ্যত্ নীতির প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আগেই বলেছি, ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ের নির্ণায়ক হলো মূলত গুজরাট মডেলে ভারতকে সাজানোর প্রতিশ্রুতি। ভারতের নীতি নির্ধারকরা নিশ্চয়ই এ বাস্তবতা মনে রাখবেন যে, কোন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উন্নতি আঞ্চলিক সম্পর্কের সুদৃঢ় কাঠামোর উপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাইসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ব্যাঘ্র অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার মূলে রয়েছে আসিয়ানের (ASEAN) সুদৃঢ় জোটবদ্ধতা, আসিয়ানের বাইরেও যার বিস্তৃতি পরিব্যাপ্ত। ভারতের উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সার্কের (SAARC) উন্নয়নমূলক কার্যাবলিকে এগিয়ে নিতে ভারতের নেতৃত্বের সঠিক ব্যবহার। সার্ক শক্তিশালী হলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের মধ্যে ভারত সম্পর্কে যে বড়বোনসুলভ (big sisterly) অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা তিরোহিত হবে। ভারতের রাজনীতিতে বিজেপিকে দীর্ঘজীবিতা পেতে হবে, এ এক বড় চ্যালেঞ্জ, যা কখনো আঞ্চলিক সহযোগিতা অবজ্ঞা করে অর্জন করা সম্ভব নয়। বিজেপিকে বিস্মৃত হলে চলবে না যে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের ১৩ দিন পর বিজেপিকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। ১৯৯৮ সালে পুনরায় সরকার গঠন করলেও বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনপিএ মাত্র ১৩ মাস ভারত শাসনের সুযোগ পায়। এরপর ১৯৯৯ সালে সরকার গঠনে সক্ষম হয় বিজেপি। কিন্তু ’৯৯-এর বিজয় আর ২০১৪’র বিজয় একপাল্লায় মাপা যাবে না। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন বিজেপিকে বৃহত্তর ভারতের সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যত্ রচনার বৈপ্লবিক ‘পরিবর্তন’ আনার জন্য ম্যান্ডেট দিয়েছে ভারতীয়রা। বিজেপির প্রতি জনগণের এ অকুণ্ঠ সমর্থন ধরে রাখতে হলে বিজেপিকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি ভারতীয় নীতির সার্বজনীনতার প্রমাণ রাখতে হবে। আর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এতদিনের সৃষ্ট উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা দূর করে বিজেপিকে সর্ব-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতীয় জনগণের হূদয়ে দীর্ঘ ভালোবাসার মন্দির গড়তে হবে। বাংলাদেশের সাথে অনিষ্পন্ন তিস্তা ইস্যু, ফারাক্কা ইস্যু, সীমানা ইস্যু, করিডোর ইস্যু প্রভৃতি সকল ইস্যুর পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার ভিত্তিতে সমাধান করে ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী বাংলাদেশের মানুষের মাঝে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অমরসঙ্গী ভারতের কাছ থেকে উপর্যুপরি বঞ্চনা পেতে পেতে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যে ভারত-বিমুখতা সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতায় নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে হবে। সাথে সাথে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ প্রভৃতি আঞ্চলিক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি রাজনীতির দখলতত্ত্ব (hegemonic stability theory) পরিহার করে দক্ষিণ-এশিয়ার সার্বজনীনতার চেতনায় রাজনৈতিক আদর্শবাদের (idialism) নতুন নীতি অনুসরণ করতে হবে বিজেপিকে। নরেন্দ্র মোদির ন্যায় ত্যাগী, পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান, পোড়-খাওয়া রাজনীতিবিদ নিশ্চয়ই সর্ব-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রীতি চেতনায় উদ্দীপিত হয়ে ভারতের ঐক্য ধরে রেখে সুষম শান্তিময় ও প্রগতিশীল দক্ষিণ এশিয়ার সুদৃঢ় গঠনে তাঁর নেতৃত্বের সদ্ব্যবহার করবেন। দক্ষিণ এশিয়ার সকলে আজ এটাই চায়। আমরা বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদিকে আবারো অভিনন্দন জানাই। লেখক :অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়