রপ্তানি বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং নতুন নতুন পণ্য রপ্তানিকে উত্সাহিত করার জন্য পৃথিবীর বহু দেশে রপ্তানি আয়ের ওপর সেই দেশের সরকার নির্দিষ্টহারে প্রণোদনা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে কৃষিপণ্যসহ বেশ কিছু পণ্যের রপ্তানি আয়ের ওপর প্রণোদনা দেয়ার বিধান রয়েছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী রপ্তানি খাতে প্রণোদনা (ইন্সেন্টিভ) দেয়ার বিধান সম্পর্কে মাঝে মাঝে বিরূপ মন্তব্য করে থাকেন। রপ্তানি খাতে প্রণোদনা দেয়ার বিধান সম্পর্কে গত মাসেও তিনি তার নেতিবাচক মনোভাব স্বভাবসুলভ বিরক্তির সঙ্গে প্রকাশ করলেন। রপ্তানি খাতে যে অর্থ প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হচ্ছে সেটিকে তিনি অপচয় বলে গণ্য করেন। গরিব দেশের কষ্টার্জিত রাজস্ব আয়ের অর্থ প্রণোদনা হিসাবে বিলিয়ে দিয়ে রপ্তানি খাতকে টিকিয়ে রাখতে তিনি রাজি নন।
ইউরোপ, আমেরিকায় মহামন্দা শুরু হওয়ার আগে তৈরি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যে ধরনের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতেন, মহামন্দার পরে বিশ্ববাজারে পণ্য মূল্যের প্রতিযোগিতা তার চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। কারণ, চীন, ভারত, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশের সরকার পণ্য উত্পাদন এবং উত্পাদিত পণ্য রপ্তানি করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। রপ্তানি বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার কারণে এই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ পণ্য উত্পাদন এবং রপ্তানির অনুকূলে। কাঁচামালের যোগান, প্রয়োজনীয় বিদ্যুত্ সরবরাহ, ভৌত অবকাঠামো এবং সুস্থ আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ ইত্যাদির সমন্বয়ে দেশগুলোকে সার্বিকভাবে ব্যবসাবান্ধব দেশ বললে অত্যুক্তি করা হবে না। দেশের ভেতরে সব সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখার পরেও সেসব দেশের সরকার অনেক পণ্যের রপ্তানির বিপরীতে ইন্সেন্টিভ দিয়ে থাকে। এসব দেশের সরকার জানে, রপ্তানি ব্যবসা ত্বরান্বিত করা গেলে রাষ্ট্রের কোষাগারে নগদ ডলার জমা হবে। রপ্তানি চাঙ্গা থাকলে দেশের অর্থনীতি প্রাকৃতিক নিয়মেই চাঙ্গা থাকে। এ কারণে সেসব দেশের অর্থমন্ত্রীরা রপ্তানি খাতে ইন্সেন্টিভ দেয়ার বিধানকে অপচয় ভেবে বারবার সেই বিধানের প্রতি আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেন না। দেশের ভেতরে পণ্য উত্পাদন এবং সেই পণ্য রপ্তানি করার ফলাফল দেশের অর্থনীতিতে কতটা সুদূরপ্রসারি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে সে সম্পর্কে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা সম্পূর্ণ অচেতন। ফলে দেশে রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ এবং রপ্তানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা এখনও বাধাগ্রস্ত।
বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামো, বিদ্যুত্ সরবরাহ পরিস্থিতি, আইন-শৃঙ্খলার নারায়ণগঞ্জ মডেলকে সামনে রেখে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কি ব্যবসায়ীদের কাছে ভালো কিছু আশা করতে পারেন? চীন এবং ভারতে পরিবহন ব্যয় স্থিতিশীল থাকার বিপরীতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহনের ব্যয় গত তিন বছরে চারগুণ বেড়ে গেছে। ঢাকা শহরের গার্হস্থ্য ব্যবহারে বিদ্যুত্ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও দেশের বাণিজ্যিক খাতের চিত্র ভয়াবহ। দেশের বহু এলাকায় সারা দিনে দুই ঘন্টার বেশি বিদ্যুত্ সরবরাহ সরকার নিশ্চিত করতে পারেনি। পণ্য প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বিদ্যুত্ সরবরাহের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে পারে না। ফ্যাক্টরিগুলো নিজস্ব জেনারেটর চালিয়ে পণ্য উত্পাদন করে থাকে। মহামূল্যবান অক্টেন, পেট্রোল কিংবা ডিজেল পুড়িয়ে তারা যে পণ্য উত্পাদন করে তার দাম তুলনামূলকভাবে অনেক চড়া। চীন, ভারত তাইওয়ানের মত উত্পাদনবান্ধব দেশ তাদের দেশের রপ্তানিমুখী ফ্যাক্টরিগুলোতে চব্বিশ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশ সে তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। মূল্যবান অক্টেন কিংবা ডিজেল পুড়িয়ে পণ্য উত্পাদন করে আমাদের দেশের রপ্তানি ব্যবসায়ীদেরকে বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হচ্ছে। রপ্তানিকারকেরা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা বাবদ যত্সামান্য যা পায় সেটা পেট্রোল ডিজেলের দাম মেটাতে ফুরিয়ে যায়। বাজেট প্রণয়নের সময় সরকারের অর্থমন্ত্রী মাঠ পর্যায়ের প্রতিকূলতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমরা আশাবাদী।
রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা উত্তোলনের ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম হওয়ার সম্ভাবনা নাই আমি সে কথা বলছি না। ব্যাংকের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সীমাহীন দুর্নীতি এবং অনিয়মের ঘটনা যেমন অহরহ ঘটছে রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা দেয়ার বিষয়ে কখনো তেমন ঘটেনি। রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা দিতে গিয়ে টুকটাক যা অনিয়ম ঘটে থাকে সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়া নজরদারি অক্ষুণ্ন রেখে দূর করা সম্ভব। রপ্তানিকারির হিসাবে রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনার দাবি ব্যাংকে দাখিল করার পরে অর্থ ছাড় করার আগেই ব্যাংক সেই দাবির যথার্থতা সঠিকভাবে যাচাই করলে এই ক্ষেত্রে কোন প্রকার অনিয়ম ঘটার সামান্য সম্ভাবনা থাকা সম্ভব নয়।
রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংককে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। প্রণোদনার দাবিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে পারলে এটি নিয়ে অনিয়ম ঘটার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। কারণ, নির্দিষ্ট কনসাইনমেন্ট বিদেশি ক্রেতার ঘরে পৌঁছানোর পরে পণ্যের মূল্য বাবদ ডলার কিংবা পাউন্ড বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রত্যাবাসিত হতে হবে এবং প্রত্যাবাসিত বৈদেশিক আয়ের বিপরীতে যথারীতি প্রণোদনা ছাড় করা হবে। এই পরিস্থিতিতে গুরুতর অনিয়ম করার দুরভিসন্ধি নিয়ে কোন প্রতারক, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অসাধু কোন চক্র হাত না মেলালে প্রণোদনার অপব্যবহার সম্ভব নয়।
আগামী বাজেটে রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো হবে বলে রপ্তানি ব্যবসায়ীরা আশাবাদী। রপ্তানি ব্যবসায়ীরা যে ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করে পণ্য উত্পাদন এবং পণ্য রপ্তানি করে থাকেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রণয়নের সময় সেটি আন্তরিক অনুধাবন করবেন এবং বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটবে বলে আমরা আশা করি। রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা খাতে বিগত অর্থ বছরের তুলনায় ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো হলে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার আয় আরও বাড়বে এই বাস্তবতা বাজেট প্রণয়ন কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ আন্তরিকভাবে অনুধাবন করবেন এবং সেই আলোকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেবেন বলে আমরা আশাবাদী।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
e-mail: [email protected]
